শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য বা কন্সটিপেশন দূর করার ঘরোয়া উপায়

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য বা কন্সটিপেশন দূর করার ঘরোয়া উপায়

potty

সব বাবা-মায়েরা শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা নিয়ে কম বেশি ভুগে থাকেন। শিশুদের জন্য খুব কমন একটা সমস্যা হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। এই কোষ্ঠকাঠিন্য বা কন্সটিপেশন নিয়ে অনেক বাবা-মায়েরা দুশ্চিন্তায় পড়েন। দুশ্চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক, কেননা কোষ্ঠকাঠিন্য হলে শিশুর খাবারে রুচি থাকে না, খাবার খাওয়া নিয়ে বিরক্ত করে। পটি করতে গেলে কান্নাকাটি করে। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য হতে বেশি দেখা যায়। কিন্তু ছোট শিশুদেরও হতে পারে।

যখন মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি সলিড খাবার দেওয়া স্টার্ট হয়, তখনও এই সমস্যাটি হতে পারে। যেসব শিশুরা শুধু বুকের দুধ পান করে, তাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হয় না বললেই চলে। গরুর দুধ কিংবা ফমুর্লা দুধ পানের ফলে অনেক বাচ্চাদের এ সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে। মায়ের বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল শিশুরা দিনে ৫ থেকে ১০ বার অল্প অল্প পায়খানা করতে পারে। এটি স্বাভাবিক। আবার কিছুদিন পরে আবার পুরো সপ্তাহে মাত্র একবার পায়খানাও করতে পারে। তাও স্বাভাবিক! কিন্তু এই সময়টা যদি আরো বেশি হয় তাহলে সেটি চিন্তার বিষয়। শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য বা কন্সটিপেশন দূর করার ঘরোয়া উপায় নিয়েই আজকের আর্টিকেল।

কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার লক্ষণ

কোষ্ঠকাঠিন্য-এর বেশ কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, সেগুলো প্রত্যেক বাবা-মায়ের জেনে রাখা উচিত।

  • অনিয়মিত মলত্যাগ
  • পেট শক্ত হয়ে থাকা বা পেট ফুলে থাকা
  • মাঝেমাঝে পেটে ব্যথা হওয়া
  • মলের সাথে রক্ত যাওয়া
  • পটি করার সময় অতিরিক্ত প্রেসার দেওয়া এবং কান্নাকাটি করা
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া ইত্যাদি

শিশুর কোষ্ঠ্যকাঠিন্য রোধে করণীয় কী?

১। শারীরিক কার্যক্রম বা হালকা ব্যায়াম

শারীরিক কার্যক্রম শিশুর পরিপাক ক্রিয়াকে গতিশীল করে। শারীরিক কার্যক্রমের অংশগ্রহণ হিসাবে শিশুর নিয়মিত খেলাধুলা করা উচিত। যদি শিশুর বয়স ১ বছরের কম হয় তাহলে বাবা-মাকে সাহায্য করতে হবে। শিশুর হাত-পা নাড়াচাড়া করুন। শিশু শুয়ে থাকলে তার পা দুটোকে ধীরে ধীরে সাইকেল চালানোর মত করতে পারেন। সারাদিনে কমপক্ষে ১ ঘন্টা হলেও শিশু যেন শারীরিক কার্যক্রম করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

২। কুসুম গরম পানিতে গোসল

এসময় শিশুকে কুসুম গরম পানিতে গোসল করাতে পারেন। এতে পেটের পেশি রিলাক্স হবে এবং পরিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক হবে। এছাড়া এটি তাকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিবে।

৩। অধিক পরিমাণে পানি পান করানো

পানি খাবার হজমে সহায়তা করে। পানি খেলে মলাশয় পরিষ্কার হয় এবং শরীর নতুন করে খাবার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে সহজেই। ৬ মাসের পর থেকে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করানোর চেষ্টা করুন। এছাড়া পানি পান করতে না চাইলে ফলের জুস বা স্যুপ খাওয়াতে পারেন।

৪। আঁশযুক্ত খাবার

৬ মাস পূর্ণ হওয়ার পর আস্তে আস্তে শিশুকে সলিড ফুডে অভ্যস্ত করতে হবে। শিশুর খাদ্যতালিকায় আঁশ জাতীয় খাবার রাখুন। খাদ্যের আঁশ অংশটুকু হজম না হওয়ার কারণে এগুলো পরিপাকতন্ত্রের বেশ কিছু জলীয় অংশ শোষণ করে ধরে রাখে এবং এটি জলীয় অংশসহ মলের সাথে বের হয়ে আসে যা কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে। তাই শিশুর খাবারে শাক, মিষ্টি আলু, কলমি শাক, পুদিনা পাতা, পুঁইশাক, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, কাঁচা পেঁপে ইত্যাদি খাবার রাখুন।

৫। পেট ম্যাসাজ

শিশুর পেটে আলতোভাবে ম্যাসাজ করতে পারেন। যেমন আঙ্গুলের মাথা দিয়ে ঘড়ির কাঁটার প্যাটার্নে পেটের উপর হাত ঘুরাতে থাকুন। শিশুর পা দু’টি একসাথে ধরে পেটের দিকে আস্তে আস্তে ঠেলে দিন। এই ম্যাসাজগুলো শিশুর গ্যাসের ব্যথা কমাতে দারুণ কাজ করে।

৬। ফলের রস

শিশুর বয়স ৬ মাস হলে তাকে অল্প পরিমাণে ফলের জুস দিন। বাজারের কেনা ফলের জুস নয়, ঘরের তৈরি একদম ফ্রেশ ফলের জুস দিন। ২-৪ আউন্স অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হবে। ফলের রস শিশুর কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করবে।

৭। নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস

শিশুর নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলুন। যখন সে আপনার কথার রেসপন্স করতে শিখে যাবে বা বুঝতে শিখবে, সেই সময়ই পটি ট্রেইন করিয়ে ফেলুন। শিশু পটিতে বসতে না চাইলে তাকে বকা না দিয়ে বুঝিয়ে এবং পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে তাকে উৎসাহিত করুন। শিশু যদি কোনো নির্দিষ্ট বাথরুমে যেতে পছন্দ করে, তবে তাকে সেই সুযোগ দিন।

৮। জাঙ্ক ফুড এবং বেশি পরিমাণে মাংস জাতীয় খাবার না খাওয়ানো

শিশু যেন অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড এবং মাংস জাতীয় খাবার খাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য এর অন্যতম একটি কারণ হলো জাঙ্ক ফুড। কলিজা, বিফ, মাটন এগুলো পরিমিত পরিমাণে খাওয়াবেন, ঠিকমতো হজম হচ্ছে কিনা সেটাও খেয়াল রাখবেন। কন্সটিপেশন হলে রেড মিট অ্যাভোয়েড করে বাচ্চাকে পেঁপের পিউরি, পাকা কলা এবং সহজপাচ্য খাবার খেতে দিন।

৯। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন

শিশু যদি বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল থাকে, তবে মায়ের খাবারে পরিবর্তন আনতে হবে। বেশি পরিমাণে শাক সবজি, ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন। মাংস জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। বাইরের তেল মসলা দেওয়া গুরুপাক খাবার থেকে দূরে থাকুন।

নতুন মায়েরা আজকের আর্টিকেল থেকে অনেক কিছু জানতে পারলেন আশা করি। কোনো স্পেসিফিক ফর্মুলা দুধ যদি আপনার বেবির পটি টাইট করে দেয় বা ঠিকভাবে হজম না হয়, সেটা খাওয়ানো বন্ধ করে দিন বা ফর্মুলা দুধ চেঞ্জ করে দেখুন। ইসুপগুলের ভুষি পেট নরম করে। তাই শিশুর রাতে খাওয়ার পর গরম দুধে ইসুপগুলের ভুষি মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন। এটি শিশুর মলত্যাগকে সহজ করবে। তবে ৬ মাস পর্যন্ত শিশুর জন্য শুধুই মায়ের বুকের দুধ-ই একমাত্র খাদ্য। ঘরোয়া এই উপায়গুলোতে যদি শিশুর কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর না হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। মা-বাবার সচেতনতা-ই পারে শিশুকে এই সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি দিতে।

ছবি- cdnparenting, sleepingshouldbeeasy

4 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...