বয়ঃসন্ধিকালে একনে বা ব্রণের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়!

বয়ঃসন্ধিকালে একনে বা ব্রণের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়!

1

আমরা একটি চারা গাছকে যখন প্রতিদিন যত্ন নিয়ে বড় করি, তখন সেটা খুব ভালোভাবে বেশ তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠে। আর কোনো রকমে যদি যত্ন করেন বা অবহেলা করেন, চারাগাছ হয়তো ঠিকই বড় হবে কিন্তু মজবুত বা কোয়ালিটিফুল হবে না। একথা কেন লিখলাম জানেন, কিশোর বয়সে স্কিন ঐ চারা গাছের মতোই থাকে। এই সময়ে ত্বক খুব নাজুক থাকে, সঠিকভাবে যত্ন না নিলে পরে এক সময়ে যেয়ে এতটা ড্যামেজড হয় যেটা ঠিক করাটা রীতিমতো মুশকিল হয়ে যায়। তাই আজকে জানবো টিনেজ স্কিন কেয়ারের একটি বিশেষ অংশ নিয়ে। বয়ঃসন্ধিকালে একনে বা ব্রণের উৎপাত একটু বেশিই বেড়ে যায়। চলুন জেনে নেই এই ব্যাপারে বিস্তারিত।

পিম্পল নাকি একনে?

মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে এটা জানা জরুরি। অনেকে আমরা মনে করি দুটোই এক! কিন্তু একটু হলেও কিন্তু পার্থক্য আছে। পিম্পল বলতে সাধারণত shallow blemish/ হালকা স্পট সহ হোয়াইটহেডস এবং ব্ল্যাকহেডসকে বুঝায়, যেটি স্কিনের থিন লেয়ারের নিচে থাকে। সাধারণত এখানে ইনফ্ল্যামেশনের চান্স নেই।

বয়ঃসন্ধিকালে একনে

আর একনে হলো ব্রণ বা পিম্পলস একত্রিত হয়ে সেই জায়গাতে ইনফ্ল্যামেশন হয় আর সিবাম প্রোডাকশন বেড়ে সেটি খুব সিভিয়ার হয়ে পেইনফুল কন্ডিশন ক্রিয়েট করে। ‘pimples are a symptom of a condition, whereas acne is the condition itself’ সহজ ভাষায় একনে হলো রোগ আর পিম্পল হচ্ছে রোগের উপসর্গ!

বয়ঃসন্ধিকালে একনে হুট করে কেন দেখা দেয়?

আমাদের ত্বকের নিচে সেবাসিয়াস নামে একটি গ্ল্যান্ড আছে যা থেকে প্রতিনিয়ত সিবাম নামক তেলজাতীয় পদার্থ বের হয়। এর কাজ হলো স্কিনকে ময়েশ্চারাইজ করা। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে বা puberty সময়কালে এই সিবাম প্রোডাকশন বেড়ে যায়। আর স্কিনে প্রতিনিয়ত ডেড সেলস জমা হচ্ছে। এগুলো সময়মতো ক্লিন না করলে ময়লার সাথে জমে স্কিনের পোরস বন্ধ হয়ে যায়। রোমকূপের গোড়ায় সিবাম, ডেড সেলস জমে স্কিনের পোর বন্ধ হয়ে বাম্প (bump) তৈরি করে।

সিবাম স্কিনকে ময়েশ্চারাইজ করলেও এটি স্কিনের ব্যাকটেরিয়াকে নিউট্রিয়েন্ট দেয়, তখন সেই জায়গায় ইনফেকশন হয়। আমাদের স্কিনের ব্লাড সেল যখন সেখানকার ব্যাকটেরিয়া ধবংস করে ফেলে, সেই জায়গাটি লাল হয়ে আরও ফুলে উঠে। আর ভেতরে থাকে সাদা তরলজাতীয় পদার্থ, যেটিকে আমরা পুঁজ বলে থাকি। এভাবেই স্কিনে একনের সূচনা হয়।

একনে হওয়ার কারণ

বডিতে হরমোন সিক্রেশন বাড়লে সিবাম প্রোডাকশন বেড়ে যায়। টিনেজে মেয়েদের শরীরে অনেক ধরনের চেঞ্জ আসে, যেমন- পিরিয়ড শুরু হয়। ছেলেদেরও হরমোনাল পরিবর্তন হয়। আর এই কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই ত্বকে ব্রণ দেখা দেয়, এটা মোটামুটি বেশ কমন প্রবলেম। জেনেটিক্যালিও এর প্রভাব থাকে। তবে হরমোনাল সিক্রেশনকেই এর প্রধান কারণ মনে করা হয়ে থাকে। এছাড়া না বুঝে বিভিন্ন কসমেটিকস ব্যবহার করলে একনে হতে পারে। এছাড়া রাত জাগা, ত্বকের যত্ন না নেওয়া, ওয়েদার, স্ট্রেস এবং সুগার আইটেমের কারণে বয়ঃসন্ধিকালে একনে বা পিম্পলের উপদ্রব বাড়তে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালে একনে থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়

একনে থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়

যেহেতু এই সময়ে স্কিন খুব নাজুক থাকে, তাই হুটহাট কোনো প্রোডাক্ট না বুঝে ব্যবহার করা যাবে না। একদম সিম্পল বেসিক কেয়ার করাই এনাফ। এই সময়ে স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট সিলেকশনে একটু সচেতন হতে হবে। আর একটা কথা, হরমোনের কারণে ব্রণ হয়ে থাকলে সময়ের সাথে সাথে সেটা ঠিক হয়ে যাবে। দেখে নিন টিনেজারদের জন্য স্কিন কেয়ার স্টেপগুলো কেমন হবে-

  • মাইল্ড ক্লেনজার দিয়ে ফেইস ক্লিন করতে হবে
  • ত্বকে অ্যাকটিভ একনে থাকলে স্ক্রাবিং বাদ দিতে হবে
  • অয়েল ফ্রি সানস্ক্রিন ইউজ করতে হবে এবং রাতে ডাবল ক্লেনজিং করা মাস্ট
  • ডেইলি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে
  • ব্রণের উপর সামান্য টি ট্রি অ্যাসেনশিয়াল অয়েল লাগালে ব্রণ শুকিয়ে যাবে
  • সপ্তাহে একদিন মাস্ক বা প্যাক ইউজ করতে হবে যেটা ব্রণ কমাতে সহায়ক
  • স্যালিসাইলিক এসিডযুক্ত ক্লেনজার ও টোনার একনে প্রন স্কিনের জন্য ভালো
  • ২০ বছরের নিচে হলে সিরাম ব্যবহার করা উচিত হয়

ডু’স এন্ড ডোন্ট’স

১। Don’t pop up your acne, never ever!!! এটি বলা যেমন সোজা, করা তার চাইতেও কঠিন৷ হাতে লেগে থাকা ব্যাকটেরিয়া ফেইসের ইনফ্ল্যামেশনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া পুঁজ বের হয়ে চারপাশে আরও নতুন একনে তৈরি করে। তাই ব্রণে খোঁটাখুঁটি করা যাবে না।

২। দিনে দুইবার ক্লেনজার দিয়ে মুখ ক্লিন করুন, এর বেশি নয়। এক্ষেত্রে হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন।

৩। বারবার ফেইসে হাত দিবেন না। আর চুল ক্লিন রাখবেন কারণ অয়েলি হেয়ার ও খুশকি থেকে স্কিনে একনে হয়। নিজের রুমাল, বিউটি টুলস, চিরুনি এগুলো শেয়ার করবেন না।

৪। মেকআপ করলে অবশ্যই দিনশেষে সেটা ভালোভাবে ক্লিন করা জরুরি। টিনেজে হেভি মেকআপ এড়িয়ে চলাই বেটার, স্পেশালি যাদের ফেইসে পিম্পলসের প্রবলেম আছে। আর যদি মেকআপ করেন, তাহলে ভালো ব্র্যান্ডের মেকআপ আইটেম বেছে নিন। হার্শ কেমিক্যালযুক্ত প্রোডাক্ট এড়িয়ে চলবেন।

৫। পরিষ্কার বেডশীট এবং পিলো কভার ব্যবহার করুন। কারণ ময়লা পিলো কভার থেকে ফেইসে ব্রণ হতে পারে।

৬। এই করোনাকালীন সময়ে মাস্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে, সবসময় পরিষ্কার মাস্ক পড়া উচিত। আর নাক আর কপালে যেহেতু অয়েল বেশি জমে, তাই যারা চশমা পড়েন তারা চশমা ক্লিন করে পড়বেন। মোটকথা সব সময় হাইজিন মেনটেইন করবেন।

৭। খুব বেশি পেইন হলে বা ফুলে গেলে একনে ট্রিটমেন্ট করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবলেম ফেইস করলে স্কিন স্পেশালিষ্ট এর পরামর্শ নিন। এক্ষেত্রে প্যারেন্টসদেরও সর্তক থাকতে হবে।

একনে নিয়ে যত গুজব!

একনে নিয়ে গুজব

‘টুথপেষ্ট লাগাও, ব্রণ চলে যাবে’

অনেকেই ভাবে যে ব্রণ হলে সেখানে টুথপেষ্ট দিলে সেটা সেরে যায়। কিন্তু টুথপেষ্টের ফ্লোরাইড উপাদান একনে প্রন স্কিনকে আরো সিভিয়ার অবস্থায় নিয়ে যায়। এটা খুবই ক্ষতিকর, তাই এই ভুলটি একদম করা যাবে না!

‘বারবার মুখ ধুলে স্কিন ফ্রেশ থাকবে’

অনেকেই এটা ভাবে যে বেশি মুখ ধুলে একনে চলে যায়! ফ্যাক্ট হচ্ছে এতে স্কিন আরও ডিহাইড্রেট হয়ে যায়, ২ বার ক্লিন করলেই এনাফ।

‘সুই বা ধারালো কিছু দিয়ে পুঁজ বের করলে ব্রণের দাগ থাকবে না’

মাঝেমধ্যে দেখা যায় কেউ কেউ সুই স্যানিটাইজ করে পুঁজ বের করার চেষ্টা করে, যেটি একদমই ঠিক না। সুই বা ধারালো কিছু দিয়ে পুঁজ বের করালে ব্রণের দাগ থাকবে না, এটা অনেক পার্লারেই আমি বলতে শুনেছি। এতে পুঁজ বের হয়, কিন্তু পরবর্তীতে দাগ এবং গর্ত হয়ে যায় সেখানে। স্কিন সেলস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এতে।

‘এমনি চলে যাবে, কিছু করা লাগবে না’

একনে হলেই মোটামুটি সবাই এটা ভাবে যে কিছু করার দরকার নেই, এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে! এটা ভুল ধারণা, অবশ্যই ট্রিটমেন্ট করা উচিত। কেন ব্রণ বেড়ে যাচ্ছে, কারণটা বের করা উচিত। স্কিন সঠিকভাবে ক্লিন করা উচিত। কেননা স্কিনের প্রতি অবহেলা থেকে পরবর্তীতে আরও নানা রকম সমস্যা হতে পারে।

একনে কি শুধুই ফেইসে হয়?

সাধারণত বডিতে যেখানে অয়েল গ্ল্যান্ড বেশি সেসব জায়গা যেমন ফেইস, বুক, গলা, কাঁধ এবং আপার আর্মসে একনে দেখা যায়৷ এর কিন্তু বিভিন্ন ধরন আছে, সবগুলো এক না। যেমন- শুধুমাত্র ক্লগড পোরস হচ্ছে হোয়াইটহেডস, ব্ল্যাকহেডস। এটি তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না, নাকের এরিয়াতে বেশি হয়। আর একটু ফুলে ওঠে যেটা, সেটা পাপিউলস। আর ভেতরে পুঁজ জাতীয় পদার্থ থাকলে সেটা পুসিউলস বা সিস্টের পর্যায়ে চলে যায়। অনেকের দেখা যায় ফেইস ক্লিয়ার, কোনো পিম্পল নেই। কিন্তু বুকে বা কাঁধে গুঁটি গুঁটি ব্রণ উঠছে। এগুলো মূলত হরমোনাল ইস্যুর জন্য হয়ে থাকে।

ক্লিয়ার ফেইস

টিনেজ একনে নিয়ে ঘাবড়াবেন না! 

বয়ঃসন্ধিকালে একনে খুবই নরমাল একটা বিষয়! কম বেশি সবারই হয়, ঘাবড়ে না গিয়ে সঠিকভাবে যত্ন নিলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে সহজেই। একটু সময় দিন, নিজের প্রতি যত্নবান হোন। পরিমিত ঘুম আর হেলদি ফুডচার্ট, এই দুটি কিন্তু মাস্ট। রাত জাগার অভ্যাস থাকলে সেটা পরিহার করুন, তেলে ভাজা খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন, হাইড্রেটেড থাকার চেষ্টা করুন। সেই সাথে বেসিক স্কিন কেয়ার রুটিন ফলো করুন।

আজ এ পর্যন্তই। আশা করি এই লেখাটি আপনাদের কাজে দিবে, বিশেষ করে যারা টিনেজার আছেন। অথেনটিক স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টস এর জন্য শপ.সাজগোজ.কম আমার ভরসার জায়গা। তাদের চারটি ফিজিক্যাল স্টোর আছে।  শপগুলো যমুনা ফিউচার পার্ক, সীমান্ত সম্ভার, বেইলি রোডের ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার এবং উত্তরার পদ্মনগর (জমজম টাওয়ারের বিপরীতে) এ অবস্থিত। সেখানে গিয়ে দেখে শুনেও কিনে নিতে পারেন আপনার প্রয়োজনীয় প্রোডাক্ট।

 

ছবি- সাজগোজ, সাটারস্টক

16 I like it
5 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...