ফেমিনিজমের উদ্দেশ্য কি পুরুষের আধিপত্য উচ্ছেদ করে নারীর আধিপত্য ঘটানো? - Shajgoj ফেমিনিজমের উদ্দেশ্য কি পুরুষের আধিপত্য উচ্ছেদ করে নারীর আধিপত্য ঘটানো? - Shajgoj

ফেমিনিজমের উদ্দেশ্য কি পুরুষের আধিপত্য উচ্ছেদ করে নারীর আধিপত্য ঘটানো?

এপ্রিল ২৯, ২০১৭

আমাদের কম বেশী সবার ফেমিনিজম শব্দটির সঙ্গে পরিচয় রয়েছে। কিন্তু অনেকেই ঠিকঠাকভাবে জানেন না ফেমিনিজম আসলে কী? এই শব্দটি নিয়ে অনেক ভুল অথবা কাল্পনিক ধারণা রয়েছে। কাছের কিছু মানুষদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাদের কাছে এই শব্দটির মানে কি? যথার্থ উত্তর কেউ দিতে পারেনি। আক্ষরিক অর্থে আসলে ফেমিনিজম কি?

১৮৩৭ খ্রিঃফরাসি দার্শনিক ও ইউটোপীয় সমাজবাদী চার্লস ফুরিয়ে প্রথম ‘নারীবাদ’ শব্দটির আনুষ্ঠানিক ব্যবহার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। “নারীবাদ’’ (feminism) এবং “নারীবাদী” (feminist) শব্দ দুটি ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭২ এ, যুক্তরাজ্যে ১৮৯০ এ, এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১০ এ।

আমার কাছে ফেমিনিজমের অর্থ হচ্ছে বিপ্লব! এটি এমন একটি বিপ্লব বা অঙ্গীকার যা মানুষের জীবনকে ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিতে চায়। এটি একটা দর্শন যা নারীর জন্য সব ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার ও স্বাধীনতাকে সমর্থন করে । এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশন উচ্ছেদ করাঅর্থাৎ নারী পুরুষের মধ্যে সাম্যাবস্থা নিয়ে আসা। অথচ এই ‘ফেমিনিজম’ নিয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তির, সংশয় ও  ভীতির সীমা নেই আজও।

মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ফেমিনিজম যদি নারী পুরুষের মধ্যে সাম্যতা নিয়ে আসার জন্যই হয় তাহলে কেনোএটার নাম ফেমিনিজম, কেনো এটার নাম হিউমিনিজম বা ইক্যুলিজম নয়? কারণ একটাই যুগ যুগ ধরে নারী সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং সুবিধা বঞ্চিত। আদিকাল থেকেই নারীকে দুর্বল করে রেখেছে পুরুষের আধিপত্য, গোঁড়ামি আর তাদের শারীরিক শক্তির প্রদর্শনতায়। পুরুষ যখন নারীকে প্রহার করে তখন তাদের মনোভাব এরকম থাকে যে, আমার শক্তি আছে তাই আমি যা খুশি তাই করবো । তাই নারী পুরুষের সমতা অর্জন করতে শুরু করা উচিত নারীকে রক্ষা করার মধ্য দিয়ে । সমাজের একটা প্রচলিত নিয়ম হয়ে গেছে যে মেয়েদের লাজুক হতে হবে, তাদের কণ্ঠস্বর নিচে নামিয়ে কথা বলতে হবে, তাদের একদম মেয়েলি আচরণ করতে হবে, তারা রাত পর্যন্ত বাড়ির বাহিরে থাকতে পারবে না, বিবাহের পর হয়ত তাদের চাকুরী করার অধিকারটুকুও থাকে না। এমন কি জীবন সঙ্গী নির্বাচন করার সুযোগটিও দেয়া হয় না। বাকি অধিকারগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম।

তবে হ্যাঁ, আজকের নারীর অবস্থান এক দশক আগের অবস্থান থেকে ভিন্ন। নারীরা এখন পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে। ঘর সামলানো থেকে শুরু করে রাস্তায় রিকশা চালানোতেও পিছিয়ে নেই নারীরা। কিন্তু যে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধীদলীয় নেত্রীও নারী। সে দেশে আবার নারী অধিকার নিয়ে কথা বললে লেবেল করে দেয়া হয় ‘নারীবাদী’ বলে। নারীরা যতই এগিয়ে যাক। আজও নারীরা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পুরুষেরা তাদের পুরুষত্ব দেখিয়ে যাচ্ছে তার প্রেমিকা, তার বউ এর উপর হাত তুলে। আমি নারীবাদীও নই, আমি পুরুষবাদীও নই। আমি মানুষবাদী! একজন মানুষ হিসেবে আমাদের সকলের উচিৎ যেকোনো প্রকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। কথায় আছে, “অন্যায় যে করে এবং অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সমদহে”।

নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিয়ে তো খুব কপচানো হচ্ছে। কিন্তু এরপরও অনেক পুরুষের অভিযোগ, ফেমিনিজম পুরুষ বিরোধী একটা ব্যবস্থা। তারা মনে করেন, । কিন্তু এটা একদমই ভুল ধারণা। উভয় লিঙ্গের সমতা ঘটানো এর মূল লক্ষ্য। পুরুষশাসিত সমাজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে নারীরন্যায়সংগত অধিকার। নারীকে অধিকার দিতে ভয় পাচ্ছে পুরুষ। কারণ অধিকার ভাগহলে পুরুষের প্রাধান্য যে চলে যাবে। এরই সুযোগ নিয়ে নানা ক্ষেত্রেই ঠোকানো হচ্ছে নারীদের। কাজেই পরিস্থিতির বাস্তবতা ও প্রয়োজনে নারীসমাজকে অধিকার সচেতন হতে হয়। ফেমিনিজমের লক্ষ্য হচ্ছে ভাষার লিঙ্গনিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীন বেতন-কাঠামো, প্রজনন-সংক্রান্ত অধিকার, গর্ভনিরোধক ও গর্ভপাতের অধিকার, বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অধিকার ও সম্পত্তির মালিকানার অধিকার নিশ্চিত করা।  

ক্ষুদ্র কিছু উদাহরণ যদি আমরা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি তাহলেই বুঝতে পারবো কীভাবে আমরা ছোটবেলায় থেকেই পুরুষদ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছি। আমরা নিশ্চয়ই ছোটবেলায় কবিতায় পড়েছি- “আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা”। চাঁদের কোন লিঙ্গ নেই। তাহলে কেনো চাঁদ মামাই হলো? “তাই তাই মামা বাড়ি যাই, মামী এলো লাঠি নিয়ে পালাই পালাই”। কেনো মামা বাড়ি যাওয়াটাই বাধ্যতামূলক? কেনো খালার বাড়ি নয়? স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কীভাবে আমরা পুরুষদ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলাম। আবার আমরা মিনা কার্টুনে দেখেছি মিনাকে স্কুলে যেতে দেয়া হতো না। পাড়ার ছেলেরা মিনা এবং তার বান্ধবীদেরকে বিরক্ত করতো। মিনার ভাই রাজুকে যতটা গুরুত্ব দেয়া হতো মিনাকে ততই নিকৃষ্ট করে দেখা হতো। তখন থেকেই আমাদের মাথায় ইনজেকশনের মতো ঢুকে গিয়েছে যে পুরুষ হচ্ছে এই সমাজের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

genderequality‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে নারী’— নারী সম্পর্কিত বহুল আলোচিত, গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়তম এ মন্তব্যটি করেছিলেন খ্যাতনামা ফরাসি ঔপন্যাসিক, দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক সিমোন দ্য বোভোয়ার। যা বিধৃত রয়েছে তাঁর লেখা নারীবাদের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘ল্য দ্যজিয়েম সেক্স’ ইংরেজিতে ‘দি সেকেন্ড সেক্স’ বাংলায় ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ গ্রন্থটিতে। তাঁর ঐ মন্তব্যের মূল অর্থ হলো আমাদের পশ্চাদগামী পারিপার্শ্বিক পরিবেশঅর্থাৎ পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থাই নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান নাদিয়ে  অবলা, অর্ধাঙ্গীনী রূপে গড়ে তুলছে। অর্থাৎ আরও গভীরভাবে বলা যায়,  জৈবিকভাবে একেকজন স্ত্রী অঙ্গ নিয়ে জন্মায়, এইটুকুই প্রাকৃতিক সত্য। জন্মলগ্নে সে জানে না, সে নারী না পুরুষ! তারপর পদেপদে তাকে টিপ পরিয়ে, চুড়ি-ফিতাপরিয়ে, ঝুঁটি বেঁধে, পুতুল খেলিয়ে, রান্নাবাটি ধরিয়ে দিয়ে, বাইরে ঘোরা বন্ধ করে দিয়ে, অবৈজ্ঞানিক সংস্কারে বন্দী করে, সর-হলুদ মাখিয়ে সামাজিকভাবে তাকে ক্রমশ মেয়েলি করে তোলে আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থা। তার সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ তুমি কি করতে পারবে আর কি করতে পারবে না। আর এই বিধিনিষেধ চলতে থাকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।

ব্যক্তিগত জীবন থেকে যদি বলতে হয় তাহলে একজন মেয়ে হিসেবে আমিও বাদ যায়নি এই সব বিধিনিষেধের। আমার বাবা একটা ছেলে সন্তানের অভাব কতটা অনুভব করে তা ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি। তাঁর ভাষ্যমতে মেয়েদের দিয়ে কি হবে? মেয়েরা আজ না হয় কাল বিয়ে করবে, শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। পর হয়ে যাবে। বৃদ্ধ বয়সে মেয়েরা কোনদিন দেখবে না। তাই মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করাও ছিল একটি লস্ট প্রোজেক্ট। কিন্তু আসলেই কি তাই? মেয়েরা কি বিয়ের পর তার বাবা-মাকে দেখে না? পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাড়িয়ে সংসারের দায়ভার নেয় না? সৃষ্টিকর্তা কি শুধু ছেলেদেরই এই জাদুকরী শক্তি আর সামর্থ্য দিয়ে পাঠিয়েছে? একদমই নয়! আজকাল ছেলেদের চাইতে মেয়েরা তার পরিবারকে বেশী দেখে। ছেলে মেয়ে বলে কিছুই নেই, সবই হচ্ছে মানসিকতা।

সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী হওয়াতে আমাদের প্রায়ই লিঙ্গসমতা নিয়ে পড়তে হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমরা পড়েই খালাস হয়ে যাই। দৈনন্দিন জীবনে আমরাআমাদের এই পড়া আর শেখাটা কতটা কাজে লাগাই? একবার নিজেদের প্রশ্ন করে দেখবেন আপনি শেষবার কবে একটি মেয়ের দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাননি? শেষবার কবে একটি মেয়েকে নিয়ে বাজে ভাবে কথা বলেননি? শেষবার কবে একটি মেয়ের অধিকার নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন? মনে পড়ে? আমরা শুধু জ্ঞানই অর্জন করছি। শিক্ষিত হচ্ছি কিন্তু মানুষ হচ্ছি না। এতো শিক্ষিত হওয়ার পরও বখাটে ছেলের হাতে ললনাদের রেহাই নাই।

ভাগ্যিস বেগম রোকেয়া বলে উপমহাদেশে কেউ ছিলেন। যে স্বার্থপরের মতো শুধু নিজেই শিক্ষিত হননি এবং শিক্ষিত হয়ে ঘরে বসে থাকেনি। বরং অন্দরমহলের বাইরে এসে নিজেই নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছিলেন।

আবারও বলতে হচ্ছে নারীবাদী একটি মতাদর্শের নাম, একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম। এটি একটি চেতনা। যা নারী পুরুষ উভয় ধারণ করতে পারে। যদি সামাজিক অধিকার আদায় করা কোন দোষের হয় তাহলে হলাম না হয় দোষী!

ছবি – কেয়ারমাম ডট কম

লিখেছেন – জাহান