পিত্তথলিতে কৃমি | পেট ব্যথার জন্য এই কারণটি দায়ী নয় তো?

পিত্তথলিতে কৃমি | পেট ব্যথার জন্য এই কারণটি দায়ী নয় তো?

pain

বাচ্চাদের পেটে কৃমি হয় এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু তাই বলে পিত্তথলিতেও কৃমি! হ্যাঁ, পিত্তথলিতেও কৃমি হতে পারে! আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সমগ্র জীবনে একবার হলেও কৃমি রোগে ভুগেছেন। বিভিন্ন প্রকার কৃমির মধ্যে সাধারণত গোল কৃমি (Ascaris Lumbricoides) সংক্রমণের সংখ্যাই বেশী। এই গোল কৃমি চলতে চলতে একসময় ক্ষুদ্রান্ত হয়ে পিত্তথলিতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করে। পুরুষের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। পেট ব্যথার জন্য এই কারণটি দায়ী কিনা সেটাও কিন্তু বিবেচনায় রাখতে হবে। পিত্তথলিতে কৃমি এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করতেই আমার আজকের লেখা।

পিত্তথলিতে কৃমি আক্রান্তের লক্ষণ

পেটের উপরের অংশে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হয়। যা বার বার হতে পারে এবং টানা কয়েকদিন থাকতে পারে। পেট ব্যথার সাথে আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে-

  • ব্যথা পিঠের মাঝ বরাবর থেকে শুরু করে ডান কাধের উপর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে
  • স্বল্প মাত্রার জ্বর সাথে বমি থাকতে পারে
  • বমির সাথে কৃমি বের হতে পারে
  • খাওয়ার রুচি কমে যায়
  • পিত্তথলি সরু হয়ে ঘা হয়ে যেতে পারে এবং সেখানে পুঁজ জমতে পারে
  • যকৃতের পিত্তথলি সংলগ্ন অংশে পুঁজ জমতে পারে

জটিলতা

১) পিত্তথলিতে কৃমি হলে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এই কৃমির আলাদা পরিপাকতন্ত্র নেই, তাই এরা সরাসরি রক্তকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যার ফলে রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়।

২) আন্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা বা ইন্টেস্টিনাল অবস্ট্রাকশন হতে পারে যার ফলে প্রচন্ড পেটে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, খাবারে অরুচি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

৩) অন্ত্রের ভেতর চলতে চলতে কৃমি পিত্তনালিতে চলে গেলে পিত্তথলি থেকে পিত্ত রস বের হতে পারে না। তখন জন্ডিস হতে পারে, একে অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস বলে। এই জন্ডিসে ত্বকে হতে পারে অসহনীয় চুলকানি।

৪) অগ্ন্যাশয়ের নালিতে গিয়ে নালিপথ বন্ধ করে দিয়ে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা প্যানক্রিয়াটাইটিস সৃষ্টি করতে পারে।

৫) এপেন্ডিক্স এ গিয়ে আটকে গিয়ে এপেন্ডিসাইটিস সৃষ্টি করতে পারে।

৬) শরীর মারাত্মকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাস্থ্য ভেঙে যায়।

পিত্তথলিতে কৃমি কেন হয়? 

কৃমির সমস্যা সাধারণত গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে বেশি দেখা যায়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব, অপুষ্টি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, অস্বাস্থ্যকর সুয়ারেজ ব্যবস্থা এর মূল কারণ। যেকোনো বয়সের মানুষের কৃমি হতে পারে। তবে শিশুদের মধ্যে কৃমির সমস্যা বেশি দেখা যায়, যার ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কী কী কারণে এই সমস্যাটি হতে পারে সেটা দেখে নিন।

১) খালি পায়ে মাটিতে চলাফেরা করলে।

২) অপরিষ্কার শাকসবজি, ফলমূল, নোংরা খাবার, দূষিত পানি ইত্যাদির মাধ্যমে কৃমির ডিম মুখে প্রবেশ করতে পারে।

৩) আক্রান্ত মানুষ যেখানে সেখানে মল ত্যাগ করলে সেখান থেকে কৃমির লার্ভা মানুষের পায়ের চামড়া ভেদ করে রক্তনালীতে প্রবেশ করে।

৪) আক্রান্ত ব্যক্তির কাপড় চোপড়, হাত পা ঠিকমতো না ধুলে নখের মাধ্যমে খাওয়ার সময় খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের পেটে প্রবেশ করতে পারে।

চিকিৎসা কী?

সাধারণত ঔষধ, এন্ডোস্কোপ অথবা অপারেশনের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। রোগীকে কৃমিনাশক ঔষধ দিয়ে এই রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচানো সম্ভব। ঔষধে কাজ না হলে ইআরসিপি (ERCP) করেও কৃমি বের করা যায়। কৃমি যদি পিত্তথলিতে গিয়ে মারা যায় বা আটকে গিয়ে থাকে এবং কোনো জটিলতার সৃষ্টি করে তাহলে অপারেশনের মাধ্যমে তা অপসারণ করা যায়।

পিত্তথলিতে কৃমি প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

  • মল ত্যাগের পর, খাবার খাওয়ার আগে, খাবার তৈরি এবং পরিবেশনের আগে সাবান বা হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
  • হাতের নখ নিয়মিত কেটে ছোট রাখতে হবে এবং পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • ধুলাবালি বা মাটিতে খালি পায়ে হাঁটা যাবে না।
  • শাকসবজি, ফলমূল, তরকারি ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে।
  • অর্ধ সিদ্ধ বা কাঁচা মাংস খাওয়া যাবে না।
  • পানি ফুটিয়ে খেতে হবে।
  • প্রতি চার মাস পর পর পরিবারের সবাইকে (গর্ভবতী এবং দুই বছরের নিচের শিশু বাদে) বয়স অনুযায়ী কৃমির ঔষধ খেতে হবে।
  • অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খেতে হবে।
  • পরিবারের সকল সদস্য একসাথে ঔষধ খেতে হবে অথবা একই বিছানায় যারা ঘুমান তারা অবশ্যই একসাথে কৃমির ঔষধ খেতে হবে।
  • বছরের যেকোনো সময় কৃমির ঔষধ খাওয়া যায়।

পেট ব্যথা হলে আমরা তো তেমন গুরুত্বই দেয় না, কিন্তু এটা কিন্তু সিরিয়াস কোনো হেলথ কন্ডিশনকে ইন্ডিকেট করতে পারে। কৃমিতে বেশি আক্রান্ত হলে ওজন কমে যাওয়া, মুখ দিয়ে অনবরত লালা পড়া অথবা পায়খানার রাস্তা বার বার হাত দিয়ে স্পর্শ করার প্রবনতা বেড়ে যায়। সেই হাতই আবার মুখে দেয়ার ফলে কৃমির ডিম মুখ হয়ে পেটে চলে যায় এবং কৃমির জীবন চক্র চক্রাকারে চলতেই থাকে। এ বিষয়ে মানুষের ধারণা না থাকায় সুস্বাস্থ্য হতে বঞ্চিত হতে হয়। এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় সর্বপ্রথমে জনসচেতনতা তৈরী করা। আজকের আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য হেল্পফুল ছিল আশা করি। সবাই ভালো থাকবেন।

ছবি- healthychildren, Gettyimages

7 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...