সার্কেডিয়ান রিদম | আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লক সম্পর্কে জানেন কি? - Shajgoj

সার্কেডিয়ান রিদম | আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লক সম্পর্কে জানেন কি?

ছোটবেলা থেকে নিশ্চয়ই শুনেছেন, প্রতিটি মানুষের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে সকাল সকাল উঠে যাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন আমরা ঘুমানোর জন্য রাত এবং সব কাজকর্ম করার জন্য দিনের সময়টিকেই কেন বেছে নেই? আমাদের ঘুমানো, জেগে উঠা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ কিন্তু এমনি এমনি সম্পন্ন হয় না, এর পিছনে অবদান রয়েছে আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লকের, যেটি সার্কেডিয়ান রিদম নামে পরিচিত। আজকের ফিচারে থাকছে সার্কেডিয়ান রিদম ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত।

সার্কেডিয়ান রিদম কাকে বলে?

আগে আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লক সম্পর্কে জানতে হবে। বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহ ঘড়ি বলতে এমন একটি মেকানিজমকে বোঝানো হয়,যেটি আমাদের দেহের অভ্যন্তরে থাকে এবং দেহের প্রতিটি কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে। মেটাবলিজম, ঘুমানো-জেগে উঠার প্যাটার্ন, হরমোন প্রোডাকশন, মুড ইত্যাদি সবকিছুই চলে বায়োলজিক্যাল ক্লকের নিয়ন্ত্রণে। বায়োলজিক্যাল ক্লকের মূল কাজ হলো শারীরবৃত্তীয় প্রতিটি কাজ যেন সঠিক সময়ে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করা। 

মানুষ সহ প্রতিটি জীব বায়োলজিক্যাল ক্লক অনুসরণ করে। একেকটি ক্লক একেক ধরনের সময়ের প্যাটার্ন ফলো করে পরিচালিত হয় এবং সে অনুযায়ী এগুলোর নামকরণ হয়। যেমনঃ মানুষের বায়োলজিক্যাল ক্লক ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে পরিচালিত হয় বলে এটিকে সার্কেডিয়ান রিদম বলে। আবার উদ্ভিদের বিভিন্ন সিজনে ফুল ফোটা বা গ্রোথ কিন্তু আরেকটি বায়োলজিক্যাল ক্লক ফলো করে, যা প্রায় ১ বছর সময় ধরে পরিচালিত হয়। 

সার্কেডিয়ান রিদম আর্থ রোটেশনের সাথে মিল রেখে ২৪ ঘণ্টায় পরিচালিত হয় বলে এটির সাথে দিন ও রাতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এটি আমাদের ঘুমানো ও জেগে উঠার সময় নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে এটিকে স্লিপ-ওয়েক সাইকেলও বলা হয়। তবে শুধুমাত্র এটিই নয়, আমাদের বডি সঠিকভাবে ফাংশন করতেও সার্কেডিয়ান রিদমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে ।

সার্কেডিয়ান রিদম মস্তিষ্কই নিয়ন্ত্রণ করে

কীভাবে তৈরি হয়?

মস্তিষ্কের সাথে আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সংযোগ রয়েছে। সার্কেডিয়ান রিদমও পরিচালিত হয় মস্তিষ্কের মাধ্যমেই। আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশে একগুচ্ছ বিশেষ নার্ভ সেল রয়েছে, যেটিকে ইংরেজিতে Suprachiasmatic Nucleus(SCN) বলা হয়। এটিকে দেহের মাস্টারক্লকও বলা হয়। মাস্টারক্লকের নার্ভ সেলগুলো আমাদের চোখের অপটিক নার্ভের সাথে কানেক্টেড থাকে। তাই আলো ও অন্ধকার বুঝে সেভাবে বডিকে ফাংশন করার জন্য মাস্টারক্লক প্রয়োজনীয় সিগনাল পাঠাতে পারে। 

বিষয়টি আরেকটু ভেঙে ব্যাখ্যা করছি। আমাদের চোখের রেটিনাতে বিশেষ এক ধরনের সেল রয়েছে, যেগুলো পরিবেশের ব্রাইটনেস ডিটেক্ট করতে পারে বলে দিন ও রাত কখন হচ্ছে বুঝতে পারে। সকাল আলো চোখে পড়লে এই সেলগুলো অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মাস্টারক্লককে এই ইনফরমেশন পাঠায়। তখন মাস্টারক্লক থেকে এমনভাবে সিগনাল পাঠানো হয়, যাতে করে আমাদের শরীর ঘুম থেকে জেগে উঠার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তখন আমাদের বডি টেম্পারেচার, হার্ট রেইট এবং ব্লাড প্রেশার কিছুটা বেড়ে যায়, যা জেগে উঠারই একটি অংশ। 

তারপর সূর্য ডুবে যাওয়ার পর অন্ধকার হয়ে গেলে মাস্টারক্লক অপটিক নার্ভের মাধ্যমে রাত হয়ে যাওয়ার ইনফরমেশন পায় এবং সে অনুযায়ী আবার সিগনাল পাঠায় যাতে করে আমাদের শরীর ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত হয়। তখন আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। এভাবেই সার্কেডিয়ান রিদমের মাধ্যমে আমাদের স্লিপ সাইকেল পরিচালিত হয়। 

মেলাটোনিন ও কর্টিসল হরমোনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

জানতে হবে মেলাটোনিন ও কর্টিসল হরমোন সম্পর্কে

সার্কেডিয়ান রিদম গতিশীল রাখতে মেলাটোনিন ও কর্টিসল নামের দু’টো হরমোনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেলাটোনিন এমন একটি হরমোন যেটি আমাদের স্লিপ সাইকেল বা ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। এটি পেনিয়াল গ্ল্যান্ডে তৈরি হয়। দিনের আলোতে মেলাটোনিন কমে গেলে আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠি। 

মেলাটোনিনের পাশাপাশি কর্টিসল নামের আরো একটি হরমোন রয়েছে, যেটি স্ট্রেস হরমোন নামেও পরিচিত। এটি আমাদের সকালে জেগে উঠতে সহায়তা করে। হাইপোথ্যালামিক পিটুইটারি অ্যাড্রেনাল এক্সিস থেকে এই হরমোনের উৎপত্তি। সকাল বেলা কর্টিসল হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায় বলেই আমরা অ্যালার্ট হয়ে ঘুম থেকে সহজে জেগে উঠতে পারি। অন্যদিকে রাতে মেলাটোনিন হরমোন প্রোডাকশন বাড়তে থাকে এবং কর্টিসল হরমোনের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। এ কারণেই রাত হলে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। 

এই রিদম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ?

সার্কেডিয়ান রিদম এমন একটি রিদম যা সাজেস্ট করে আমাদের রাত না জেগে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে। এখন আপনাদের মনে হতেই পারে, রাতে একটু দেরি করে ঘুমালে কী ই বা হবে? একটু খেয়াল করলে দেখবেন, একদিন রাতে ঠিকমতো না ঘুমালে পরেরদিন ক্লান্ত লাগে, প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়, কিছু করতেই ভালো লাগে না। এমন কেন হয় জানেন? সারাদিন আমরা এই যে এত ব্যস্ত থাকি, এর ফলে কিন্তু আমাদের বডি সেলগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ঘুম আমাদের সেলগুলোর জন্য একটি ব্রেকের মতো কাজ করে। সময়মতো ঘুমালে আমাদের যে বডি সেলগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে,সেগুলো প্রোপারলি রিপেয়ার হয়ে এনার্জি রিস্টোর করতে পারে এবং এর কারণেই আমরা পরদিন কাজ করতে পারি। আমাদের ইমিউন সিস্টেম তৈরি করতেও সার্কেডিয়ান রিদমের গুরুত্ব অনেক। 

শুধু ঘুমানোই বা বলছি কেন, আমাদের মেটাবলিজম অর্থাৎ খাবার হজম করার সিস্টেমটিও কিন্তু সার্কেডিয়ান রিদম ফলো করে। আমাদের ডাইজেস্টিভ সিস্টেম রাতের তুলনায় দিনের বেলা বেশি সক্রিয় থাকে। যে এনজাইমগুলো খাবারকে ব্রেক ডাউন করে প্রয়োজনীয় নিউট্রিয়েন্টে কনভার্ট করে, সেই এনজাইম লেভেলও দিনের বেলা বেশি থাকে৷  এ কারণেই রাতের বেলা তাড়াতাড়ি ডিনার করে নেওয়া উচিত। কারণ যত দেরি করে খাবার খাবেন, ডাইজেস্ট হতে তত টাইম লাগবে। অন্যদিকে যদি ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘন্টা আগে খাবার খাওয়া হয়, তাহলে খাবার ভালোভাবে ডাইজেস্ট হতে পারে, এবং এতে করে গাট হেলথও ভালো থাকে। 

সার্কেডিয়ান রিদম ও প্রোডাক্টিভিটি

তাছাড়া সার্কেডিয়ান রিদমের সাথে প্রোডাক্টিভিটিরও সম্পর্ক রয়েছে। সকালবেলা কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায় বলে আমাদের প্রোডাক্টিভিটিও তখন তুলনামূলক বেশি থাকে। এর ফলে পড়াশোনা, এক্সারসাইজ বা যেকোনো গুরুত্বপুর্ণ কাজ এ সময়ে করতে পারলে মনোযোগের সাথে নিখুঁতভাবে করা যায়। আপনারা যদি রাতে দেরি করে ঘুমিয়ে বেলা করে ঘুম থেকে উঠেন, তাহলে দেখবেন চেষ্টা করেও হয়তো কাজে পুরোপুরি ফোকাস করতে পারবেন না। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতে দেরি করে ঘুমালে সার্কেডিয়ান রিদমের ব্যালেন্স নষ্ট হয়, যা থেকে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি হতে পারে। যদি আমরা সঠিক সময়ে আমাদের প্রতিদিনের কাজগুলো না করি, তাহলে বিভিন্ন হেলথ ইস্যু দেখা দিতে পারে। যেমনঃ ওবেসিটি, ডায়াবেটিস, স্লিপ ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে ডিপ্রেশন কিংবা বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো মেন্টাল হেলথ কনসার্নের ইত্যাদি সার্কেডিয়ান রিদমের ব্যালেন্স নষ্ট হওয়ার ফলেই হয়ে থাকে। 

তাই পরিশেষে পরামর্শ থাকবে, কখনোই অযথা রাত জাগবেন না। সেই সাথে রাতে কখনোই বেশিক্ষণ ল্যাপটপ বা ফোন ইউজ করবেন না। বরং রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে সকালে তাড়াতাড়ি ওঠার চেষ্টা করুন। সার্কেডিয়ান রিদমকে রেসপেক্ট করুন। দেখবেন, তাহলেই সুস্থ থাকতে পারবেন। 

ছবিঃ সাটারস্টক, সাজগোজ

1 I like it
0 I don't like it
পরবর্তী পোস্ট লোড করা হচ্ছে...