মহিলাদের হাড় ক্ষয় কেন হয়, লক্ষণ ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণের উপায়

মহিলাদের হাড় ক্ষয় কেন হয়, লক্ষণ ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণের উপায়

bone

বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড় ক্ষয় খুবই সাধারণ একটি শারীরিক সমস্যা। সাধারণত পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এর প্রবণতা কয়েকগুণ বেশি। আমাদের দেশে মা, খালা, ফুপুসহ বেশিরভাগ চল্লিশোর্ধ মহিলাদেরই কমন সমস্যা পা ব্যথা, কোমর ব্যথা। এর জন্য যে কয়টি কারণ আছে তার মধ্যে ভিটামিন ডি এর অভাব অন্যতম। ভিটামিন ডি এর অভাবে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। মারাত্মক হাড় ক্ষয়ে খুবই সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে। আজকের আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করবো মহিলাদের হাড় ক্ষয় বা অস্টিও আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে।

মহিলাদের হাড় ক্ষয় এর লক্ষণ

১) হাড়ের ক্ষয় যে কোনো হাড়ে বা জয়েন্টেই হতে পারে। তবে সাধারণত হাত, হাঁটু, কোমর ও মেরুদণ্ডের জয়েন্টে বেশি হয়।

২) ঋতুস্রাব বন্ধের আগে এবং পরে নারীদের খুব সাধারণ অভিযোগ থাকে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা নিয়ে।

৩) দীর্ঘক্ষণ হাঁটলে বা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়াতে গেলে হাঁটু ও কোমর ব্যথা করে।

মহিলাদের হাড় ক্ষয়

৪) আক্রান্ত জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, লাল হওয়া এবং তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

৫) জয়েন্ট এর ফ্লেক্সিবিলিটি কমে যায়। নড়াচড়া করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

৬) হাঁটার সময় হাঁটুর জয়েন্টে কট কট শব্দ অনুভূত হয়।

মহিলাদের এ সমস্যা কেন বেশি হয়?

পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের হাড় বেশি ক্ষয় হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সেগুলো হলোঃ

মেনোপজ, ওজন ও অন্যান্য

মহিলাদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ মেনোপজ শুরু হয়। এর ফলে ইস্ট্রোজেন এর ঘাটতি হয়, যা হাড়ের ক্ষয় আরো বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম না করা, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ না করা, শরীরের ওজন বিএমআই অনুযায়ী অতিরিক্ত কম হলে, দীর্ঘদিন বসে বাসন মাজা, ঘর মোছা, রান্নার কাজ করলে, অতিরিক্ত ধূমপান বা অ্যালকোহল পান করলে এ সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। গর্ভধারণ এবং বুকের দুধ পান করানোর ফলে মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণেও হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অস্টিও আর্থ্রাইটিস

রোগ সংক্রান্ত কারণ

মহিলাদের শরীরে যদি থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেড়ে যায়, স্তন ক্যান্সার, ব্রেন স্ট্রোকের মতো রোগে যদি দীর্ঘদিন শুয়ে থাকতে হয় তবে হাড় ক্ষয়ের মাত্রাও বেড়ে যায়। এছাড়া কিছু কিছু ঔষধ লম্বা সময় ধরে সেবন করলে তা হাড় ক্ষয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। যেমন, জন্ম নিয়ন্ত্রণের ইনজেকশন, অ্যান্টিসাইকোটিক ড্রাগ, ক্যানসার কেমোথেরাপির ড্রাগস ইত্যাদি। অনেক সময় জেনেটিক্যাল বা বংশগত কারণেও হাড়ের ক্ষয় হতে পারে।

হাড় ক্ষয় প্রতিরোধে করণীয়

১) সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা, যেমন- প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার গ্রহণ করা। ননী তোলা দুধ, গরুর কলিজা, চিজ, ডিমের কুসুম, কম স্নেহজাতীয় দই, কড লিভার অয়েল ইত্যাদি খাবারে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম রয়েছে।

২) ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করতে হবে।

৩) হুটহাট যেন পড়ে না যান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৪) ৫০ বা তার উর্ধ্বের বয়সী নারীরা হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয় করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দুধ পান

৫) প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য রোদ পোহাতে পারলে ভালো। সকাল বা বিকালের হালকা রোদে ব্যায়াম করা উচিত। এতে শরীরের চামড়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি উৎপন্ন হবে।

৬) জীবন যাপন পদ্ধতি বা লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনতে হবে। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ইত্যাদির মাধ্যমে শরীর সচল রাখুন। এতে হাড় মজবুত হবে।

৭) স্ট্রেস বা উদ্বিগ্নতা পরিহার করুন। স্ট্রেসের ফলে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয় যা ক্যালসিয়াম হজমে বাধা সৃষ্টি করে।

৮) মহিলারা এক গ্লাস দুধ প্রতিদিন অবশ্যই খাবেন। এতে ভিটামিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম আছে প্রচুর। মজবুত হাড় গঠন এবং হাড়ের সুস্থতার জন্য ক্যালসিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।

ব্যথা নিয়ন্ত্রণ

ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে হাড়ের ক্ষয় বাড়তে থাকে। একবার হাড় ক্ষয় শুরু হলে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ক্ষয়ের গতি কমানো যায় এবং সাময়িক ব্যথার উপশম করা যায় শুধু। যে কাজগুলো করলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবেঃ

  • হাঁটু ভাঁজ করে কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে
  • নিচু মোড়া, পিঁড়ি বা জলচৌকিতে বসা যাবে না
  • একটানা বেশিক্ষণ বসে থাকা যাবে না বা হাঁটা যাবে না
  • উঁচু কমোড ব্যবহার করতে হবে
  • হাঁটু ভাঁজ করে বা বসে নামাজ পড়তে সমস্যা হলে উঁচু চেয়ারে বসে নামাজ পড়তে হবে
  • ফিজিওথেরাপি, নিয়মিত বিভিন্ন রকম ব্যায়াম এবং ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করা
  • বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা, যেমন- আক্রান্ত জয়েন্টে স্টেরয়েড ইনজেকশন, পি আর পি (প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা) থেরাপি, স্টেম সেল প্রতিস্থাপন, নার্ভ ব্লক ইত্যাদি

সাধারণত দেখা যায় বেশিরভাগ রোগীই উপরোক্ত চিকিৎসার মাধ্যমেই ভালো হয়ে থাকেন। তবে কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। যেমন, জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট বা হাঁটু প্রতিস্থাপন অপারেশন। শারীরিক কোনো সমস্যাই অবহেলার নয়। তবে মহিলাদের হাড় ক্ষয়ের সমস্যা যেহেতু বেশি হয়, তাই এ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে আগে থেকেই। নিয়মিত শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।

 

ছবিঃ সাটারস্টক

15 I like it
1 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...