মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয় এবং প্রতিরোধের কোনো উপায় আছে কি?

মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয় এবং প্রতিরোধের কোনো উপায় আছে কি?

1

একবার এক পেশেন্ট ডাক্তারকে তার মাথাব্যথা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করছে! ডাক্তার এরপর বললেন ‘এবার আমি একটা প্রশ্ন করি! বলেন তো, ব্যাঙের ঘাড় ব্যথা হয় কি?’ পেশেন্ট তো অবাক! বললো ‘ব্যাঙের তো ঘাড়-ই নেই! ব্যথা কীভাবে হবে?’ তখন ডাক্তার বললেন ‘তার মানে আমাদের মাথা যেহেতু আছে, ব্যথা হবে, এটাই স্বাভাবিক। আর এর জন্য সমাধান আছে বটে’। একটু ভিন্নভাবে শুরু করলাম আজকের লেখাটা। মাইগ্রেনের ব্যথা খুবই কমন একটা শব্দ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। আমি নিজেই মাইগ্রেনের পেশেন্ট। মাইগ্রেন নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা থাকছে আজকের ফিচারে।

মাথা ব্যথা মানেই কি মাইগ্রেন?

মাইগ্রেন একটি কমন নিউরোভাস্কুলার ডিজঅর্ডার। সাধারণত মাথার এক সাইডে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে ১৫০ টিরও বেশি ধরনের মাথা ব্যথা দেখা যায়। যেগুলোকে দুইটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়, তা হলো প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি। মাইগ্রেন প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে পড়ে, কারণ এটি কোনো মেডিকেল কন্ডিশনের জন্য হয়ে থাকে। ডায়াগনোসিস এর জন্য কোনো ব্লাড টেস্ট বা অন্য কোনো মাধ্যম লাগে না। মাইগ্রেন বিশেষ ধরনের মাথা ব্যথা। তবে মাথা ব্যথা অন্য কারণেও হতে পারে, মাথা ব্যথা করছে মানেই যে আপনার মাইগ্রেন আছে, ব্যাপারটা এমন না!

মাইগ্রেনের ব্যথা

মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয়?

যদিও এই কারণটি এখনও যথাযথভাবে জানা যায়নি। তবে অধিকাংশের মতে এটি ব্রেইনের অ্যাবনরমাল অ্যাকটিভিটির ফলাফল যার কারণে ব্রেইনের নার্ভ ও ব্লাড ভেসেল আক্রান্ত হয়। ব্রেইনের এই টেম্পোরারি চেঞ্জ এর কারণ ক্লিয়ার করা যায়নি। তবে জেনেটিক্যাল কারণের পাশাপাশি কিছু ট্রিগার বা ফ্যাক্টর থাকে যেগুলো মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়িয়ে দেয়। যেমন-

  • অতি উজ্জ্বল আলো
  • হরমোনাল ইস্যু
  • ইমোশনাল ও ফিজিক্যাল স্ট্রেস
  • টায়ার্ডনেস বা এক্সেস ওয়ার্ক লোড
  • কিছু খাবার বা ড্রিংকস (চকলেট, পনির, কফি ইত্যাদি বেশি খাওয়া)
  • অতিরিক্ত ঘোরাঘুরি
  • অপর্যাপ্ত ঘুম
  • দীর্ঘসময় ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে কাজ করা বা টিভি দেখা ইত্যাদি

পুরুষ নাকি মহিলা কাদের মাইগ্রেন হবার চান্স বেশি?

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতি পাঁচজন মহিলায় একজন এবং প্রতি পনেরো জনে একজন পুরুষের মাইগ্রেন হয়ে থাকে অর্থাৎ মহিলাদের বেলায় এই হার কিন্তু তিনগুন বেশি! কারণ মহিলাদের হরমোনাল চেঞ্জ বেশি হয়। মাসিক, প্রেগনেন্সি ও মেনোপজ- এগুলো মাইগ্রেন পেইনের সাথে রিলেটেড। অনেক সময়ে মেনোপজের পর মাইগ্রেনের সমস্যা কমতে থাকে, আবার পিরিয়ডের আগে এটি বেশি হয়ে থাকে। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে ১৫-৫০ বয়সীদের মাইগ্রেন পেইন বেশি হয়ে থাকে।

মাইগ্রেন

কিছু কমন প্রশ্ন

১. এটি কি বংশগত?

হ্যাঁ, স্ট্যাডিতে এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। একটি পরিবারের পাঁচজনের মাঝে চারজনের মাইগ্রেন হওয়ার হিস্ট্রি রয়েছে।

২. বাচ্চাদের কি মাইগ্রেন হয়?

হতে পারে। পেডিয়াট্রিক মাইগ্রেন পেইন স্বল্প সময় ধরে হয় এবং এসব ক্ষেত্রে পাকস্থলী রিলেটেড সিম্পটম দেখা যায়।

৩. মাইগ্রেনে কি ব্রেইন ড্যামেজ হয় বা এর থেকে কি অন্য কোনো রোগ হতে পারে?

না, ব্রেইন ড্যামেজ হয় না। তবে এক্সট্রিম লেভেলে থাকলে চান্স থাকে স্ট্রোক হবার। যেমন ধরুন এক লাখের মাঝে ১ বা ২ জনের ক্ষেত্রে হতে পারে। তাই এটা নিয়ে টেনশনের কিছু নেই।

৪. বেশি বেশি পেইন কিলার খেলে মাইগ্রেন কমে?

অতিরিক্ত ওষুধ সেবন শরীরের জন্য ভালো না, ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খাবেন তবে শুধুমাত্র মেডিসিনের উপর নির্ভরশীল থাকবেন না।

পেইন কিলার

মাইগ্রেনের স্টেজ

মাইগ্রেনের চারটি স্টেজ এবং প্রত্যেকটি স্টেজের সিম্পটমস ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রায় ৮-৭২ ঘন্টা লাগে এই চারটি স্টেজ শেষ হতে। একেকজনের ক্ষেত্রে ব্যথার তীব্রতা, সময় ও ধরন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

Prodrome

একদম শুরুর পর্যায়, এ সময়ে কনসেনট্রেশনে সমস্যা, কথা বলা ও পড়তে কষ্ট, মাসল স্টিফনেস, বমি, লাইট, সাউন্ড সেনসিটিভিটি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। সময়কাল ৩ ঘন্টা থেকে কয়েকদিনও থাকতে পারে।

Aura

লাইটের ফ্ল্যাশ দেখা, ভিশনে ব্লাইন্ড স্পট, স্পিচে চেঞ্জ, কানের কাছে শব্দ বাজা, জিগজ্যাগ লাইন দেখা, স্মেল ও টেস্টে পরিবর্তন আসা ইত্যাদি সিম্পটমস দেখা দেয়। সময়কাল ৫-৬০ মিনিট হয়ে থাকে।

Attack

লাইট, সাউন্ড এবং স্মেল সেনসিটিভিটি, ক্ষুধা মন্দা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া ইত্যাদি। সময়কাল ৪-৭২ ঘন্টা হয়ে থাকে।

Post-drome

কনসেনট্রেশনে সমস্যা, ডিপ্রেশনে থাকা, কোনো কিছু বুঝতে সমস্যা হওয়া ইত্যাদি। এই স্টেজকে মাইগ্রেন হ্যাংওভার বলে এবং ৮০% মানুষ এই স্টেজ এক্সপেরিয়েন্স করে থাকে। সময়কাল ১-২ দিন হতে পারে।

প্রতিরোধের কোনো উপায় আছে কি?

ওষুধের পাশাপাশি কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়। তবে অবশ্যই ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ সেবন করবেন। লাইফস্টাইলে কিছু চেঞ্জ আনলে আপনি উপকার পাবেন। দেখে নিন সেগুলো কী কী-

১) ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখুন ডায়েটে

বলা হয়ে থাকে ডায়েটে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সূচনা করে থাকে। তাই, ডায়েটে রাখতে পারেন মিক্সড নাট অ্যান্ড সিড, কলা, ডার্ক চকলেট, ওটমিল ইত্যাদি। সেই সাথে আদাও বেশ উপকারী, কারণ বমি বমি ভাব কমাতে আদা বেশ ভালো কাজ করে।

ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার

২) পর্যাপ্ত হাইড্রেশন ও সাউন্ড স্লিপ

কাজের চাপে পানি খেতে ভুলে যান অনেকেই! হেলদি লাইফস্টাইল মেনটেইন করবেন, প্রচুর পরিমাণে পানি পান করবেন, সরাসরি কড়া রোদ থেকে দূরে থাকবেন। সেই সাথে রাতে ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। মাইগ্রেনের ব্যথায় ঠান্ডা পানি দিয়ে জলপট্টি দিলে সাময়িকভাবে বেশ আরাম পাওয়া যায়।

৩) চা, কফি ও কোমলপানীয় এড়িয়ে চলুন

পরিমিতভাবে চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। অতিরিক্ত কোমলপানীয় পান করার অভ্যাস থাকলে সেটাও বাদ দিন।

৪) অ্যাসেনশিয়াল অয়েল থেরাপি

যেকোনো ক্যারিয়ার অয়েলের সাথে ২/৩ ড্রপ ল্যাভেন্ডার অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মিক্স করে মাথার তালুতে আলতো হাতে মালিশ করে নিন, বেশ আরাম পাবেন। স্ট্রেস কমাতে ও ভালো ঘুমের জন্য ল্যাভেন্ডার অ্যাসেনশিয়াল অয়েল সাজেস্ট করা হয়। পেপারমিন্ট অ্যাসেনশিয়াল অয়েলও ব্যবহার করতে পারেন, সেইম বেনিফিট পাবেন।

৫) মেডিটেশন বা ইয়োগা

দিনের শুরুটা করুন কিছু এক্সারসাইজ, মেডিটেশন বা ইয়োগা দিয়ে। শরীর ভালো থাকার পাশাপাশি মাইগ্রেনের প্রবলেমটাও কমে আসবে। আপনি যতটা রিল্যাক্স ও ফ্রেশ থাকবেন, মাইগ্রেন ততটাই কমে যাবে। মেডিটেশন স্ট্রেস কমাতে দারুণ হেল্পফুল।

মেডিটেশন বা ইয়োগা

৬) ডায়েরি মেনটেইন করুন

আমরা প্রতিদিনই টুকটাক নোট করে থাকি, মাইগ্রেনের ব্যাপারেও তাই করুন। নোট রাখুন ব্যথাটা কবে কবে ও কতদিন পর পর হচ্ছে! ঐদিন কী কী কাজ করা হয়েছিলো বা কী খেয়েছেন, সেটাও টুকে রাখুন। এতে করে আপনি ট্রিগ্রার ফ্যাক্টরগুলো জানতে পারবেন। ডাক্তারকে হিস্ট্রি দিতেও সুবিধা হবে।

৭) চশমা ব্যবহার করুন

যাদের মাইগ্রেন এর সমস্যা আছে, তারা ল্যাপটপে একটানা কাজ করলে বা রোদে গেলে অবশ্যই ফটোসান চশমা বা পাওয়ার চশমা যদি থাকে সেটা ব্যবহার করুন। তবে চেষ্টা করবেন একটানা যেন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাজ না করতে হয়। একটু বিরতি দিয়ে কাজ করুন।

দেখুন একজন মাইগ্রেনের পেশেন্ট কিন্তু অবশ্যই জানেন যে তার মাইগ্রেনের ব্যথা কখন কখন হয়। সে অনুযায়ী জীবনযাত্রায় চেঞ্জ আনুন। কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করুন। সবসময়ই মনে রাখবেন নিজের শরীরের চেয়ে গুরত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই, সুস্থতা সবার আগে। তাই হেলদি লাইফস্টাইল মেনে চলুন, নিজের যত্ন নিন। আশা করি আজকের লেখাটা আপনাদের উপকারে আসবে। ভালো থাকবেন সবাই।

 

ছবি- সাটারস্টক, সাজগোজ

12 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...