পোষা কুকুর ও বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড় দিলে কি জলাতঙ্ক হতে পারে?

পোষা কুকুর ও বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড় দিলে কি জলাতঙ্ক হতে পারে?

dog-ct

শখের বশে ঘরে কুকুর, বিড়াল পোষা এখন নতুন কিছু নয়। খুব আদুরে স্বভাবের এবং সহজে পোষ মানে বলে পোষা প্রাণী হিসেবে কুকুর, বিড়াল এখন বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ঘরে পোষ মানানোর আগে পোষা প্রাণী এবং তার সাথে সাথে ঘরের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা অবশ্যই চিন্তা করতে হবে। পোষা কুকুর ও বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড় দিলেও জলাতঙ্ক রোগ হতে পারে। শুধু ঘরের পোষা প্রাণীই নয়, বাইরের কুকুর-বিড়ালের আঁচড় কামড়ও ডেকে আনতে পারে নানা বিপদ। সে বিষয়েই বিস্তারিত কিছু তথ্য জেনে নেই চলুন।

কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে যা হতে পারে

  • মারাত্মক গভীর ক্ষত ও ফ্র্যাকচার হতে পারে
  • ধনুস্টংকার হতে পারে
  • জলাতঙ্ক হতে পারে
  • ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগও কুকুর বিড়ালের আঁচড় বা কামড় থেকে ছড়াতে পারে
  • জোরে কামড়ালে ত্বকের নিচের রক্তনালী, স্নায়ু ও পেশীর ক্ষতি হয়
  • দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের, তাদের পাস্তুরেলা রোগ হতে পারে। যার ফলে গাট ও গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, হাঁটাচলায় সমস্যা হতে পারে

জলাতঙ্ক কখন হয়?

র‍্যাবিস ভাইরাস দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হলে যে লক্ষণ প্রকাশ পায় তাকে জলাতঙ্ক বলে। এটি একটি মারাত্মক রোগ, যা একবার হলে রোগীকে বাঁচানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী মারা যায়। এই ভাইরাস একা একাই মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। শুধুমাত্র র‍্যাবিড এনিম্যাল যেমন কুকুর, শেয়াল, বিড়াল, বানর, ইঁদুর, বেজি, বাদুর, গরু, ছাগল ইত্যাদি যদি র‍্যাবিস ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে এবং মানুষকে কামড়ায় তবেই এ রোগ হয়। এসব জীবের মুখের লালায় র‍্যাবিস ভাইরাসের জীবাণু থাকে। তবে মনে রাখবেন কুকুর কামড়ালেই জলাতঙ্ক হবে না যদি না কুকুর বা কামড়ানো জীবের লালায় র‍্যাবিস এর জীবাণু থাকে। দাঁত বসিয়ে দিলে বা আঁচড়ের মাধ্যমে এ জীবাণু রক্তের সংস্পর্শে আসলে রক্তের মাধ্যমেই শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং জলাতঙ্ক রোগ সৃষ্টি করে।

জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ

  • রোগীর পানির পিপাসা বেড়ে যায়, কিন্তু পানি দেখলেই ভয় পায়
  • খাবার গিলতে কষ্ট হয়
  • মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা পড়ে
  • মেজাজ খিটখিটে বা আক্রমণাত্মক হয়ে যায়
  • জ্বর, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে
  • প্রলাপ বকতে পারে
  • অতিরিক্ত চঞ্চলতা বা অস্থিরতা দেখা দেয়

চিকিৎসা কী?

একবার রোগীর জলাতঙ্ক হয়ে গেলে তার আর কোনো চিকিৎসা নেই। কিন্তু কুকুর, বিড়াল বা যেকোনো প্রাণী আঁচড় বা কামড় দিলে জলাতঙ্ক যাতে না হয় সে জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রতিষেধক এর প্রয়োজন।

১) প্রথমেই আক্রান্ত স্থানের ক্ষত ও রক্তপাতের মাত্রা খেয়াল করতে হবে এবং রক্তপাত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধ করতে হবে।

২) সাবান ও উষ্ণ পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। কমপক্ষে ২০ মিনিট ধরে ক্ষতস্থান টিউবওয়েল বা ট্যাপের পানির ধারায় পরিষ্কার করতে হবে।

৩) কাটাস্থানে ধুলাবালি ও ময়লা যেন না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৪) ক্ষতস্থান বেশী গভীর হলে তাতে টাইট বাঁধন বা ব্যান্ডেজ দেয়া যাবে না। ক্ষতস্থান উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।

৫) ক্ষতস্থান পরিষ্কার করার সাথে সাথে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে বা ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী র‍্যাবিস ভ্যাক্সিন নিয়ে নিতে হবে।

৬) প্রথমদিন ভ্যাক্সিন দেয়ার পর ৩, ৭, ১৪ এবং ২৮ তম দিন মোট ৫ ডোজ টিকা নিতে হবে।

৭) র‍্যাবিস ভ্যাক্সিন এর সাথে সাথে ধনুস্টংকার বা টিটেনাস এর টিকাও দিতে হবে।

যে সমস্ত বিষয় মাথায় রাখতে হবে

  • অপরিচিত কুকুরের কাছে না যাওয়াই ভালো
  • কুকুরের স্বভাবে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে দ্রুত অন্যদেরকে জানাতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে
  • অসুস্থ কুকুর থেকে দূরে থাকুন
  • মা কুকুর যখন তার বাচ্চাদের সাথে থাকে তখন তার কাছে যাওয়া বা তাকে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকুন
  • কুকুর দেখলেই অযথা দৌড় দেওয়া যাবে না
  • কুকুরের মুখ থেকে কোনো কিছু টেনে বা ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না
  • রাস্তায় কুকুর দেখলে ঢিল দেয়া বা তাড়া করা যাবে না

কুকুরে কামড়ানো রোগীর সেবাদানকারীরও সতর্ক থাকতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সাবধানতার সাথে ধুতে হবে। সেবাদানকারীর হাতে কাটাছেঁড়া থাকলে সেখান দিয়েও তার শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে।

পোষা কুকুর ও বিড়াল এর ভ্যাক্সিন

পশুপ্রেমীদের জন্য চিন্তার কোনো কারণ নেই, কারণ এটার প্রতিষেধক ভ্যাক্সিন আছে। আপনার বাসায় যদি গৃহপালিত পশু থাকে, তাহলে অবশ্যই ভ্যাক্সিন দিন। নিকটস্থ পশু ক্লিনিক থেকে বা প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পোষা কুকুর ও বিড়ালকে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে। স্ত্রী কুকুরকে এই টিকা দিলে জলাতঙ্কমুক্ত বাচ্চা পাওয়া যায়।

পোষা কুকুর ও বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড় দিলে সেটাও কিন্তু নিরাপদ না, নিশ্চয় এখন সেটা বুঝতে পেরেছেন। বিশ্বে প্রতি ৯ মিনিটে ১ জন ও বছরে ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের। জলাতঙ্ক রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিন এশিয়ায় তৃতীয় সর্বোচ্চ। এ রোগে মৃত্যুর হার শতভাগ। তাই সতর্কতা অবলম্বন করা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই একমাত্র পথ। আজ এই পর্যন্তই, ভালো থাকবেন।

ছবি- ctvnews, dailypaws

18 I like it
8 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...