হরমোনাল ইমব্যালেন্স | কীভাবে আনবেন খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল-এ চেঞ্জ?

হরমোনাল ইমব্যালেন্স | কীভাবে আনবেন খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলে চেঞ্জ?

হরমোনাল ইমব্যালেন্স এর কারণে মাথা ব্যাথা হচ্ছে

আমরা এমন একটা সময়ে বাস করি যেখানে সবাই সৌন্দর্য বা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নিজের ওজনফিগারের দিকে চড়া নজর রাখি। সেখানে হঠাৎ যদি একদিন দেখি শখের জামাটার হাতা টাইট হয়ে যাচ্ছে, শরীরের এখানে সেখানে নতুন কিছু চর্বির আস্তর তখন যে কতটা কষ্ট হয় সেটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। হরমোনাল ইমব্যালেন্স এ ক্ষেত্রে অনেকটা ভূমিকা রাখে! হরমোনাল ইমব্যালেন্স নিয়ে বিস্তারিত বলবার পূর্বে কিছু কথা বলে নিই…

রোজ যেমনটা খান তেমনই খাওয়া-দাওয়া, কাজকর্ম, হালকা এক্সারসাইজ করছেন। কিন্তু কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ ৫ কেজি ওজন বেড়ে গেল! টেরই পেলেন না! এমনটা কি আপনার সাথেও হয়? আর যারা ওজন লক্ষ্য করেন না তারা তো মিনিমাম ১৫-২০ কেজি বাড়ার আগে নিজের এই চেঞ্জ নিয়ে তেমন চিন্তাই করেন না! আবার কেউ কেউ আছেন, প্রাণপন চেষ্টা করেও ওজন কমাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাতাসেও যেন ওজন বাড়ে, তাই না?

উপরের একটা সিচুয়েশনেও যদি আপনি পড়ে থাকেন কখনো, আজ আপনার সাথেই কথা বলতে চাই…!

কী ভাবছেন নতুন একটা ‘ডায়েট চার্ট‘ নামক বস্তু দিব? না না, এক্সারসাইজ আর হেলদি লাইফস্টাইল ছাড়া যে স্বাস্থ্য, ফিগার কোনোটাই কন্ট্রোলে আনা সম্ভব না সেটা আমরা ভালোভাবেই জানি। অনেক সময় সেসব কিছুই কাজ করে না, কিন্তু কেন? আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই প্রবলেমের গভীরে যাওয়ার চিন্তাটুকুও না করে বছরের পর বছর ‘ক্রাশ ডায়েট’ নামক টর্চার নিজের উপরে চালান। লাভ তো কিছুই হয় না, ফ্রি হিসেবে পান গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটির জীবনভর সমস্যা!

একটা বিশাল অংশের মানুষের অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধির মূল কারণ হরমোনাল ইমব্যালেন্স। আর এই ক্ষেত্রে ওজন কমানোর চিন্তা করার আগে হরমোন লেভেল কন্ট্রোল করতে হবে। এছাড়া কোনো উপায় আসলে নেই। আর শুধু ডায়েট বা লাইফস্টাইল দিয়েও আবার হরমোন লেভেল কন্ট্রোলে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেডিকেল হেল্পের দরকার হয়।

হরমোনাল ইমব্যালেন্স এর ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলের কিছু চেঞ্জ

অনেকে ভাবে যে হরমোনের কারণে ওজন বেড়ে যাওয়াটা মেইন প্রবলেম। তা কিন্তু নয়। হরমোনাল ইমব্যালেন্স মেইন প্রবলেম! আর ওজন বেড়ে যাওয়া এই হরমোনাল ইমব্যালেন্স এর কারণে তৈরি রোগব্যাধির একটা ‘উপসর্গ’ মাত্র। তাই মেইন প্রবলেমটা কোথায় সেটা বের করে ট্রিট যত জলদি করবেন ততই ভালো। শরীরে কোন হরমোন কী কাজ করে এবং হরমোনাল ইমব্যালেন্স হলে কীভাবে খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনবেন সে বিষয়ে চলুন জেনে নেই বিস্তারিত…

করটিসল (Cortisol)

শরীরে তৈরি প্রধান ‘স্ট্রেস হরমোন’। যে কোনো স্ট্রেসফুল সিচুয়েশনে অ্যাডরেনাল গ্ল্যাণ্ড ‘করটিসল’ প্রডিউস করে। আর দেহে প্রচুর পরিমাণে করটিসল থাকলে দেহ ‘ইনফ্ল্যামেটরি মুডে’ চলে যায়। যার লং টার্ম রেজাল্ট ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, বিভিন্ন অটো ইমিউন রোগব্যাধি। খুব অল্প সময়ের স্ট্রেসে করটিসল আমাদের অ্যাংজাইটি কমাতে হেল্প করে, বাট সবসময় এই হরমোনের লেভেলে ইমব্যালেন্স থাকলে দেহের পুরো সিস্টেম ধ্বংসও সে একাই করতে পারে। যেমন- অতিরিক্ত ইনসুলিন প্রোডাকশন এবং ফ্যাট সেল প্রোডাকশন (ওজন বাড়ার কারণ)।

স্ট্রেসে করটিসল হরমোনাল ইমব্যালেন্স - shajgoj.com

কী করবেন?

অবশ্যই যে কোনো মূল্যে প্রতি রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমাবেন। রোজকার রুটিনে স্ট্রেস কন্ট্রোল করা শহরের বিজি লাইফে খুবই জটিল। কিন্তু উপায় নেই। তাই মেডিটেশন করার ট্রাই করুন। অবশ্যই যে কোনো ভাবে প্রসেসড ফুড, প্রিজারভেটিভ অ্যাভয়েড করবেন।

থাইরয়েড (Thyroid)

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ হরমোনের সমস্যা বলতে এক প্রজনন হরমোন আর এই থাইরয়েডকেই চেনে! তাই একে নতুন করে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। থাইরয়েড প্রবলেমে ওজন বাড়ে, কমন নলেজ, কিন্তু কেন? ভেবেছেন কখনো? থাইরয়েড গ্ল্যাণ্ড থেকে নিঃসরিত হরমোনের একটা প্রধান কাজ আমাদের মেটাবোলিজম, ঘুম, হার্ট রেট, বৃদ্ধি কন্ট্রোল করা। যখন যথেষ্ট হরমোন শরীরে তৈরি হয় না, তখনই হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে। কেন দরকারি হরমোন ঠিকভাবে তৈরি হচ্ছে না? ডাক্তাররা অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল আর জেনেটিকসকে দায়ী করেন। ম্যালনিউট্রিশন, টক্সিক আবহাওয়া- এসবও বেশ বড় কালপ্রিট! থাইরয়েডের অভাবে একই সাথে বডির মেটাবলিজম মানে ক্যালরি থেকে এনার্জি কনভার্সনের রেট বাধাগ্রস্থ হয়, ফ্যাট বাড়তে থাকে এবং দেহে পানি জমতে থাকে। দুইয়ে মিলে কী হয়? হঠাৎ করে ২০ কেজি ওজন বেড়ে যায়!

হাইপারথাইরয়েডিজম এর কারণ সমূহ যা হরমোনাল ইমব্যালেন্স ঘটায় - shajgoj.com

কী করবেন?

থাইরয়েড রিলেটেড সমস্যা আছে সন্দেহ থাকলে কোনো দিকে না তাকিয়ে সাথে সাথে ডাক্তার দেখাবেন। আর মেডিকেশনের সাহায্যে সবসময় হরমোন ব্যালেন্সে রাখার চেষ্টা করবেন। আয়োডিন যুক্ত লবণ খাবেন এবং কাঁচা শাক সবজি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। ডাক্তারের সাহায্য ছাড়া কোনোভাবেই এই প্রবলেম আপনি কন্ট্রোল করতে পারবেন না।

লেপটিন (Leptin)

খাবারের সময় পেট ভরেছে কি ভরে নি এটা আপনি কীভাবে বোঝেন বলুন তো? এই ‘ভরপেট ফিলিং’ দেওয়ার পেছনে হাত আছে ‘লেপটিন’ নামক আমাদের কাছে মোটামুটি অপরিচিত এই হরমোনের। লেপটিন আমাদের বডিকে সিগন্যাল দেয় যে কখন তার ফুয়েল ট্যাংক পুরো ভরে গিয়েছে, তাই আমরা সেটা টের পেয়ে খাওয়া বন্ধ করি। কিন্তু অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার, প্রিজারভেটিভ, চিনি এবং চিনি যুক্ত খাবার আমাদের দেহে অতিরিক্ত লেপটিন তৈরি করে। এতে কী হয়? দেহের ‘লেপটিন সেনসিটিভিটি’ কমে যায়। অর্থাৎ লেপটিন তৈরি হলেও তখন বডি এটা বোঝে না যে তার আর খাবারের দরকার নেই, যথেষ্ট হয়েছে। তাই সে অতিরিক্ত খাবার খেয়েই যায় । আর এরই ফল অতিরিক্ত ওজনের ভার।

হরমোনাল ইমব্যালেন্স না থাকায় লেপটিন সিগন্যাল - shajgoj.com

কী করবেন?

দুই তিন ঘণ্টা পরপর স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খান। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি এবং মিষ্টি ফল পরিহার করুন এবং প্রচুর প্রচুর পানি পান করুন। বিস্কিট, চানাচুর, সাদা চিনি, কোল্ড ড্রিংক খাওয়া একেবারেই বন্ধ করুন।

মেলাটোনিন (Melatonin)

‘ঘুমের হরমোন’ নামেই এর পরিচিতি বেশি। আজকাল অনেকেই ঘুমের ন্যাচারাল সাইকেল মেনটেইন করতে মেলাটোনিন সাপ্লিমেন্ট খেয়ে থাকেন। পিনিয়াল গ্ল্যাণ্ড থেকে তৈরি এই হরমোন আমাদের ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে এবং রোজ একই সময়ে ঘুমানোর সিগন্যাল দেওয়ার কাজটা করে। ন্যাচারালি রাতে দেহে মেলাটোনিন বেশি নিঃসরিত হয় এবং সকালে কমে আসে (সান সাইকেলের সাথে তাল রেখে)। এজন্য সকালে ঘুমানো স্বাভাবিক মানুষের জন্য কঠিন এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়াটা সহজ। দেহ রাতের ঘুমের সময়টাতে দেহের ক্ষয় ক্ষতিগুলো সারিয়ে তোলে। কিন্তু ঘুমের সাইকেল এবং মেলাটোনিন-এর লেভেলে অসামাঞ্জস্যতা দেখা দিলে এই রিপেয়ারের কাজগুলো ঠিকভাবে হয় না। এতে ইনফ্ল্যামেশন বাড়ে, দেহে অতিরিক্ত পানি জমে যায়, মেটাবলিজম স্লো হয়ে যায় এবং ফলাফলে ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

কী করবেন?

রাত ১০ টার পরে ঘরে কোনো আলো জ্বালাবেন না, চোখের সামনে ব্লু লাইট (যে কোনো স্ক্রিন যেমন ফোন, পিসি, টিভি ব্লু লাইট নিঃসরণ করে) রাখবেন না। পিসি, ফোনে নাইট লাইট সেটিং ইউজ করুন যাতে সূর্য ডোবার সাথে সাথে কালার টোন কুল থেকে ওয়ার্ম হয়ে যায়। এতে অনেক রাত পর্যন্ত “ঘুমাতে পারছি না” এই অজুহাতে জেগে থাকার সমস্যা কমবে। কাঠবাদাম, চেরি, সূর্যমুখীর বীজ, এলাচি এসব হচ্ছে ন্যাচারাল মেলাটোনিনের সোর্স। তাই খাবার তালিকায় এসব রাখার ট্রাই করুন।

ইসট্রোজেন (Estrogen)

প্রধান নারী প্রজনন হরমোন। কিন্তু নারী পুরুষ দুইয়ের দেহেই ন্যাচারালি বা আর্টিফিশিয়ালি এই হরমোনের লেভেল কন্ট্রোলের বাইর চলে যেতে পারে। সমস্যাটা তখনই শুরু হয়। আপনি কী জানেন, খাবারের মাধ্যমেও আপনার দেহে এক্সেস ইসট্রোজেন আসতে পারে? স্পেশালি পেসটিসাইড আর গ্রোথ হরমোন দিয়ে তৈরি খাবার খেলে এই সমস্যা এড়ানোর উপায় নেই বললেই চলে। আবার অনেকের দেহে জেনেটিক কারণেই অতিরিক্ত হরমোন তৈরি হয়! ইসট্রোজেন লেভেল বেড়ে গেলে দেহে ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা কমে আসে। আর তখনই অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি (একচুয়ালি অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধি) শুরু হয়। ফলাফলে প্রজননে সমস্যাসহ আরও অনেক জটিল শারীরিক রোগব্যাধি দেখা দেয়।

কী করবেন?

সাদা ময়দা, সাদা ভাত, সাদা চিনি এসব বাদ দিন। হোল ফুড খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। যতটা পারেন ক্লিন অরগানিক প্রোডাক্ট খান। রোজ ৩০ মিনিট এক্সারসাইজ দেহের নিজের হরমোন লেভেল ঠিক রাখতে হেল্প করবে। ফার্মের গ্রোথ হরমোন দেয়া পোলট্রি, রেডমিট, ডেইরি একেবারেই বাদ দিন।

কি? থাইরয়েডের সমস্যা বা পিরিয়ডের সমস্যাতেই যে শুধু ওজন বাড়ে না সেটা দেখে চমকে গেছেন? দেহে অনেক ধরনের বিক্রিয়াই চলে যা আমরা নিজের হাতে নষ্ট করি, তারপরে সেটাকে অবহেলা করে বছরের পর বছর ‘ডায়েট’ আর ‘শর্ট জিম কোর্স’ করে একমাসে ২০ কেজি কমানোর আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখি, এরপর গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিডিটি, ডায়াবেটিসে বিধ্বস্ত নিজের ভাঙ্গাচোরা শরীরটা টানতে টানতে ডাক্তারের চেম্বারে ফেলে দিয়ে হতভম্ব ডাক্তারের ১৪ পুরুষ তুলে গালি দেই। কিন্তু আসলে কি জানেন? দিন রাত কোঁকাতে কোঁকাতে জীবনটা কিন্তু আপনাকেই পার করতে হবে। তাই সময় থাকতে একটু সেন্সও গ্রো করার চেষ্টা কেন করি না সবাই? উপসর্গ দেখা মাত্রই ট্রিট করুন।হরমোনাল ইমব্যালেন্স এর সমস্যায় তখন আর পড়তে হবে না।

 

ছবি- সাটারস্টক

29 I like it
4 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...