লেইট টকিং চিলড্রেন | কারণ এবং আমাদের করণীয় কী? - Shajgoj



লেইট টকিং চিলড্রেন | কারণ এবং আমাদের করণীয় কী?


জানুয়ারী ১৫, ২০১৮



আমার ছেলে আর অনুপ্রিয়ার ছেলের জন্ম একই মাসে, ১০ দিন আগে আর পরে। আমার ছেলে দেড় বছর বয়সে মোটামুটি আধো আধো বোলে বাক্যগঠন করা শুরু করে দিয়েছিল। অনুপ্রিয়ার ছেলে টুকটাক শব্দও বলতো না। আমি ওকে বুঝাতাম, একেকটা বাচ্চা একেক রকম একেকজনের ডেভেলপমেন্টের টাইমিং একেকরকম। কিন্তু যখন আমার ছেলের ৪ বছরের জন্মদিনে ওরা এলো আর তখনো ওর ছেলেটা মাঝেমাঝে “আম্মা”, “দাও”, “খাবো” এই দু-চারটে শব্দ ছাড়া আর কোন কথাই বলছিল না। তখন আমিও টেনশনে পড়ে গেলাম। কারণ আমার ছেলে অলরেডি স্কুলে যায়, প্লেগ্রুপে পড়ে, ওর সমবয়সী সব বাচ্চাই এখন চটরপটর সারাদিনই কথা বলে।

ছোট শিশুদের বেড়ে ওঠার কিছু মাইলস্টোন থাকে। যেমন- একটি নির্দিষ্ট বয়সে শিশুরা উপুড় হওয়া শেখে, বসা শেখে, হামাগুড়ি দেয়া শুরু করে, সেভাবেই একটি নির্দিষ্ট বয়সে তারা কথা বলা শুরু করে। ঐ বয়সে বা তার কিছু পরে যদি শিশুরা কথা বলা শুরু না করে তাহলে অবশ্যই বাবা-মা কে এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

Speech Language Hearing Association, USA’র মতে, সদ্য কথা বলা শিশুর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ যোগাযোগের ভাষা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত ছেলে শিশুদের তুলনায় মেয়ে শিশুরা দ্রুত কথা বলতে শেখে। কিন্তু যদি কোনো শিশু ১৮ থেকে ২০ মাস পার হওয়ার পরও দিনে ১০টির কম শব্দ বলে বা ২১ থেকে ৩০ মাস পার হওয়ার পর দিনে ৫০টিরও কম শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে তাদের ‘লেইট টকিং চিলড্রেন’ (Late Talking Children) বলা হয়।

শিশুর দেরিতে কথা বলার কারণ

  • শিশু বংশগত কারণে দেরিতে কথা বলা শুরু করতে পারে।
  • মস্তিষ্কের জন্মগত ত্রুটি। ত
  • প্রসবকালীন জটিলতা।
  • প্রসবোত্তর স্বল্পকালীন অসুখ যেমন – ভীষণ জ্বর, খিঁচুনি, জীবাণু সংক্রমণ, মস্তিকের ভেতর জীবাণু সংক্রমণ ইত্যাদি শিশুর কথা বলার বাধা হতে পারে।
  • জিহ্বার ত্রুটির কারণে অনেক শিশু ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না।
  • শিশুর মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে শিশু দেরিতে কথা বলা শেখে।
  • শিশুর সামনে ঝগড়া করলে বা অত্যধিক উচ্চস্বরে কথা বললে নার্ভাসনেসের কারণে তাদের কথা জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে।

শিশুর প্রথম বুলি

শিশুর কথা বলার শুরুটা হয় কিছু টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন বর্ণ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। শিশু প্রথমে সাধারণত তা, কা, মা এসব বর্ণ উচ্চারণ করে, যার তেমন কোনো অর্থ থাকে না। ছয় থেকে আট মাস বয়সে ধীরে ধীরে এ বর্ণগুলো এক একটি শব্দে রূপ পায়, যা কখনো কখনো অর্থপূর্ণ, কখনো বা না। যেমন – মামা, চাচা, কাকা, দাদা ইত্যাদি। এটা সাধারণত শিশুরা শুরু করে ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে।

আমাদের করণীয়

শিশু যখন থেকে কথা বলার চেষ্টা করা শুরু করবে, ঐ সময় পরিবারের সকলকেই শিশুকে বেশি সময় দিতে হবে। শিশুর আধো আধো বুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মা-বাবা এবং পরিবারে যদি অন্য কোন সদস্য থাকে তাদেরকেও তার সঙ্গে অনেক কথা বলতে হবে। স্পষ্ট এবং শুদ্ধ উচ্চারণে যতটা সম্ভব।

শিশু কোনো কথা ঠিকভাবে বলতে না পারলে নিজের মতো করেই উচ্চারণ করে। এতে বাড়ির মানুষেরা অনেক সময় খুশি হয়ে থাকেন। এবং সবাই দেখা যায় আদরের শিশুটির সাথে তাল মিলিয়ে ভুল উচ্চারণেই শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন। কিন্তু এতে করে কিন্তু ক্ষতিটা শিশুরই হয়। সে ভুল বললে বড়রা সেটা অবশ্যই ঠিক করে বলবে যেন শিশুটি শুনতে শুনতে ঠিক করে বলে।

শিশুকে কথা না বলতে পারা, বা ভুলভাবে বলার জন্য ধমক দেয়া যাবে না কিন্তু। এতে শিশুর মধ্যে ভয় দানা বাঁধে এবং পরে সে কথা বলতে অনাগ্রহী হয়ে যেতে পারে। তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়। শিশুর কথা বলা শেখার জন্য তার সঙ্গে বেশি করে কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুকে বারবার শোনাতে হবে নানা ধরণের ছড়া বা ঘুমপাড়ানি গান। একসময় সে হয়তো নিজের মতো করেই ওগুলো বলতে চেষ্টা করবে।

তাকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চেনাতে হবে। বিভিন্ন রঙিন বই নিয়ে বইয়ের ছবিগুলোর নাম স্পষ্ট উচ্চারণে বলতে হবে। তাহলে শিশু শুনে শুনে দ্রুত কথা বলা শিখবে। কারণ, শিশুরা শুনে শুনেই কথা বলা শেখে।

শিশুরা খেলতে খেলতেও অনেক কিছু শেখে। সঠিক খেলনা বাছাই করাও কিন্তু কথা বলা শেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ব্যাটারিচালিত খেলনাগুলোর শিক্ষামূলক উপযোগিতা তুলনামূলক অনেক কম। রঙিন লেগো সেট, কিচেন সেট, রঙিন বই এগুলো বেশ ভালো খেলনা। খেলনাগুলোর কোনটা কি রঙ সেগুলো বারবার শিশুকে বলবেন। মা রান্না করার সময় শিশুকে কাছে কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে বসিয়ে বিভিন্ন সবজির নাম বলা, মশলার নাম বলা, রঙ চেনানো, এটাও কিন্তু কথা বলা শেখানোর জন্য ভালো একটা পন্থা।

তবে সব চেষ্টা করা এবং শিশুর দুই বছর পার হবার পরেও কথা না বলে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্পিচ থেরাপির সহযোগিতা নেয়া ভালো।

স্পিচ থেরাপি কী?

স্পিচ থেরাপি হচ্ছে বিশেষ এক ধরণের চিকিৎসা ব্যবস্থা, যার সাহায্যে কথা বলতে অক্ষম অথবা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না এমন রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। জিহ্বায় আটকানো, তোতলামি, শিশুদের দেরিতে কথা বলা, কানে কম শোনাজনিত কথা বলার সমস্যা ইত্যাদি নানা কারণে যারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না, তাদের সাহায্য করে এই স্পিচ থেরাপি।

কোথায় যোগাযোগ করবেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) স্পিচ থেরাপি সেন্টার আছে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও ভিত্তিক সংস্থা ও এ ধরণের সেবা দিয়ে থাকে।

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।

লিখেছেন – নন্দিনী