প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা | নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য থাকুন সচেতন

প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা | নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য থাকুন সচেতন

1 (4)

গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সময় প্রতিটা মেয়েই তার অনাগত সন্তানকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখে! কিন্তু এই গর্ভাবস্থায় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এই সময়ে শরীরে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বাড়ে অথবা কমে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু হরমোন লেভেল নরমাল রেঞ্জে না থাকলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে। প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা বেশ কমন, এই হরমোনের মাত্রা ঠিক না থাকলে গর্ভের শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। এমনকি হতে পারে অকাল জন্ম, গর্ভপাত অথবা মৃতপ্রসব। প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ে আজকের ফিচার।

থাইরয়েড কী?

প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা কেন হয় বা এর প্রতিকার কী, এসব কিছু জানার আগে আমাদের জেনে নিতে হবে থাইরয়েড জিনিসটা আসলে কী! থাইরয়েড ক্ষুদ্র ও প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি যা গলার দুইদিকে অবস্থিত। এই গ্রন্থি উৎপাদন করে থাইরয়েড হরমোন এবং এই হরমোন শরীরের বৃদ্ধি, বিকাশ ও অন্যান্য কাজে সহায়তা করে থাকে। এটি হৃদস্পন্দনকে প্রভাবিত করতে পারে, এছাড়াও বিপাক প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব আছে।

থাইরয়েড

কখনও কখনও এই থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে হরমোন খুব বেশি অথবা খুব কম পরিমাণে নিঃসৃত হয়ে থাকে, আর তখনই ঘটে যায় বিপত্তি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন মহিলার থাইরয়েডের সমস্যা গর্ভাবস্থার আগে থেকেই থাকতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে, গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্ম দেওয়ার পরেই প্রথমবারের মতো থাইরয়েডের সমস্যা হয়। তবে এ নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। চিকিৎসা নিলে গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড বাড়লে বা কমলেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে হরমোনের মাত্রা যেন স্বাভাবিক রেঞ্জে থাকে, সেটা মনিটর করতে হবে।

প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা 

কাদের ক্ষেত্রে প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের ঝুঁকি বেশি থাকে, জেনে নিন তাহলে-

১. গর্ভবতী হওয়ার আগে থেকেই যেসব মহিলারা হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন সেসব মহিলারা এক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকে।

২. পূর্বের প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েড প্রবলেম ছিল, এই অবস্থায় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এমন মা-ও ঝুঁকিতে থাকে।

৩. হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজমের ফ্যামিলি হিস্ট্রি থাকলেও ঝুঁকি বেড়ে যায়।

হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম

হাইপারথাইরয়েডিজম 

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে গেলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়ে থাকে। প্রেগনেন্সিতে হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলো কী কী সেটা দেখে নিন তাহলে-

  • অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
  • মারাত্মক বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • মেজাজ খিটখিটে থাকা
  • হালকা কাঁপুনি
  • ঘুমের সমস্যা
  • সাধারণ গর্ভাবস্থায় যে ওজন থাকা উচিত তারচেয়ে ওজন হ্রাস পাওয়া বা কম ওজন থাকা

হাইপোথাইরয়েডিজম

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ কমে গেলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়ে থাকে। হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলো কী কী সেটা দেখে নিন তাহলে-

  • অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ক্লান্ত লাগা
  • স্বাভাবিকের থেকে ওজন বৃদ্ধি পাওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • কোনো কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া
  • প্রায়ই ভুলে যাওয়া
  • শারীরিক মিলনে অনীহা
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া

প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা হলে করণীয়

প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা

এই ধরনের লক্ষণ যদি আপনারও থাকে, তাহলে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্টের সাথে কথা বলুন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হোন আপনার থাইরয়েড লেভেল ঠিক আছে কিনা। রক্তে TSH, T3 ও T4 এর পরিমাণ থেকেই বোঝা যাবে এটা।

হাইপারথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে

যেসব মায়েরা গর্ভকালীন অবস্থায় হাইপারথাইরয়েডিজমের সমস্যার ভুগছেন, তাদের জন্য অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই অ্যান্টিথাইরয়েড ড্রাগ থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন কন্ট্রোল করে। প্রেগনেন্সিতে ডাক্তারের পরামর্শে মেডিসিন নিতে হবে। ডোজ কেমন হবে, কতদিন মেডিসিন কন্টিনিউ করতে হবে, সবই আপনাকে ডাক্তার জানিয়ে দিবেন। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মেডিসিন নিলে অবশ্যই থাইরয়েড কন্ট্রোলে আসবে।

হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে

লিভোথাইরক্সিন

হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে লিভোথাইরক্সিন নামে হরমোন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শমতো ডোজ গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু গর্ভকালীন অবস্থায় ভিটামিন, আয়রন ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট শরীরে থাইরয়েড হরমোনের নিঃসরণকে বাধা দিতে পারে, তাই লিভোথাইরক্সিন গ্রহণের ৩-৪ ঘন্টার মধ্যে এই ধরনের ট্যাবলেট খাওয়া উচিত না।

হাইপো বা হাইপার, দুই ধরনের ভারসাম্যহীনতাই মেডিসিনের মাধ্যমে ব্যালেন্স করা যায়। প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের সমস্যা হলে দ্রুত ট্রিটমেন্ট নিন, ৩ মাস পর পর ব্লাড টেস্ট করিয়ে থাইরয়েড লেভেল চেক করুন। ভয়ের কিছু নেই, তবে সচেতনতা জরুরি। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড ভালো রাখতে প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। রান্নাতে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত সয়াসস, প্রসেসড ফুড এগুলো এড়িয়ে চলবেন। তাহলে আজ এই পর্যন্তই। ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

 

ছবি- সাজগোজ, সাটারস্টক, ফার্স্ট ফর উইমেন.কম

1 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...