কেওক্রাডং | আকাশ আর পাহাড়ের নিবিড় বন্ধুত্ব যেখানে মিলেমিশে একাকার

কেওক্রাডং | আকাশ আর পাহাড়ের নিবিড় বন্ধুত্ব যেখানে মিলেমিশে একাকার

4

পাহাড়ের মায়া বড় আসক্তির, এই আকাশ ছোঁয়ার নেশা একবার পেয়ে বসলে বার বার মন টানে পাহাড় চড়তে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হলো পাহাড়ি অরণ্যের মায়াভূমি। যারা ট্রেকিং করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য দেশের আদর্শ গন্তব্য হল বান্দরবান-খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি অঞ্চল। এ অঞ্চলের সবুজ ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়, পাহাড়ি ঝর্ণা, নদী, ঝিরিপথ, জুম সবকিছুর মাঝেই আলাদা একরকম মায়া আর সৌন্দর্য্য বিরাজ করে যা অবহেলা করা অসম্ভব। এ অঞ্চলের নানা স্থানের মধ্যে পাহাড়প্রেমীদের নজরে সবসময় থাকা একটি লক্ষ্য হলো বান্দরবানের কেওক্রাডং।

কেওক্রাডং 

বাংলাদেশের সবচাইতে উঁচু দুই পাহাড়ের একটি কেওক্রাডং। একে জয় করা যেমন এক নেশা, ঠিক তেমনই এর যাত্রাপথের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যও আরেক মোহনীয় রূপের গল্প। পাহাড়ে যাওয়ার যাত্রাপথে পাবেন বগালেক, স্থানীয়দের সাজানো গুছানো কিছু গ্রাম, ছোটবড় ঝর্ণা ও ঝিরিপথ, হ্যালিপ্যাড সহ আরও অনেক কিছু। আজ আপনাদের জানাবো এই পাহাড়যাত্রা নিয়ে প্রয়োজনীয় সব তথ্য।

কেওক্রাডং

বগালেকের রহস্যঘেরা সৌন্দর্য্য

কেওক্রাডং যাত্রাপথে পাবেন বগাকাইন হ্রদ বা বগালেক। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির প্রাকৃতিক হ্রদ, যার অবস্থান কেওক্রাডং এর কোল ঘেষে বমদের গ্রাম বগামুখ পাড়ায়। অনেক পুরোনো এ প্রাকৃতিক লেকের সৌন্দর্য্য যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনই একে নিয়ে নানা রোমাঞ্চকর কল্পকাহিনীও রচিত আছে। স্থানীয় বমপাড়ায় প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, এ লেকের জায়গায় খুমি নামের একটি গ্রাম ছিল। একজন দেবতার হত্যা আর পরবর্তীতে দেহ গ্রাস করার শাস্তি পায় গ্রামবাসীরা আর খুমি নামের এ গ্রামটি ধ্বংস হয়ে গিয়ে সে জায়গায় তৈরি হয় এ গভীর হ্রদের। হ্রদের গভীরে দেবতার পরমাত্মার আশীর্বাদ/অভিশাপ দুই-ই এখনো বিদ্যমান বলে স্থানীয় লোকেরা বিশ্বাস করেন। স্থানীয়রা এতে মাছ চাষ করেন আর একে ঘিরেই গড়ে ওঠেছে বগামুখপাড়া। লেকের আশপাশ ঘিরে পর্যটকদের জন্য গড়ে তোলা কটেজগুলো থেকে লেকের সৌন্দর্য্য আর রহস্য দুই-ই উপভোগ করা যায়।

বগালেক

বগালেকের পাড় ঘেঁষে পাহাড়ের এক তারার রাত

১৪ জনের গ্রুপ নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বাসে করে সকাল সকাল বান্দরবান পৌঁছানোর পর নাশতা করে নেই সবাই। তারপর চান্দের গাড়িতে করে রওনা হয়ে যাই রুমা বাজারের দিকে। রুমা বাজার থেকে বগালেকের রাতের খাবারের বাজার সেরে নিই। তারপর আরেকবার চান্দের গাড়ির আনন্দ নিতে নিতে চলে গেলাম বগালেকে। মনে রাখবেন, পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অবশ্যই সবসময় সাথে রাখতে হবে আর প্রত্যেকটি চেকপোস্টে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে সহযোগিতার সাথে অংশগ্রহণ করতে হবে।

বগালেকে চেকিং এর পর আমরা সোজা চলে গেলাম আমাদের কটেজে। পাহাড়ের ওপরের সেই কটেজ থেকে নীল মেঘের কুয়াশার চাদরে ঘেরা সবুজ পাহাড় দেখতে স্বপ্নের মতো লাগে। অন্য পাশে লেকের রহস্যময়ী রূপ। সব মিলিয়ে সূর্যাস্তের সেই দৃশ্য এখনো আমার মনে ধরে আছে। বমদের পাড়ায় চাদর মুড়ি দিয়ে আমরা কয়েকজন ঘুরতে গেলাম। সেখানকার মানুষদের পরিশ্রমী জীবন, আতিথেয়তা, অদ্ভুত সব গুণ আমাদের মুগ্ধ করল। হাতে গড়া তাঁতের থামি আর শীতের চাদর কিনে নিলাম গুণী এক পাহাড়ি মেয়ের দোকান থেকে। তারপর পাশের দোকানে বসে খেলাম গুড়ের চা, বিস্কিট আর পাহাড়ি ফলমূল। সেখানকার প্রকৃতি আর জীবনধারাতেই যে আলাদা মায়াবী একটা ব্যাপার আছে তা মুগ্ধ করবে যে কোনো পর্যটককে।

আতিথেয়তা

সন্ধ্যা নামলো, অন্ধকারে তারার ফুল ফুটে উঠলো সমগ্র আকাশ জুড়ে। পাহাড়চূড়ার কটেজের বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে সবাই মিলে গাইলাম পাহাড়ি গান আর দেখলাম আকাশ জুড়ে তারার মেলা। রুমা বাজার থেকে আমাদের কিনে আনা জিনিসপত্র দিয়েই হল রান্নাবান্না আর বারবিকিউ খাবারের উৎসব। গরম গরম খাবার আর শীতের রাতে পাহাড়ের সবুজ গাছপালা আর ফুলের সুগন্ধ! সব মিলিয়ে না ভোলার মতোই ছিল প্রতিটা মুহূর্ত।

কেওক্রাডং এর পথে যাত্রা শুরু

বগালেকের পাড়ে কটেজে রাতের শেষে আমরা প্রস্তুত হলাম কেওক্রাডং জয়ের স্বপ্ন নিয়ে। সকাল সকাল বগামুখপাড়ায় হলো নাশতা। তারপর একসাথে যাত্রা শুরুর আগে তুলে নিলাম একটি গ্রুপ ছবি যার স্মৃতি আজও মোবাইলের গ্যালারিতে বড় যত্নে রয়ে গেছে। বন্ধুরা সকলে মিলে যাত্রাপথের প্রয়োজনীয়তা বুঝে কিছু চকলেট, স্ন্যাকস আর পানি নিয়ে নিলাম। শুরু হয়ে গেলো সবচেয়ে উঁচু পাহাড় জয়ের জয়যাত্রা। যাত্রার শুরুতে শরীরে অনেক বেশি শক্তি থাকলেও কিছুক্ষণ পর অনেকেই কিছুটা দমিয়ে যায়। কিন্তু যতই উপরের দিকে যাচ্ছিলাম আর গ্রামগুলো পার হচ্ছিলাম, ততই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম আশেপাশের সৌন্দর্য্য। ক্রমেই উপলব্ধি করছিলাম যে, এ যেন মানুষের জগত নয়, এ যেন স্বর্গের এক টুকরো পৃথিবীতে রয়ে গেছে!

যাত্রা শুরু

দু’পাশের গিরিখাদ, সবুজ ঘেরা পাহাড়, দু’দিকের সুনীল আকাশ আর তুলার মতো মেঘ, শীতের সূর্যের মিষ্টি রোদ, নানা রঙ এর পাহাড়ি ফুল, পাখি সব মিলিয়ে আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম আমার দেশের এমন রূপে। আমরা কয়েকবার পাহাড়ের ছোট দোকানগুলোতে ফল, চা ও অন্য সব খাবার খেয়ে নেই। পাহাড়ি ফলের মিষ্টি স্বাদ অন্য অঞ্চলের ফল থেকে আলাদা।

ঝর্ণার সৌন্দর্য্য ও দার্জিলিং পাড়া

কেওক্রাডং ওঠার কিছুটা মাঝামাঝিতে পড়বে চিংড়ি ঝর্ণা। ঝিরির ঠান্ডা মিঠা পানি পানের লোভ সামলাতে না পেরে ওখানে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম আমরা। তারপর পানি নিয়ে আবার রওনা হলাম উঁচুর দিকে। উঁচু নিচু পথ, খাড়া শুকনো মাটির ঢাল, ঝিরিপথ, জঙ্গল, ছোট ছোট গ্রাম, কী নেই সেখানে! কেনই বা কারো ফিরে আসতে মন চাইবে সেখানে গেলে! ওঠার সময় কিছু কিছু জায়গার সৌন্দর্য্য এতটাই মোহনীয় ছিল যে আমরা বসে মন জুড়িয়ে সব সৌন্দর্য্য চোখে ধরে আনা ছাড়া কোনো উপায়ই খুঁজে পাচ্ছিলাম না! হঠাৎ এক জায়গায় আমি অসংখ্য বুনোফুল দেখতে পাই। মনে হচ্ছিল যেন এক সমুদ্র ফুল নেচে নেচে গান গেয়ে বেড়াচ্ছে। আমি ফুলের ঝোপে ছুঁয়ে দিতেই শত শত রঙিন প্রজাপতি উড়াল দিল একসাথে। সে দৃশ্য আমৃত্যু না ভোলার মতো এক দৃশ্য ছিল।

দলের সবাই

তারপর আমরা গেলাম দার্জিলিং পাড়ায়। সেখানে দুপুরের খাবার সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার রওনা হলাম কেওক্রাডং এর যাত্রা সম্পন্ন করতে। সূর্যাস্তের আগেই চলে গেলাম হ্যালি প্যাডে। দেখে নিলাম আরেকটি অভাবনীয় সূর্যাস্ত। এবার পালা সূর্যোদয়ের!

কেওক্রাডং এর চূড়ায় গানের আসরের রাত

সূর্যাস্ত দেখা শেষে সবচেয়ে উঁচু পাহাড় বা পাহাড়ের রাজার মুকুটে আমরা আমাদের কটেজ বুঝে নিলাম। বারান্দায় বসে আমাদের যাত্রাপথের সৌন্দর্য্য নিয়ে কত কথা আর কত গল্প আমাদের! বিশ্রাম শেষে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে আমরা পাশের উঁচু চূড়ায় গেলাম। মনে হলো যেন গোটা দেশটা দেখতে পাচ্ছি চূড়া থেকে। শুধু দেখতে পাচ্ছি না শহরের ব্যস্ততা, গাড়ি ঘোড়া, যানজট আর শুনতে পাচ্ছি না ট্রাফিকের শব্দ। যতদূর চোখ যায় দেখতে পাচ্ছি সবুজের ওপর কুয়াশার চাদর আর শুনতে পাচ্ছি শান্তি ও সৌন্দর্য্যের গান। সবাই মিলে পাহাড় চূড়া থেকে ফানুস উড়ালাম আর চেয়ে চেয়ে দেখলাম তারার মত জ্বলজ্বলে, নিভু নিভু দূরে ভেসে যাওয়া ফানুসদের। গভীর রাত পর্যন্ত পাহাড় চূড়ায় শুয়ে গাইলাম প্রকৃতির, জীবনের, দেশের আর অনুভূতির গান। অমন বিশাল আকাশ আমি আগে কখনো দেখিনি, এর বিশালতার যেন কোনো শেষ নেই।

ভোরের কেওক্রাডং

ভোরের কেওক্রাডং

ভোরবেলা সূর্য উঁকি দিল পাহাড়ের ওপার থেকে। আমরা কটেজের বারান্দায় বসে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আর গাইলাম ‘এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায়, হেরিনু পল্লী জননী!

এখনো যদি এ নিয়ে ভাবি, চোখ বন্ধ করলেই সুবাস পাই পাহাড়ের, দেখতে পাই সে রূপ, সে মহিমা! এ অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলবো না। অবশ্যই ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে ঘুরে আসার কথা বলতে চাই সবাইকে। তবে সেখানে যেহেতু সবাই অতিথি হিসেবে যাচ্ছেন, স্থানীয়দের প্রতি সবাই সম্মান প্রদর্শন করুন আর প্রকৃতির সৌন্দর্য্য রক্ষা করতে সাহায্য করুন। যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলবেন না। আজ তবে এখানেই গল্পের ইতি টানি, আবারো হয়তো কোনো পাহাড়ের গল্প নিয়ে হাজির হব।

 

ছবিঃ মাশতুরা শিকদার খুশবু, পিন্টারেস্ট

3 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...