উত্তরাধিকার উপন্যাসের ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ! উত্তরাধিকার উপন্যাসের ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ!

উত্তরাধিকার উপন্যাসের ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ!

লিখেছেন - ন্যান্সী জাহান সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

“Reading is to the mind, what exercise is to the body “-এই কথাটির মধ্য দিয়েই বই পড়ার গুরুত্ব বোঝা যায়। বই এমনই একটি জিনিস যা পড়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও প্রফুল্ল রাখতে পারি। আসলে বই পড়ার আনন্দ কখনোই শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুধু অনুভব করা যায় অভিজ্ঞতা দিয়ে। বই পড়ার ম্যাজিক হচ্ছে এটি মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায় কিংবা এমন কোন সময়ে আমাদের পরিভ্রমণ করায় যা অন্য কোন মাধ্যমে কখনোই সম্ভব নয়। একটা ভালো গল্প পাঠককে সেই চরিত্র আর পরিবেশের সাথে মিশিয়ে ফেলে। আজ বিখ্যাত ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদারের জনপ্রিয় উপন্যাস উত্তরাধিকার-এর উপর আলোকপাত করতে চাই।

উত্তরাধিকার একটি ত্রয়ী উপন্যাস - shajgoj.com

“সমরেশ মজুমদার” বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক। তিনি দুই বাংলারই অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক। অসংখ্য জনপ্রিয় উপন্যাসের স্রষ্টা এই গুণী লেখক। এর মধ্যে উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ, গর্ভধারিণী, সাতকাহন উল্লেখযোগ্য। উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ এই তিনটি বই হলো ধারাবাহিক সিরিজ বই। কেউ কেউ এই বই তিনটিকে ট্রিলোজি হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।

উত্তরাধিকার উপন্যাস নিয়ে অল্প কথা 

বুক রিভিউ 

বই – উত্তরাধিকার

ধরন- উপন্যাস

লেখক – সমরেশ মজুমদার

প্রকাশক- অশোক রায়

প্রকাশনী – নবযুগ 

সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার হলো অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস। প্রথমে এই উপন্যাসটি কলকাতার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো যা পরে বই আকারে বের হয়। বই এর মূল চরিত্র অনি/ অনিমেষ মিত্র। অনিমেষের শৈশব থেকে তারুণ্য পর্যন্ত যে জার্নি সেটাই বিশদভাবে এই বইয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। তার রাজনৈতিক দর্শনের সূচনাটা এই খন্ডেই অংকিত হয়েছে। মূল চরিত্র ছাড়াও এ বইয়ে আরো অনেকগুলো চরিত্র এসেছে বার বার। চরিত্রগুলোর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্য হলেও প্রতিটি চরিত্র আমাদের অনুভূতির ভেতর নাড়া দিয়ে যায়।

গল্পের পটভূমি 

উত্তরাধিকার বই খোলা - shajgoj.com

এই উপন্যাসের কাহিনী স্বর্গ ছেঁড়া চা বাগান থেকে শুরু, যেখানে অনিমেষের শৈশব কাটে। স্বর্গ ছেঁড়া, জলপাইগুড়ি, কলকাতা আর দেশভাগের রাজনীতি এই বইয়ে সমরেশ মজুমদার নিপুণ দক্ষতার সাথে বলে গেছেন। শৈশবের ছোট ছোট প্রশ্ন, ছোট ছোট ঘটনা এমনকি শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি লেখক অনিমেষের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। নিজের পরিবারের সঙ্গেই অনিমেষ বসবাস করছিল স্বর্গ ছেঁড়ার চা বাগানের কোয়ার্টারে। স্বর্গ ছেঁড়া চা বাগানে ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি করতেন মিত্র পরিবার। মানে অনিমেষের দাদা এবং বাবা দুজনই বড় বাবু পদে চাকরী করতেন চা বাগানে। শান্ত নিরিবিলি চা বাগান, শীত শীত আমেজ,  খুঁটিমারির জঙ্গলের মাথায় এলিয়ে পড়া লাল সূর্যটার টুপ করে হারিয়ে যাওয়া, মাথার উপর ভূটানের পাহাড় থেকে ভেসে আসা বিষন্ন মেঘের দলের জটলা পাকানো এবং মাঠ পেরিয়ে আসাম রোড। স্বর্গ ছেঁড়ার চা বাগানের এই অপরুপ স্নিগ্ধ পরিবেশে জন্মানো অনিমেষের শৈশবটা বেশ ভালই কাটছিল। চিরকাল যে মানুষগুলোর কাঁধে চরে অনিমেষ বড় হয়েছেন কালের পরিক্রমায় জীবনের বাঁকে বাঁকে তাদের সাথে নিজের বাঁধন আলগা হয়েছে। কোমল কঁচি হৃদয়ের অনিমেষের সবকিছুকে পেছনে রেখে হঠাৎ করেই জলপাইগুঁড়ি শহরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা, ফেলে আসা স্বর্গ ছেঁড়ার স্মৃতি, মাকে হারিয়ে  পিসিমার আগলে রাখা আঁচলের ছায়া, আর বুকের ভেতরের প্রগাঢ় ভালোবাসা প্রকাশ না করতে সদা তৎপর, দাদুর কঠোরতা ও দৃঢ়তার আদর্শের মাঝে একটু একটু করে বেড়ে ওঠা তার জীবনের বুননকে একটু আলাদা করে ফেলে সবার থেকে। অনিমেষের কৈশোর পেরোনো, বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ভাল-মন্দের পার্থক্য করতে শেখা, বিবেকবান হয়ে ওঠা, দেশকে ভালোবাসতে শেখা এই রকম আরো অনেক চিত্র নিয়েই উত্তরাধিকার।

লেখাচিত্র

উত্তরাধিকার বই - shajgoj.com

যে সময়ের ঘটনা লেখক তার এই উত্তরাধিকার নামক ফ্রেমে আটকাতে চেয়েছেন। সে সময়টায় ভারত সবেমাত্র ইংরেজদের শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। সর্বত্র ভাঙাগড়ার খেলা। শিশু অনির হাত দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে তার মনে দেশপ্রেমের বীজ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে এ উপন্যাসে। যা পরের খন্ডগুলোতে মহীরুহ আকার ধারণ করে। এরপর ধাপে ধাপে অনিমেষের বেড়ে ওঠা! শৈশব থেকে কৈশোরে, কৈশোর থেকে তরুণ হওয়া। তরুণ অনিমেষ উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় গমন করে। যে দিন সে কলকাতায় যায় সেই দিন সারা শহরে আগুন জ্বলছে! আন্দোলনের এক ভয়ংকর পরিবেশ সর্বত্র। ঠিক এখানেই এই গল্পের সমাপ্তি। চুপচাপ ও নির্বিবাদী অনিমেষের চোখ দিয়েই ঔপন্যাসিক আমাদেরকে দেখিয়েছেন একটা অস্থির সময়ের ছবি।

কংগ্রেস-বামদের বিরোধ, চিরাচরিত বাঙালি পরিবারের টানাপোড়েন ও ভালোবাসা, দেশপ্রেম আর সামনের অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়ানো সবটাই যেন উঠে এসেছে অবধারিতভাবে।

উপলব্ধি

বইতে বিষাদের পরিমাণ একটু বেশীই। প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির পরিমাণটাও এই গল্পে অনেক অধিক। একটু পর পর বুকের ভেতর হাহাকার তোলা সব ঘটনার বিস্তার। লেখক অনুভূতি নিয়ে খেলা করেছেন বেশ। এখানেই লেখকের স্বার্থকতা। সবদিক থেকে ভেবে বললে বলা যায়, বইটা ভীষণ রকম ভালো।

শেষকথা

উত্তরাধিকার শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি দলিল। এমন দলিল যা স্বাক্ষী হয়ে আছে অনিমেষ নামের একটা সাধারণ ছেলের চোখে দেখা একটা অসাধারণ সময়ের।

আশা করছি আপনাদের ভালো লেগেছে। যারা কখনো বই পড়েন না তারাও সময়করে বইটি পড়ে দেখবেন ভালো লাগবে।

 

ছবি- সংগৃহীত: আমারিবই.কম