গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ৭টি উপায়!

গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ৭টি উপায়

painn

গর্ভাবস্থায় বেশিরভাগ হবু মায়েরা পিঠ এবং কোমর ব্যথার সমস্যায় ভোগেন। এই সময়টা নারী জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত এবং জটিল সময়। মা হতে যাচ্ছি, এই সুখবরটা যেকোনো মেয়ের জন্য পরম প্রাপ্তি! এই ধরনের ব্যথা এই সময়টাকে কষ্টের করে তোলে। অনেকের জন্য এই ব্যথা তেমন সমস্যা নাও হতে পারে, আবার কারো জন্য এটা খুবই মারাত্মক ও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথা কেন হয় ও এর প্রতিকার নিয়েই আজকের আলোচনা।

কেন গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথা বাড়ে?

১) গর্ভাবস্থায় নারীদেহে বিশেষ ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন জয়েন্ট এবং লিগামেন্টসকে নরম এবং ঢিলা করে দেয়। জয়েন্ট ও লিগামেন্টের এই পরিবর্তন পিঠ ও কোমরের উপর প্রভাব ফেলে বলে ব্যথা হতে পারে।

২) গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হওয়ার কারণে মায়ের শরীরের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি আস্তে আস্তে সামনের দিকে চলে যায়। এর ফলে পেটের পেশীগুলো সম্প্রসারিত ও দুর্বল হয়ে যায়। মায়ের পিঠ ও কোমরে উপর অতিরিক্ত চাপ পরে ব্যথা বাড়ে।

৩) গর্ভের শিশুর বৃদ্ধির সাথে সাথে মায়ের দেহের ওজন বৃদ্ধি পেতে থাকে। অতিরিক্ত ওজন বহন করার কারণে পিঠ ও কোমরে ব্যথা হতে পারে।

৪) গর্ভাবস্থায় সায়াটিক নার্ভের উপর অতিরিক্ত চাপের ফলে কোমরে, নিতম্বে বা উরুতে ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা সাধারণত কোমর বা কোমরের উপরে পিঠের মাঝ বরাবর হয়। এ ব্যথা কখনো কখনো পায়ের দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়।

৫) দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, সঠিক ভঙ্গিতে না বসা অথবা বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো বা বসা ইত্যাদি কারণেও পিঠ ও কোমর ব্যথা হতে পারে।

৬) অনেক সময় স্ট্রেস বা মানসিক চাপে ভুগলেও গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরের ব্যথা হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

ব্যথা কমানোর উপায়

গর্ভের শিশুর বৃদ্ধির সাথে সাথে মায়ের দেহ সামনের দিকে উপুড় হয়ে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পেছনের দিকে ঝুঁকতে হয়। এ কারণে সে সময় পেশীতে টান পরে ব্যাথা হয়। তাই সঠিক ভঙ্গিতে দাঁড়ানো এবং বসতে চেষ্টা করুন। গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথার প্রতিকার নিয়ে জেনে নিন এখনই।

১) পজিশন বদল করুন

দাঁড়ানোর সময় দেহ টান টান করে একটু বেশি স্পেস নিয়ে দাঁড়ান। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলে মাঝে মাঝে পজিশন বদল করুন। বসার সময় আরামদায়ক চেয়ারে বসুন অথবা পিঠে সাপোর্ট দিয়ে বিছানায় বসুন। যতক্ষণ বসে থাকবেন, সোজা হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করুন।

২) যোগব্যায়াম করুন

যোগব্যায়ামের মাধ্যমে পেশীর শক্তি বৃদ্ধি ও নমনীয়তা বাড়িয়ে ব্যথামুক্ত থাকুন। ব্যায়াম গর্ভবতী মায়েদের পিঠ, পেশী, জয়েন্ট ও নার্ভের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। ভালো ঘুম ও মানসিক চাপ মোকাবেলা করতেও যোগ ব্যায়ামের ভূমিকা অপরিসীম। তবে মনে রাখতে হবে গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম করার আগে অবশ্যই ফিজিওথেরাপিষ্টের পরামর্শ নিতে হবে, কারণ অনেকের এমন কোন কন্ডিশন থাকতে পারে যার জন্য কিছু কিছু ব্যায়াম বা ব্যায়াম করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হতে পারে।

৩) গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথা কমাতে সেঁক দিতে পারেন 

পিঠ ও কোমরের ব্যথা কমাতে গরম ও ঠাণ্ডা সেঁক দিতে পারেন। কিছু সময়ের জন্য ব্যথা কমে যাবে। তবে অবশ্যই আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন। কিন্তু খেয়াল রাখবেন, গর্ভাবস্থায় পেটে ঠাণ্ডা বা গরম সেঁক দেওয়া যাবে না।

৪) ব্যথা কমাতে সাধারণ ব্যায়ামগুলো করতে পারেন

পিঠের এবং কোমর ব্যথা কমাতে হাঁটা ও সাঁতার কাটার মত সাধারণ ব্যায়ামগুলো করতে পারেন। গর্ভবতী মায়েদের সাঁতার কাটার পরামর্শ দেয়া হয়। সাঁতার মেরুদন্ডকে শিথিল হতে সাহায্য করে এবং পা, বাহু এবং পিঠের পেশীগুলোকে টান টান ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। যদি মাথা ঘোরায় বা আচ্ছন্ন মনে হয়, তাহলে সাঁতার কাটা বন্ধ রাখতে হবে।

৫) আরামদায়ক জুতা পরুন

প্রেগনেন্ট অবস্থায় হাই হিল জুতা মায়েদের পিঠ ও কোমর ব্যথার কারণ হতে পারে। হাই হিল পিঠের বক্রতা বৃদ্ধি করে এবং চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে শরীরের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। তবে একেবারে ফ্ল্যাট জুতা পরাও ঠিক নয়। তাই প্রেগনেন্সির সময় কম হিলের আরামদায়ক জুতা পরুন।

৬) একপাশে ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন

হবু মায়েরা চিত হয়ে না শুয়ে একপাশে ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। পাশ ফিরে ঘুমালে শিশুর দেহে ভালোভাবে রক্ত প্রবাহিত হয়। হাঁটু বাঁকা করে শুবেন এবং দুই হাঁটুর মধ্যখানে একটি ছোট বালিশ দিতে পারেন। এতে করে পিঠের নীচের অংশের টান কমবে। এছাড়াও আপনার পেটের নীচে ও পিঠের নীচের অংশেও আরামদায়ক কুশন দিতে পারেন ঘুমানোর সময়।

৭) ভারী জিনিস উঠানোর সময় সতর্ক হোন

গর্ভাবস্থায় ভারী জিনিস উঠানো থেকে বিরত থাকুন। যদি নিচ থেকে কোন জিনিস তুলতে হয় তবে ঝুঁকে না তুলে আগে হাঁটু ভেঙ্গে বসে তারপর তুলুন। বাজারের ব্যাগ বা কিছু বহন করতে হলে দু’হাতে সমান ভর নেয়ার চেষ্টা করুন। একটি ব্যাগে সব জিনিস না নিয়ে দু’টি ব্যাগে সমান ওজন নিয়ে বহন করুন। ছোট জিনিস উঠানোর ক্ষেত্রে উপুড় হয়ে এবং পায়ের উপর ভর দিয়ে উঠান, হাঁটু মুড়ে বা পিঠের উপর ভর দিয়ে উঠাবেন না।

ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ম্যাটার্নিটি বেল্ট পরতে পারেন এবং ফিজিওথেরাপি নিতে পারেন। পিঠের ব্যথা দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে এবং তীব্রতা বেশি হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার জন্য ব্যথা হচ্ছে কিনা জেনে সেটা জেনে চিকিৎসা নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ওষুধ সেবন করুন। আজ তাহলে এই পর্যন্তই। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন। মাতৃত্বকালীন এই সময়টা হোক নিরাপদ।

 

লিখেছেন-

মাহমুদা আক্তার রোজী

ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট এন্ড জেরোন্টলজিস্ট

ছবি- সাটারস্টক

14 I like it
1 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...