গেরিলা | মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র!

গেরিলা | মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র

গেরিলা চলচিত্র - shajgoj.com

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গৌরময় ঘটনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের স্বাক্ষী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মহান আত্বত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতার ইতিহাস বহুভাবে গল্প, কবিতায়, গানে, নাটকে, সিনেমা সহ বিভিন্ন শিল্পকর্মে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের বহু গুণী নির্মাতাগণই তাদের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একাংশের চিত্র সুনিপুণভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তেমনি একটি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হলো গেরিলা। চলুন তাহলে গেরিলা মুভি রিভিউ থেকে জেনে নেই আমাদের  মহান মুক্তিযুদ্ধের একাংশের চিত্র।

গেরিলা মুভি নিয়ে কিছু কথা 

সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র গেরিলা। আর চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। অনেক আগে থেকে কথা চলতে থাকলেও চলচ্চিত্রটির নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১০ এর জানুয়ারি থেকে। রাষ্ট্রীয় অনুদান এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে এরিয়াল ক্রিয়েটিভ স্পেস (Aerial Creative Space) এর সাথে যোগ দেয় ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এবং এতে নির্মাণ আরও গতিশীল হয়। ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পাওয়া এই সিনেমাটি দর্শক হৃদয়ে ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছিল। সাম্প্রতিককালে মুক্তি পাওয়া মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক যতগুলো সিনেমা নির্মিত হয়েছে, গেরিলা তাদের মধ্যে অন্যতম। একইসাথে শহুরে ও গ্রামীণ পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের চিত্রকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা সফল সুনির্মিত একটা ছবি এটি। গেরিলা চলচ্চিত্রে সহস্রাধিক শিল্পী অভিনয় করেছেন এবং প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব অভিনয় প্রতিভা দিয়ে প্রতিটি চরিত্র নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মুভিঃ গেরিলা

পরিচালকঃ নাসির উদ্দিন ইউসুফ

প্রযোজকঃ ফরিদুর রেজা সাগর, ইবনে হাসান, এশা ইউসুফ

রচয়িতাঃ  সৈয়দ শামসুল হক

শ্রেষ্ঠাংশেঃ জয়া আহসান, ফেরদৌস আহমেদ, এটিএম শামসুজ্জামান, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযুষ বন্দোপাধ্যায়, শতাব্দী ওয়াদুদ, শম্পা রেজা, আহমেদ রুবেল, গাজী রাকায়েত প্রমুখ।

সুরকারঃ  শিমুল ইউসুফ

চিত্র গ্রাহকঃ সমীরণ দত্ত

সম্পাদকঃ সামির আহমেদ

পরিবেশকঃ আশীর্বাদ চলচিত্র

মুক্তিঃ ১৪ এপ্রিল, ২০১১

নির্মাণব্যয়ঃ ৩ কোটি টাকা (বাংলাদেশী টাকা)

গেরিলা চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিক ভাবেও দারুণ সফল হয়েছে। মুক্তির ১০০ দিন পরেও ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স ও বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড-এ প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনীতেই দর্শক উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

চলচ্চিত্রটি ২০১১ সালে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহন করে এবং ১৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০১১ এ সর্বোচ্চ ১০টি শাখায় নেটপ্যাক পুরস্কার জিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে সক্ষম হয়।

এছাড়া মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার  ২০১১ তে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবেও পুরস্কার অর্জন করে।

গেরিলা মুভি কাহিনী সংক্ষেপ  

“গেরিলা” চলচ্চিত্রের মূল ঘটনা আবর্তিত হয়েছে বিলকিস বানুকে ঘিরে। এই চরিত্রের জন্য জয়া আহসানকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, তা এক কথায় বলতে গেলে অসাধারণ। শ্বশুর বাড়িতে শ্বাশুড়ি এবং ভাসুর (এটিএম শামসুজ্জামান) এর সাথে থাকেন বিলকিস। তার স্বামী শিক্ষিত-সংস্কৃতিমনা-বলিষ্ঠ চিত্তের অধিকারী প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক হাসান (ফেরদৌস),  ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে নিখোঁজ হন। নিজের ব্যাংকের চাকরি, অসুস্থ শ্বাশুড়ির দেখাশোনার পাশাপাশি হাসানের খোঁজে ছুটতে ছুটতে গেরিলাযোদ্ধাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে বিলকিস। যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলেও বিভিন্ন ভাবে গেরিলাযোদ্ধাদের সাহায্য করে। আর তার সাথে জড়িত থাকে সমাজের উচ্চশ্রেণীয় মিসেস খান (শম্পা রেজা), কবি ও গীতিকার আলতাফ মাহমুদ (আহমেদ রুবেল) এবং হাসানের দুধভাই তসলিম সর্দার (এটিএম শামসুজ্জামান)।

এমনি একদিন বিলকিস সিদ্ধান্ত নেয় যে,পাকিস্তানী অনেক বড় কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবে এবং সেখানে আক্রমন করবে। বিলকিসের টিকেট হিসেবে যাবেন সমাজের প্রভাবশালী মিসেস খান। প্ল্যান খুব সাধারণ, পার্টিতে প্রবেশ করে টয়লেটে বোমা লাগিয়ে বেড়িয়ে পরবে বিলকিস। সফলভাবে বোমা স্থাপন করতে পেরেও এক ভিন্নমুখী সমস্যার শিকার হয় সে। একজন সেনাকর্মকর্তা মিসেস খানকে আসতে দিতে না চাইলে একাই চলে আসতে হয় তাকে। শহীদ হন মিসেস খান। কিন্তু বিলকিসদের এ মিশন সফল হলেও, তার ফল শুভ হয় না মোটেও। ধরা পরে তাদের কয়েক সহযোদ্ধা। আর তাদের মাঝেই একজন ফাঁস করে দেয় আলতাফ মাহমুদ এবং বিলকিসের নাম।

এক সকালে তারা হানা দেয় আলতাফ মাহমুদের বাড়িতে। তারা সেখানে তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। এ খবর বিলকিসের কাছে নিয়ে আসে আলতাফের স্ত্রী। সে বিলকিস কে বলে তাড়াতাড়ি পালিয়ে যেতে। বিলকিস তার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় তার বাপের বাড়ি জলেশ্বরের দিকে। পথিমধ্যে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে। বিলকিসকে বাসায় পৌছাতে সাহায্য করে সিরাজ নামের এক মুক্তিযোদ্ধা । বিলকিসের ভাই খোকনও একজন মুক্তিযোদ্ধা। খোকন বাহিনীর জ্বালায় নাকানি-চুবানি খাওয়া অবস্থা পাকিস্তানীদের। কিন্তু রাজাকারদের সাহায্যে ধরা পরে খোকন এবং রাজাকারদের দ্বারা নৃশংসভাবে নিহত হয়। বিলকিস খোকনের লাশ খুঁজতে গিয়ে ধরা পরে পাক-বাহিনীর হাতে। তবে শেষ পর্যন্ত বীরের মতো আত্বাহুতি দেয় বিলকিস। নিজের সাথে উড়িয়ে দেয় একটি গোটা মিলিটারী ক্যাম্প।

শেষ কথা

মুভিটির নির্মাণ ছিল এক কথায় অসাধারণ এবং মুভিটি একটি পূর্ণাঙ্গরুপে ৭১ এর ছবি। ৭১ এর মুভি বানানো সম্ভব, কিন্তু ৭১ এর বাংলাদেশ দেখানো সম্ভব নয়। সেই অসাধ্যটি সাধন করেছে পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। মুভিটিতে যুদ্ধের ভয়াবহতা নৃশংসতা একেবারে পুরোপুরিভাবেই দেখানো হয়েছে।  প্রথম ভাগে শহর ভিত্তিক যুদ্ধ এবং শেষভাগে গ্রামভিত্তিক। সকল ক্ষেত্রেই রাজাকারদের রুপ দেখে অবাক হতে হয়েছে।

একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধের ঘটনাকে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তোলার সার্থকতা মূলত সেই সময়টাকে ধরে রাখার উপর নির্ভর করে এবং নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সার্থক।

এ মুভিটি নিঃসন্দেহে সকল বাংলাদেশীর প্রাণের ছবি। সকলেরই উচিত মুভিটি অন্তত একবার দেখা এবং মুক্তিযুদ্ধকে আরও ভালোভাবে জানা।

ছবি- সংগৃহীত: সাজগোজ;পিন্টারেস্ট.কম;ইউটিউব.কম;দ্যা ডেইলি স্টার;গোবাংলাবুকস.কম

0 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...