লিম্ফোমা ক্যান্সার এর ঝুঁকি কাদের ক্ষেত্রে বেশি থাকে?

লিম্ফোমা ক্যান্সার এর ঝুঁকি কাদের ক্ষেত্রে বেশি থাকে?

lymphoma

মানবদেহে কোনো জীবাণু আক্রমণ করলে তার সাথে লড়াই করার নেটওয়ার্ক সিস্টেম এর নাম লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম। এই সিস্টেমে যে ক্যান্সার হয় তার নামই লিম্ফোমা। এই লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে লিম্ফ নোড (লিম্ফ গ্রন্থি), স্প্লিন বা প্লীহা, থাইমাস গ্রন্থি ও অস্থি মজ্জা। লিম্ফোমা ক্যান্সার সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য জানবো আজকের ফিচারে।

লিম্ফোমা ক্যান্সার এর প্রকারভেদ

  • হজকিন লিম্ফোমা
  • নন-হজকিন লিম্ফোমা

লক্ষণ বা উপসর্গ

চলুন প্রথমে জেনে নেই লিম্ফোমা ক্যান্সার এর কিছু লক্ষণ-

  • ঘাড়, বগল ও কুঁচকিতে লিম্ফনোড ফুলে যেতে পারে, তাতে ব্যথা নাও থাকতে পারে
  • সবসময় ক্লান্তিভাব থাকতে পারে
  • জ্বর জ্বর ভাব থাকতে পারে
  • রাতে অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে
  • নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে
  • কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যেতে পারে

লিম্ফোমা ক্যান্সার এর কিছু লক্ষণ

কারণ

লিম্ফোমার প্রকৃত কারণ এখনও অজানা। কিন্তু এটি শুরু হয় সাধারণত লিম্ফোসাইট নামক রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্তকণিকার মিউটেশনের ফলে। এই মিউটেশনের ফলে সুস্থ স্বাভাবিক লিম্ফোসাইটের সাথে সাথে ত্রুটিযুক্ত লিম্ফোসাইটেরও দ্রুত বৃদ্ধি হয়। এই মিউটেশনের ফলে কোষগুলো টিকে যায় যেখানে অন্যান্য স্বাভাবিক কোষগুলো মারা যায়। এটি লিম্ফ নোডগুলোতে রোগাক্রান্ত ও অকার্যকর লিম্ফোসাইট সৃষ্টি করে এবং যার ফলে লিম্ফ নোড, প্লীহা ও লিভার ফুলে যায়।

লিম্ফোমা ক্যান্সার এর ঝুঁকি কাদের বেশি?

চলুন এবার জেনে নেই এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কাদের কাদের ক্ষেত্রে বেশি থাকে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত-

১) বয়স

যেকোনো বয়সে লিম্ফোমা হতে পারে। তবে সাধারণত নন-হজকিন লিম্ফোমা বয়স্কদের মাঝে বেশি দেখা যায়। বয়সের সাথে সাথে কিছু শারীরিক পরিবর্তনের কারণে এমন হতে দেখা যায়। হজকিন লিম্ফোমা ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের বেশি দেখা যায়।

২) ফ্যামিলি হিস্ট্রি

লিম্ফোমা সাধারণত বাবা-মা থেকে সন্তানে সরাসরি ছড়ায় না। কিন্তু তবুও কোনো কাছের আত্মীয় যেমন- বাবা, মা, ভাই, বোন, এদের কারো লিম্ফোমা বা অন্য কোনো ধরনের ক্যান্সার থাকলে সেক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি থাকে।

ক্যান্সারের কারণ

৩) দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে বিভিন্ন রকম ইনফেকশনের সাথে শরীরের লড়াই করার ক্ষমতা কমে যায়। এর মধ্যে এমন ইনফেকশনও আছে যার ফলে লিম্ফোমার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যেমন- এইচ আই ভি এইডস এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। এইচ আই ভি আক্রান্ত রোগীদের বিভিন্ন রকম লিম্ফোমাতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৪) বিশেষ কিছু ইনফেকশন

লিম্ফোমা কোনো ইনফেকশন নয়, এটা এক প্রকার রক্তের ক্যান্সার। কিন্তু বিশেষ কিছু ইনফেকশনের কারণে লিম্ফোমার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। যেমন- হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি, কমপাইলব্যাক্টার পাইলোরি ইত্যাদি। কিছু ভাইরাসের আক্রমণের ফলে লিম্ফোসাইটের ডিএনএ পরিবর্তন হয়ে যায়। যার ফলে সেটা লিম্ফোসাইট ক্যান্সারে রূপ নেয়। যেমন- Epstein-Barr virus, Hepatitis C virus, Herpes simplex viruses ইত্যাদি।

৫) অটোইমিউন ডিজিজ

অটোইমিউন ডিজিজ হলো শরীরের এমন এক অবস্থা যখন শরীর ভুলবশত নিজের সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে। যেমন- হাশিমোটো ডিজিজ, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হলে লিম্ফোমা ক্যান্সার হওয়ার চান্স থাকে।

এই রোগ নির্ণয় করা যায় কীভাবে?

লিম্ফোমা ক্যান্সার

কিছু টেস্টের মাধ্যমে লিম্ফোমার স্টেজ ও ধরন নির্ণয় করা যায়। যেমন- লিম্ফ নোড বায়োপসির মাধ্যমে, ব্লাড স্যাম্পল টেস্টিং, বোনম্যারো টেস্টিং। এছাড়াও পেট সিটি স্ক্যান, এম আর আই এর মাধ্যমেও লিম্ফোমা নির্ণয় করা যায়। তবে  ক্যান্সার নির্ণয়ে বায়োপসিকেই বেশি নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়।

লিম্ফোমা ক্যান্সার এর চিকিৎসা

১) লিম্ফোমার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো যতটা সম্ভব ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা এবং রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এজন্য কোন পদ্ধতিটি বেছে নেওয়া হবে সেটি নির্ভর করে লিম্ফোমার ধরন, সার্বিক শারীরিক পরিস্থিতি ও রোগের মাত্রা বা ক্যান্সার স্টেজের উপর।

২) কিছু কিছু লিম্ফোমা খুবই ধীরে বৃদ্ধি পায়। দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত না ঘটালে লিম্ফোমা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে লিম্ফোমা নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা তা দেখতে হবে।

৩) অ্যাডভান্সড পর্যায়ে গেলে কেমোথেরাপির মাধ্যমে দ্রুত বর্ধনশীল ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করা যায়। তাই হেমাটোলজিস্ট (রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ) ও অনকোলজিস্ট (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) এর পরামর্শ নিন। ক্যান্সারের ধরন অনুযায়ী কেমো দিতে হবে সময় নষ্ট না করে।

কেমোথেরাপি

৪) রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলার জন্য এক্স-রে ও প্রোটনের মতো শক্তির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রশ্মি ব্যবহার করা হয়।

৫) বোন ম্যারো বা স্টেম সেল ট্রান্সফার এর মাধ্যমে লিম্ফোমার চিকিৎসা করা যায়। প্রথমে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় বা কমানো হয়। তারপর সুস্থ বোন ম্যারো বা স্টেম সেল শরীরে প্রবেশ করানো হয়।

৬) এছাড়া ক্ষেত্র বিশেষে টার্গেটেড থেরাপি বা অ্যান্টিবডি থেরাপি দেওয়া হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও ক্যান্সার স্টেজ বিবেচনা করে অনকোলজিস্ট সিদ্ধান্ত নিবেন তার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান কী হবে। ট্রিটমেন্ট শেষ হয়ে গেলেও কিন্তু ফলোআপে থাকতে হবে।

শেষকথা

ক্যান্সার রোগীর ট্রিটমেন্ট

ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। কম বয়সীদের এবং যাদের আর্লি স্টেজে ধরা পরে, তাদের ক্ষেত্রে সার্ভাইভাল চান্স বেশি থাকে। যদি লিম্ফোমা লিম্ফ নোডের বাইরে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি একটি নেগেটিভ সাইন। সেক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা জটিল হয়। যেহেতু মেডিকেল সায়েন্স এখন অনেক দূর এগিয়েছে, এখন ক্যান্সার নিয়েও অনেক গবেষণা হচ্ছে, তাই আশা হারাবেন না।

লিম্ফোমা ক্যান্সার এর ঝুঁকি কাদের ক্ষেত্রে বেশি থাকে এবং এর চিকিৎসা কী, সে সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পেয়েছেন আশা করি। বাংলাদেশেই এখন লিম্ফোমা রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা রয়েছে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় হলে ৭০ থেকে ৯০ ভাগ লিম্ফোমা রোগী সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। শুভ কামনা সকলের জন্য।

ছবি- সাটারস্টক

22 I like it
1 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...