আপনার জাজমেন্টাল কমেন্ট ও অবাঞ্ছিত প্রশ্ন অন্যকে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে না তো?

আপনার জাজমেন্টাল কমেন্ট ও অবাঞ্ছিত প্রশ্ন অন্যকে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে না তো?

Untitled-2

আমরা প্রায়ই কিছু কথা শুনি যেগুলো শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়! মন খারাপের সাথে কোনো কাজেও মন দিতে পারি না। এতো মোটা হয়ে গেলে কিভাবে? স্যালারি কত পাও? এই কাজটা পারো না তুমি? বিয়ে করবে না? এই কথাগুলো কিন্তু আমরা কমবেশি সবাই শুনেই থাকি, অনেক সময় কাছের মানুষদের থেকেই এমন জাজমেন্টাল কমেন্ট শুনতে হয়। আবার নিজেরাও হয়তো কাউকে নিয়ে এমন একটা কথা বলে ফেলি, কিন্তু এমন অনেক কথা আছে যেগুলো বলে আমরা কারও উপকার তো করতেই পারি না এবং এতে কোন সল্যুশনও পাওয়া যায় না। তাহলে কেন আমরা এগুলো বলি? আজ একটু অন্যরকম বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই।

আচ্ছা, আপনি কখনও কারোর পার্সোনাল লাইফ নিয়ে অযাচিত প্রশ্ন করেছেন? 

নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখুন তো, সোশ্যাল লাইফে আপনি কাউকে কথা দিয়ে আঘাত করেছেন কি? হয়তো না বুঝে, বা আড্ডার ফাঁকে বা হাসি ঠাট্টার ছলে। আপনাকে যখন কেউ মেন্টাল অ্যাবিউজ করে, তখন আপনার খুব রাগ বা অভিমান হয়, কেন তারা আপনার লাইফে ইন্টারফেয়ার করছে এটাও মনে হয়! কিন্তু আপনি নিজে কারোর মানসিক কষ্টের কারন হচ্ছেন না তো? একটু ভেবে দেখবেন!

সোশ্যাল লাইফে আপনার জাজমেন্টাল কমেন্ট অন্যকে মানসিকভাবে ঘায়েল করছে না তো? 

পড়াশুনা তো প্রায় শেষ, বিয়ে করবে না? বয়স তো অনেক হল! এখন বিয়ে না করলে আর কবে?

কি কথাগুলো খুব পরিচিত মনে হচ্ছে! পরিচিত মনে হওয়ারই কথা। কারন, হুট করে যখন কেউ বিয়ে প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলে তখন আমরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যাই। খুব বিরক্ত লাগে তখন, তাই না? এগুলো একান্তই পার্সোনাল বিষয়। আপনি নিজে কখনও এই প্রশ্ন কাউকে করেছেন? একটা ছেলে বা মেয়ে কখন বিয়ে করবে এটা সম্পূর্ণই তার নিজের ডিসিশন। হয়ত সে এখন বিয়ে করতে চাচ্ছে, কিন্তু বিয়ের প্ল্যানটা পেছাতে হচ্ছে পারিবারিক সমস্যার কারনে। অথবা এমনটাও হতে পারে যে সে যাকে পছন্দ করে এবং বিয়ে করতে চায়, সে হয়ত এখন প্রস্তুত না এবং কিছুটা সময় নিচ্ছে বিয়ের জন্য। ক্যারিয়ার, উচ্চশিক্ষা নিয়েও প্ল্যান থাকতে পারে। আপনিতো তার অবস্থান বা লাইফ গোল জানেন না, তাহলে এই ধরনের প্রশ্ন করে তাকে বিব্রত করার তো মানে হয় না, তাই না?

আরে তুই এত মোটা হয়ে গেলি কিভাবে! শুকায়ে তো পাটকাঠি হয়ে গেলি একদম, ফুঁ দিলেই উড়ে যাবি।

এমন কথাগুলো কিন্তু প্রায়ই আমরা ফ্রেন্ডসার্কেল অথবা আশেপাশের মানুষদের থেকে শুনে থাকি। নিজেও হয়তো কোনো বন্ধুকে মজা করে বলে ফেলি! কিন্তু সামনে সে কোনো রিঅ্যাক্ট করলো না, তার মানে এই না যে সে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পায়নি। কারন না জেনে কেন শারীরিক গঠন নিয়ে এমন ধরনের কথা বলবো আমরা? শারীরিক কোন অসুস্থতায় বা বংশগতভাবে ওয়েট গেইন করার কারনে তাকে আমরা না জানি কত নামেই ডাকি! আবার যার ফিজিক্যাল গ্রোথ কম তাকেও কমবেশি অনেক কথা শুনতে হয় প্রতিদিন। ফিজিক্যাল স্ট্রাকচার নিয়ে খোঁটা দেওয়াতে সে যে ফ্রাস্টেশনে ভুগতে পারে আর তার কনফিডেন্স লেভেল কতটা কমে যায়, এসব নিয়ে আমরা কখনও ভেবেছি?

এই তুমি এত কালো হয়ে গেলে কিভাবে? এমন কালো হয়েছ যে হারিকেন দিয়ে খোজা লাগে তোমাকে। দেখো না এখনকার মেয়েরা কত কিছু করে ফর্সা হওয়ার জন্য। এখন তো কত ফর্সা হওয়ার ক্রিম আছে। সেগুলো মাখতে পারো না? 

আমরা যারা শ্যামলা বর্ণের, তারাতো এই কথাটা শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি! এটা তো রীতিমত একটা মানসিক শাস্তি দেয় যে কেন কালো হলাম আমি। এই সমাজই যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফর্সা মানেই সুন্দর! কিন্তু না, কেন সবাইকেই ফর্সা হতে হবে? একেক জনের স্কিনটোন একেক রকম সুন্দর। আর সবচেয়ে বড় কথা সৌন্দর্য আসে ভেতর থেকে, গায়ের রঙ থেকে নয়। গায়ের রঙ দিয়ে কেন আমরা মানুষকে মূল্যায়ন করবো? এমন মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া উচিত। হাসি ঠাট্টার ছলেও গায়ের রঙ নিয়ে কাউকে অ্যাবিউজ করা ঠিক না।

ওহ মাই গড! তুমি এটা পারো না! পারো টা কি তুমি?

ভার্সিটি, অফিস অথবা ফ্যামিলিতেই কতবার যে এই কথা শুনতে হয়েছে। আপনিও কি শুনেছেন? আমরা সবাই কি সব কাজ পারি? না তো! আমরা একেক জন একেক কাজে এক্সপার্ট। প্রতিটা মানুষের নিজস্ব কিছু গুন আছে, সবাইকে সব পারতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তুমি এটা পারো না, ওটা হচ্ছে না, এই ধরনের কথাতে সে আরও ডিমোটিভেটেড হয়ে যায়, সে যতটুকু আগ্রহ নিয়ে কাজটা শিখতে চেয়েছিল সেই আগ্রহটা সে হয়তো হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই, কথার বাক্যবাণে তাকে দমিয়ে না দিয়ে উৎসাহ দিতে হবে, ভালো করে শিখিয়ে দিতে হবে আর সামান্য অ্যাপ্রেসিয়েশনেও তার আগ্রহ কিন্তু আরও বেড়ে যাবে।

স্যালারি কেমন পাও?

হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি, জব শুরু করার পর কতবার শুনেছেন এই কথাটি? যতবারই কেউ আপনাকে আপনার স্যালারি জিজ্ঞেস করেছে কেমন লেগেছে তখন! নিশ্চয়ই অনেক বিব্রতবোধ করেছেন, তখন অবশ্যই আমাদের আনকমফোর্টেবল লাগে। আবার স্যালারি কত পাই সেটা নিয়েও অনেকে জব পজিশন বা কোয়ালিফিকেশন যাচাই করে ফেলে, যেটা একদমই নরমাল শিষ্টাচার না। তাই আমরা চাইলেই কিন্তু পারি কাউকে তার স্যালারি জিজ্ঞেস না করে সে তার কাজ কতটা এনজয় করছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করতে।

একটা মেয়ে কেন সিগারেট খাবে? সিগারেট তো ছেলেরা খায়! মেয়েটা নিশ্চয়ই অনেক খারাপ!

আচ্ছা বলুন তো সিগারেট খাওয়ার সাথে ছেলে মেয়ে বা জেন্ডারের কী সম্পর্ক? একটা ছেলে সিগারেট খেলে কোনো প্রবলেম নেই, অথচ একটা মেয়ে সিগারেট খেলে সে খারাপ হয়ে গেলো! সিগারেট শরীরের জন্য ক্ষতিকর, এটা ক্যান্সারের কারন- এই কথাগুলো গুছিয়ে আপনি বলতে পারেন। কিন্তু শুধু একটা মেয়ে সিগারেট খেলেই সে খারাপ এবং একটা ছেলে সিগারেট খেলে নরমাল ব্যাপার, এভাবে চিন্তা করাটা খুবই জাজমেন্টাল হয়ে যায়। যেটা খারাপ সেটা সবার জন্যই খারাপ।

তো কী মনে হল কথাগুলো শুনে? এই কথাগুলো কাউকে বলে কি আপনার কোনো লাভ হয়? হয় না তো! তাহলে কেন বলেন? আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না এইসব অযাচিত মন্তব্য করে। আর যেই মানুষটাকে আপনি এসব কথা শুনাচ্ছেন, তার মেন্টাল হেলথে কী প্রভাব পরছে, সেটা নিয়ে কখনও ভেবেছেন? তাই চলুন নিজের চিন্তাধারা বদলে ফেলি। আমরা চাইলেই কিন্তু পারি জীবনে পজিটিভ পরিবর্তন নিয়ে আসতে। আমরা পাল্টালেই সমাজ পাল্টে যাবে। শরীরের সুস্থতার সাথে সাথে মেন্টাল হেলথেরও যত্ন নিতে হবে। সবাই ভালো থাকবেন।

ছবি- সাটারস্টক

5 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...