মাইক্রোওয়েভ ওভেন | কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় (পর্ব-১) - Shajgoj



মাইক্রোওয়েভ ওভেন | কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় (পর্ব-১)


সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৮



আজকাল মাইক্রোওয়েভ ওভেন ছাড়া রান্নাঘর ভাবাই যায় না। মাইক্রোওয়েভ নিঃসন্দেহে মানুষের ব্যস্ত জীবনে অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। চটজলদি খাবার গরম থেকে শুরু করে কিছু রান্নাও তাতে করা চলে। কিন্তু এই যন্ত্রটি শরীর-স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করে কি? বিশেষজ্ঞরা এর নানা দিক তুলে ধরেছেন। মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিয়ে রান্নার স্বাস্থ্যগত বিষয়ে অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে। এটি কি স্বাস্থ্যসম্মত- এ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে বহু ব্যবহারকারীর মাঝে। অনেকেরই ধারণা এটি ব্যবহারে ক্যান্সারসহ আরও কিছু রোগ হয়। কিন্তু আসলে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ভাল-খারাপ দুটো দিকই কম বেশি আছে। সঠিক নিয়মে ব্যবহার করতে হবে তাহলেই কোন সমস্যা হবে না। সে বিষয়েই আপনাদের বিভিন্ন তথ্য দিব।

 

গ্যাস্ট্রলজি-এর চিকিৎসক অপূর্ব কুমার পাল বলেন, “আমি মনে করি মাইক্রোওয়েভে পাঁচ মিনিট বা দশ মিনিটের মধ্যে খাবারকে গরম করতে হলে বা রান্না করতে হলে ৫০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড-এরও অনেক বেশি তাপ ব্যবহার করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তিশালী রেডিয়েশন খাবারের  গুণাগুণ নষ্ট করে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন রকম ক্ষতি সাধন করে”। তিনি বলেন গ্যাস বা চুলার আগুনের তাপেও খাবারের পুষ্টিকর নিউট্রিয়েন্ট নষ্ট হয় কিন্তু মাইক্রোওয়েভ-এ রান্না করলে রেডিয়েশন এই উচ্চ তাপমাত্রার সৃষ্টি করে। রেডিয়েশন থেকে বিভিন্ন শারীরিক বিভ্রাট ঘটে। অসুস্থ ব্যক্তির কখনো মাইক্রোওয়েভ ওভেনে তৈরি বা গরম করা খাবারদাবার খাওয়া উচিত নয়।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আশীষ মুখপাধ্যায় বলেন, “মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রশ্মি নির্গত হয় তবে এই রশ্মি খুব ধীরে ধীরে কম মাত্রায় নির্গত হয় বলে এক্সরে, সিটিস্ক্যান বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত রেডিয়েশন-এর মতো হঠাৎ করে কোন ক্ষতি করতে পারে না তবে নিয়মিতভাবে যদি মাইক্রোওয়েভ-এর খাবার খাওয়া হয় তাহলে নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। দীর্ঘদিন ধরে মাইক্রোওয়েভ-এর খাবার খাওয়া হলে কোষের অক্সিজেন ভেঙে গিয়ে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি করে, এর ফলে ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে”। বয়স্কদের মধ্যে যতটা সমস্যা দেখা দিতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যা শিশুদের ও অল্পবয়সীদের হতে পারে। কারণ শিশুদের ও অল্পবয়সীদের শরীরের কোষ, পেশী ও অন্নান্য অঙ্গগুলোর তখনও খুব সক্রিয় থাকে। আঠারো বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। শিশু ও অল্পবয়সীদের মধ্যে মাইক্রোওয়েভ থেকে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।

নগরজীবনে গ্যাস ও সময় বাঁচাতে কিংবা থালাবাসন পরিষ্কারের ঝামেলা এড়াতে আজকাল মাইক্রোওয়েভ আছে অনেকেরই পছন্দের শীর্ষে। খাবার গরম করা তো বটেই, বেকিং থেকে শুরু করে রান্না করা পর্যন্ত অসংখ্য কাজে মাইক্রোওয়েভ হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের সঙ্গী।

ওভেন কেনার সময় যে সকল বিষয়গুলো জানা উচিত

বাজার থেকে ওভেন কিনতে এখন বেশকিছু ব্র্যান্ড পাবেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই চীনের তৈরি। একটু নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি বলে এসব ওভেন বেশিদিন টিকে না। তাই চেষ্টা করুন বাজেটটা একটু বাড়িয়ে কোনো ব্র্যান্ড শোরুম থেকে ওভেন কিনতে। ঢাকাতে স্যামসাং, সিঙ্গার, ফিলিপস, ন্যাশনাল-এর ওভেন কিনতে পাওয়া যায়। এসব শোরুমে পাবেন মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং ইলেকট্রিক মাইক্রোওয়েভ ওভেন। আর ইলেকট্রিক ওভেন কিনতে গেলে স্টেডিয়াম মার্কেট, বাইতুল মোকাররাম, বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট এসব জায়গা থেকে কিনতে পারেন। এধরনের ইলেকট্রিক ওভেনের দাম পড়বে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ব্র্যান্ড আর সাইজ অনুপাতে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর ইলেকট্রিক মাইক্রোওয়েভ ওভেন কিনতে পারবেন ৮ হাজার থেকে শুরু করে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব ওভেনের অধিকাংশই দেখা যায় সাদা আর কাল এই দুই রঙের হয়ে থাকে। আপনি এমন রঙের কিনুন যেটি আপনার ডায়নিং কিংবা কিচেনের ফার্নিচারের সাথে ম্যাচ করবে। পাশাপাশি সাদা রঙের জিনিসটা একটু দ্রুত ময়লা ধরে, সে কথাটাও মাথায় রাখুন।

রোটিসারি সিস্টেম: মূলত মাইক্রোওয়েভ ওভেনে এই রোটিসারি সিস্টেম-টি থাকলেই আপনি মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এও ইলেকট্রিক ওভেন-এর মত রান্নার কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এখানে তাহলে মাংস বা যে কোন কিছু গ্রিল বা রোস্ট করা যাবে। আর গ্রিল করার বাদবাকি সব সরঞ্জামও দেয়া থাকবে ওভেনের সাথেই, তাই কেনার সময় সব কিছু প্যাকেট খুলে বুঝে নিন আর বাড়ি গিয়ে রান্না চরাবার আগে একটু ম্যানুয়াল বইটি উল্টেপাল্টে পড়ে নিন।

মাইক্রো ওভেন ও ইলেকট্রিক ওভেনের মধ্যে পার্থক্য কী ?

মাইক্রোওয়েভ ওভেন

প্রথম প্রথম খুব অবাক লাগত যে, আমি প্লেটে করে খাবার দিচ্ছি ওভেনে। খাবার গরম হচ্ছে, কিন্তু প্লেট গরম হচ্ছে না। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? কারণ ওভেন থেকে যে গরম বাতাস খাবারকে গরম করার কথা, তা তো একই সাথে প্লেটটিকেও গরম করার কথা! কিন্তু সেরকম তো হচ্ছে না! আমার উপরের ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল! মাইক্রোওয়েভ ওভেনে আসলে এরকম কোনই যন্ত্র নেই যা থেকে কোন গরম বাতাস বের হয়ে খাবারকে গরম করে (অবশ্য কনভেকশন সিস্টেম ওভেন এ হিটার থাকে বেকারি আইটেম-এর জন্য)। আসলে ‘মাইক্রোওভেন’ এই নামটিতেই অনেকটা এর কাজের মূলনীতি লুকানো আছে। কি? ধরতে পারলেন না? ইংরেজিতে ব্যাপারটি পরিস্কার বুঝতে পারবেন। Micro + wave + oven = Microwave oven (যাকে আমরা সচরাচর ‘মাইক্রোওভেন’ নামে ডেকে থাকি)। মাইক্রোওভেন এ আসলে মাইক্রোওয়েভস এর মাধ্যমে খাবার গরম করা হয়। সাধারণত ২৫০০ মেগা হার্জ বা ২.৫ গিগা হার্জ-এর তরঙ্গ ব্যবহার করা হয় এসব যন্ত্রে। এই কম্পাঙ্কের তরঙ্গের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। তা হল এই কম্পাঙ্কের তরঙ্গ কেবলমাত্র পানি, চর্বি এবং চিনি জাতীয় বস্তু দ্বারা শোষিত হয়ে কম্পাংক তৈরি করে। আর শোষিত হওয়া মাত্রই তরঙ্গটি আনবিক তাপগতিতে পরিণত হয় এবং বস্তুটিকে গরম করে। সিরামিক, গ্লাস এবং অধিকাংশ প্লাস্টিক এই তরঙ্গ শোষণ করতে পারে না, আর এজন্যই ওভেনে পাত্র গরম হয় না এবং শক্তিরও অপচয় হয় না। মাইক্রো ওয়েভ ওভেনে কখনও ধাতব পাত্র ব্যবহার করা উচিত নয়। এটি বলা হয়ে থাকে কারণ ধাতব পাত্র মাইক্রো ওয়েভকে প্রতিফলিত করে এবং খাবারকে গরম হতে বাধা দেয়।

ইলেকট্রিক ওভেন

ইলেকট্রিক ওভেন এ সরাসরি হিটার লাগানো থাকে এবং তা থেকে গরম বাতাস বের হয়ে খাবারকে গরম করে। আশাকরি পার্থক্যটা বুঝতে পেরেছেন। আমার মতে মাইক্রোওয়েভ ওভেনই ভাল। এভারেজ পাওয়ার লস কম।

মূলত মাইক্রোওয়েভ ওভেন তিন প্রকারের হয়ে থাকে-

কনভেকশন মাইক্রোওয়েভ ওভেন: এর ফিচার হচ্ছে এতে একটি ফ্যান এবং তাপ প্রদানের উপাদান থাকে যা ওভেনের ভেতরে একটি বাতাস প্রবাহের একটি ধারা তৈরি করে। বাতাস প্রবাহ অতি দ্রুত রান্নাতে বাধা প্রদান করে এবং খাবারের সমগ্র অংশে তাপ প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই প্রকারের ওভেন বেকিং এবং খাবার খাস্তা রাখার জন্য উত্তম।

গ্রিল মাইক্রোওয়েভ ওভেন: এই ধরনের মাইক্রোওয়েভ ওভেন মূলত খাবারকে বাইরে দিয়ে খাস্তা এবং ভিতর দিয়ে জুসি রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। কাবাব, পরোটা, টিক্কা ইত্যাদি জাতীয় খাবার তৈরির জন্য এই ধরনের ওভেন উত্তম।

সোলো মাইক্রোওয়েভ ওভেন: এটি ব্যবহার করা যায় অনেকটা বেসিক ওভেন হিসেবে যা মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন দিয়ে ব্যবহৃত হয়। এটি খুব দ্রুততর সময় খাবারকে গরম করা এবং বরফ জমা খাবার পাতলা করার কাজে ব্যবহার করা যায়। এটি বেকিং-এর জন্য উত্তম।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন কেনার পূর্বে ৭টি লক্ষণীয় বিষয়

১. প্রথম ঠিক করে নিন কি কাজে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহার করবেন এবং আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করুন কোন প্রকার মাইক্রোওয়েভ ওভেন কিনবেন- কনভেকশন, গ্রিল নাকি সোলো।

২. এরপর ঠিক করে নিন ঠিক কি সাইজ-এর ওভেন আপনি কিনতে চাচ্ছেন- বড় নাকি কমপ্যাক্ট কারণ এর সাথে ওয়াটেজ (Wattage) সম্পর্কিত।

৩. এরপর দেখুন ওয়াটেজ কতো। ওয়াটেজ বেশি হলে রান্না দ্রুত হবে এবং কম হলে রান্নায় সময় বেশি লাগবে।

৪. কন্ট্রোল প্যানেলটা কি ধরণের হবে- মূলত মেকানিক্যাল কন্ট্রোল প্যানেল হেভি ও সবসময় ব্যবহারের জন্য উত্তম।

৫. মাল্টিস্টেজ কুকিং ফিচার আছে কিনা- এই ফিচারটা দ্বারা বিভিন্ন পাওয়ার সেটিং এবং স্টেজ-এ রান্নাটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

৬. বাচ্চাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য চাইল্ড সেফটি লক আছে কিনা দেখে নেয়া।

৭. পরিষ্কারকরণ নিশ্চিত করার জন্য ইজি ক্লিনিং অপশন আছে কিনা।

এই ছিল ওভেন সম্পর্কিত কিছু অত্যন্ত বেসিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরের পর্বে কথা হবে মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ রান্না করা খাবার নিয়ে। সুস্থ থাকুন। সাজগোজের সাথেই থাকুন।

 

লিখেছেন- নিকিতা বাড়ৈ

ছবি- ইউটিউব.কম, ফ্লিপকার্ট.কম, আলফাতাহ.কম.পিকে

মাইক্রোওয়েভ-এ রান্না করা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না খারাপ? (পর্ব-২)