কালবেলা | সমরেশ মজুমদারের এক অনবদ্য ট্রিলোজি কালবেলা | সমরেশ মজুমদারের এক অনবদ্য ট্রিলোজি

কালবেলা | সমরেশ মজুমদারের এক অনবদ্য ট্রিলোজি

লিখেছেন - ন্যান্সী জাহান অগাস্ট ২৪, ২০১৯

দুই বাংলার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদারের বিখ্যাত ট্রিলোজি উপন্যাস সিরিজের মধ্যে দ্বিতীয় বই হলো কালবেলা। এর প্রথম বই উত্তরাধিকার আর শেষ হলো কালপুরুষ। এই তিনটা বই যেন সমরেশ মজুমদারের সৃষ্ট ত্রিরত্ন। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রথমবার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১-১৯৮২ খ্রীস্টাব্দে। পরে বই আকারে আবার প্রকাশিত হয়।

এই বইয়ের জন্য ১৯৮৪ সালে সমরেশ মজুমদার সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পান। পরবর্তীতে এই বইয়ের কাহিনী নিয়ে সিনেমা ও নির্মাণ করা হয়। ভারতীয় জনপ্রিয় পরিচালক গৌতম ঘোষ ২০০৯ সালে “কালবেলা” সিনেমা নির্মাণ করেন।

কালবেলা উপন্যাস নিয়ে অল্প কথা

রিভিউ

বই- কালবেলা

ধরন- উপন্যাস

লেখক- সমরেশ মজুমদার

প্রকাশক- দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু

প্রকাশনী- আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

প্রচ্ছদ- সুশীলশীল

সমরেশ মজুমদারের এক অনবদ্য সৃষ্টি কালবেলা। কালবেলা এমন এক উপন্যাস যেখানে প্রেম এবং বিপ্লব একসাথে মিলেমিশে হয়েছে একাকার। “কালবেলা” মানে অশুভ। আসলেই একটি অশুভ সময়ের চিত্র উপস্থাপন করেছে কালবেলা উপন্যাস।বইটিকে একই একটি রাজনৈতিক প্রেমের উপন্যাস বলা যায়।

পটভূমি

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অনিমেষ/অনি। তাকে ঘিরেই গল্পের পটভূমি তৈরী হয়েছে। সেকেন্ডারি পাসের পর কলেজে ভর্তির জন্য জলপাইগুড়ি ছেড়ে কলকাতা শহরে ভর্তি হতে আসাসাধারণ এক অনিকে নিয়েই গল্প এগিয়ে গেছে। গল্পের শুরুটা বিষন্ন এক বিকেলে অনিমেষের স্মৃতিচারণ থেকে। আকাশ ভর্তি ভেসে যাওয়া ঘনকালো ভারী মেঘের দলের দিকে কলকাতার হোস্টেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকে অনিমেষ ডুবে গেছে নস্টালজিয়ায়। কত পুরোনো স্মৃতি, পুরোনো মুখ, পুরোনো কথা, যার আধো স্পস্ট আধো ঝাপসা এসবই তাকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রথম সে যখন এসেছিল কলকাতা শহরে, প্রথমদিনেই সে মুখোমুখি হয়েছিল বিরাট এক দুর্ঘটনার। এই দুর্ঘটনাই তার আসন্ন সমগ্র জীবনযাপনে এবং তার উরুতে এক গভীর দাগ ফেলে গিয়েছিল।কলকাতা এসেই অনিমেষ পায়েগুলি খায় পুলিশের। এজন্য তার পড়াশুনা এক বছর পিছিয়েও পড়ে ছিলো। অনিমেষ কখনই ভাবে নি রাজনীতিতে জড়াবে। অস্ত্র হাতে বিপ্লবের পথে হাঁটতে শুরু করবে।জলপাইগুড়ির মতো পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা সহজ সরল অনি তখনও বুঝতে পারে নি রাজনীতির ভেতরেও গভীর বিষাক্ত নগ্নতা রয়েছে।

কালবেলা বই খোলা অবস্থায় - shajgoj.com

চোখের সামনে ভাগ হতে দেখেছে আদর্শকে। এই রাজনীতির সহিংস আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলে যেতে হয়েছে অনিকে। তার দাদুর শেষকৃত্য পর্যন্ত ভালমতো করতে পারে নি সে। বাবা, ছোট মা সবার সাথেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। কারণ, তার বাবা কখনও চায় নি সে রাজনীতিতে জড়াক।এই রাজনীতি আন্দোলনের সাথে সমান্তরালভাবে চলে আসে আরেকটি গল্প, আরেকটি অধ্যায়। কিছুটা সংযোগের, কিছুটা কৌতূহলের। যাকে আমরা বলি “প্রেম”। অনিমেষ ও মাধবীলতার প্রেম।এদের দুজনের প্রেমের সম্পর্ক এই উপন্যাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে টপকিয়ে খুব সহজেই একটি প্রেমের উপন্যাসে পরিণত করেছে।

রাজনীতির শুরু

কলেজ জীবনে অনিমেষ রাজনীতি করে নি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঘটনাচক্রে অনিমেষ ছাত্র ইউনিয়নে জড়িয়ে পড়ে।কিন্তু ওর মনে কেমন যেন একটা খটকা থেকে যায়। অনিমেষ সবসময় দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করতে চাইত। রাজনীতিতে ভালো করলেও মাঝেমাঝে তার খামখেয়ালীপনা আর অতিরিক্ত উৎসুক হবার কারণে বড় কোন পোস্টই সে পায় নি। ভারতের ইতিহাসে একটা অন্যতম অংশ হলো নকশাল আন্দোলন।অনিমেষ শুরুতে ছাত্র ইউনিয়ন করলেও যখন বুঝতে পারলো ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে জনগণের কল্যাণ করা যাবে না, তখন সুবাস বোসের হাত ধরে সে নকশাল আন্দোলনে যোগদেয়।এক সময় নকশাল আন্দোলনেও বিভিন্ন বিভক্তি শুরু হয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে গেল পুলিশ, ছাত্র ইউনিয়ন ও কংগ্রেস। একই সাথে চললো পুলিশের অত্যাচার। নকশাল আন্দোলনের জন্য অনিমেষকে জেলে যেতে হয়েছে, অকথ্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।এমনকি দেহের নিম্নাংশ অকেজো করে দেয় পুলিশ।

কালবেলা বইয়ের প্রচ্ছদ - shajgoj.com

মাধবীলতা

বিপ্লবের আরেক নাম মাধবীলতা। মাধবী ছিল অসাধারন ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী এক মানবী। ছাত্র ইউনিয়ন আন্দোলনের সময় মাধবীলতার সাথে অনিমেষের পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা তৈরী হয়। মাধবীলতা রাজনীতি করতো না। প্রথমদিকে অনিমেষকে বাঁধা দিলেও পরবর্তীতে আর বাঁধা দেয় নি। অনিমেষের প্রয়োজনে সে ছিল নিবিড় ছায়ার মতো। তার এগিয়ে চলার পথে মাধবীলতা হয়ে উঠেছিল অনুপ্রেরণা। তাদের জীবন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল একে অন্যের মধ্য দিয়ে। মাধবীলতা শুধু নিঃস্বার্থভাবে অনিকে ভালোই বেসেছিল। তার জগত জুড়ে থাকা অনিকে নিয়ে ভালোবাসা ছাড়া বিশেষ আর কোন ভাবনাই ছিল না। মাধবী কখনো অনিমেষের উপর বিশ্বাস হারায় নি। আন্দোলনে পাশে না থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে সুখ ছড়িয়েছে তারা।সে জীবনের সবকিছু দিয়ে অনিমেষকে ভালোবেসে গিয়েছে। বিনিময়ে আশা করে নি কিছুই। এ নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণে অনেক ত্যাগ শিকার করতে হয়েছিল তাকে। নিজের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল মাধবীলতাকে।বাবা-মা এর সাথে চিরতরে সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল তার। পড়াশুনা শেষ না করেই ওকে চাকরীতে ঢুকতে হয়েছিল।অনির অবৈধ সন্তানকে পরম মমতায় পৃথিবীতে এনেছিল সে। অনেক আদর যত্নে মানুষ করেছে।এজন্য সামাজিকভাবে অনেক অপমান আর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে তাকে। চাকরী হারিয়েছে, সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছে। তবুও সে দমে যায় নি। অনিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ছিল।জেলে বন্দি অনিকে নিয়মিত দেখতে যেত। জরাজীর্ণ একটি বাড়িতে অভাব অনটনের মধ্যে ছেলে নিয়ে থাকতো সে। দারিদ্রতা, মাথার উপর শীর্ণ চাল থাকলেও অনির জন্য ভালোবাসার অভাব হয় নি। অনি যখন সব হারিয়ে জেল খেটে পঙ্গু অবস্থায় বের হয়, তখন তাকে পরম আদরে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসে ছেলেকে অনির হাতে তুলে দিয়েছিল যেন অনি নিজের ইচ্ছামতো ছেলেকে গড়ে তুলতে পারে। যেখানে অনিমেষের প্রতি ভালোবাসা আর বিশ্বাসের বন্ধন ছিল, সেখানে মাধবীলতা বিয়ের দরকার মনে করে নি।

ব্যক্তিগত মতামত

আমাদের সভ্যতার ইতিহাস বিপ্লবের, সকল প্রকার ঘোষিত স্বাধীনতা বিপ্লবের।তাই বিপ্লবের আঁচড়ে নিজেকে শুদ্ধ না করে নিলে শেষমেশ কোন শৃঙ্খলা মুক্তির আশা নেই। বিপ্লব ও প্রেম যে একে অপরের পরিপূরক, উপন্যাস কালবেলা আমাদের তাই জানিয়ে দেয়। জীবনে কোন একটি বেছে নিতে হয় না। দুটোই পথচলার ইন্ধন হয়ে ওঠে। অনিমেষের পুরো জীবনেই বিপ্লব এসেছে বহুরুপে। কালবেলার সমগ্র নির্যাস শুধু এই উক্তি দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব।

আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। সময় পেলে সমরেশ মজুমদারের এই অনবদ্য উপন্যাসটি অবশ্যই পড়বেন।

ছবি- সংগৃহীত: সাজগোজ; মাইইবুকস.কম; জাস্টগিভিং.কম