যৌনতা এবং আমরা: কী জানি, কতটুকু জানি? – Shajgoj



যৌনতা এবং আমরা: কী জানি, কতটুকু জানি?


সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮



এমন একটা টপিক যেখানে যত কম কথা বলে পারা যায় তত ভালো, আরও ভালো হয় যৌনতা সংক্রান্ত সব টপিক অচ্ছুৎ ঘোষণা করে নিজেকে কোনভাবে শ্বেত শুভ্র প্রমাণ করা গেলে, তাই না? (অন্তত এদেশের মানুষের আচরণ দেখে তো সেটাই মনে হয় আমার!)

দেশের জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে বোঝাই যায় তাতে ‘যৌনতা কি সেটাই আমি বুঝি না’- এই দৃষ্টিভঙ্গি ভড়ং ছাড়া কিছুই নয়! কিন্তু এই ভড়ং ধরার নেগেটিভ দিকগুলো কি জানেন?

  • শিশুদের কাছে সঠিক তথ্য না পৌছনো ফলে শিশু যৌন নির্যাতনের বৃদ্ধি
  • টিনএজার স্পেশালি ইয়াং মেয়েদের কাছে স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে মিনিমাম জ্ঞান না থাকা, ফলে বিভিন্ন মেয়েলি রোগের অবাধ বিস্তার।
  • জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় ভয়াবহ পরিমাণে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ, গর্ভপাতের অসফল চেষ্টা, অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত নবজাতক শিশু!
  • সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে অনিরাপদ মিলন এবং রোগ ব্যধির বিস্তার!

তাই বোঝাই যাচ্ছে, সমাজকে ‘পূত পবিত্র’ রাখতে গিয়ে ‘কিছু না জানা’ এবং ‘না জানানো’ দুটো কনসেপ্ট-ই আসলে ব্যাকফায়ার করেছে। যেহেতু মানুষ চারদেয়ালের ভেতরে কেমন হবে এবং কি করবে সেটা আপনি আমি জানি না, তাই সে যেন বিশাল ভুল করে নিজের এবং সমাজের ক্ষতি না করে তাই আমাদের করনীয় আসলে কি?

তার কাছে সঠিক তথ্যটুকু অন্তত পৌঁছে দেয়া, তাই না?

তো চলুন কিছু বেসিক প্রশ্নের উত্তর জেনে আসি, যেগুলো হয়তো লজ্জায় আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করতেই পারছেন না।

১) পরিচ্ছন্নতা: নারীদের আলাদা কোন সাবানের দরকার আছে কি?

সত্যি কথা বলতে গেলে- নেই। প্রতিদিন গোসলের সময় প্রাইভেট এড়িয়া যতটুকু পারেন ক্লিন রাখবেন, মাসিকের সময় এবং মাসিকের পরে নরমাল উষ্ম গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করাটাই যথেষ্ট। প্রাইভেট এড়িয়া সাবান বা স্পেশাল ফেমিনিন সোপ দিয়ে পরিষ্কার রাখবার দরকার হবে না।

দেহের বাইরের ‘ভালভা’ অংশে গোসলের সময় গায়ে মাখা সাবান ইউজ করতে পারেন… কোনভাবেই অভ্যন্তর এলাকা (ভ্যাজাইনা) সাবান দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন না। কোন দরকার নেই!

২) পরিচ্ছন্নতা: মিলনের পর

দৈহিক মিলনের পর একটু ভালোভাবে ক্লিন আপ না করার কারণে হাজার হাজার নারী রোজ UTI বা মূত্রনালীর সংক্রমণে ভোগে, পুরুষও এই রোগের শিকার হন অগণিত। এথেকে বাঁচতে চেষ্টা করুন মিলনের পরপর মুত্রত্যাগ করতে, এতে সংক্রমণের চান্স অনেক কমে যায়। সাথে সাথে দেহের বাইরের এলাকা উষ্ম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। আবার বলছি, দেহের ভেতরে সাবান ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন না। সাবান সেনসিটিভ ত্বক ড্রাই করে সংক্রমণের চান্স আরও বাড়িয়ে দেবে।

ঝাপাঝাপি করে গোসল করে ফেললেন কিন্তু প্রাইভেট এড়িয়া ঠিকভাবে ক্লিন করলেনই না, এমন ঘটনাও প্রচুর দেখি। তাই এ বিষয়ে আরও কেয়ারফুল হবেন। সাথে সাথে গোসল করার দরকার কিন্তু নেই, জাস্ট পরিষ্কার থাকুন। নারী পুরুষ উভয়েই।

৩) পিল এবং নারী

এই বিষয়ে বিস্তারিত অবশ্যই আলাপ করবো। কিন্তু কনট্রাসেপটিভ পিল নিয়ে নারীদের ভুল ধারণার হার কতটুকু সেটা দেখে মাঝে মাঝে চমকে যাই। অনেক অ্যাডালট নারী জানেনই না সারামাসে খাবার মতো পিল এক্সিস্ট করে! তারা ‘ইমারজেন্সি পিল’ কিনে সেগুলোই নিজে নিজে খেয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর!

আবার অনেকে প্রপার গাইনকোলজিস্ট না দেখিয়ে বড় আপু, ভাবি, মা, ফ্রেন্ড যা খায় সেগুলোই একা একা কিনে নিয়ে আসেন, মোস্ট অফ দা টাইম যেগুলো সেই নারীকে স্যুটই করে না হয়তো!

ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ তো হতেই পারে, বিশাল মাপের হরমোনাল ইমব্যালেন্স দেখা দিতে পারে, দেহের ভারসাম্য বিগড়ে বিশাল পরিমাণে ওজন বেড়ে যেতে পারে, স্কিন-এ ব্রণ, র‍্যাশ, রেডনেস-সহ হাজার সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ যা! হয়তো তার স্বাভাবিক মাসিক চক্রই নষ্ট হয়ে যেতে পারে! যা পরবর্তীতে সন্তান ধারণ প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে!

সুতরাং, আপনি সেক্সুয়ালি একটিভ হলে অবশ্যই ডক্টর দেখিয়ে নিজের সাথে মানানসই কনট্রাসেপটিভ পিল নেবেন। আর নিজের পিলটাই অল্পবয়স্ক কাউকে আগ বাড়িয়ে সাজেস্ট করতে যাবেন না যেন! হেল্প-এর চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে ফেলবেন সেক্ষেত্রে! কেউ আপনার কাছে সাজেশন চাইলে তাকে সঠিক পদ্ধতিতে পিল কিনতে বলুন প্লিজ। সচেতনতা নিজের ঘরেই শুরু হয়, ওকে?

৪) কনডম যখন কোণঠাসা

কনডম ইউজ হচ্ছে কি হচ্ছে না সেক্ষেত্রে দেশের বেশিরভাগ নারীরই বলার কিছু থাকে না, আসলে কি বলতে হবে সেটা তো জানতে হবে, রাইট? তাই আগে জানা দরকার কখন কনডম ইউজ করা একেবারেই ম্যানডেটোরি।

  • যদি আপনার নিজস্ব কনট্রাসেপটিভ পিল না থাকে, সেক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের রিস্ক কোনভাবেই নেবেন না! অবশ্যই কনডম ইউজ করতে হবে। কারণ এই পদ্ধতিতেই আপনি পাবেন ৯৯.৭% প্রটেকশন।
  • আপনার কি হরমোনাল প্রবলেম আছে? সেক্ষেত্রে কনট্রাসেপটিভ পিল আপনার ব্যালেন্স আরও নষ্ট করে দিতে পারে। তাই পিল আপনার জন্য হারমফুল হলে কেন নিজের হেলথের ঝুঁকি নেবেন? এক্ষেত্রেও অবশ্যই কনডম ইউজ করতে হবে। আপনার মাসিক চক্রে এতে করে কোন প্রভাব পড়বে না, সন্তান ধারণ ক্ষমতাও প্রভাবিত হবে না।
  • আপনি বিবাহিত হন বা যাই-ই হন, কোনভাবে যদি এটা বোঝা সম্ভব হয় যে আপনার এক বা একাধিক সঙ্গী রয়েছে সেক্ষেত্রে কোন ঝুঁকি না নিয়ে সবসময় কনডম ইউজ করতে হবে। এতে করে ছোট খাটো ইনফেকশন-সহ বড় ধরনের রোগব্যধি সবকিছু থেকেই একসাথে নিরাপদ থাকতে পারবেন।

খুব গুছান টপিক নিয়ে না বলে আজ খুব বেসিক কিন্তু বারনিং কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবার ট্রাই করলাম।

শেষ কথা, “জানি না, জানা উচিত না, জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা লাগে, হয়তো লোকে খারাপ বলবে”– এইসব লজিক-এ নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ সবকিছু নিয়ে জুয়া খেলতে যাবেন না। এই সেনসিটিভ টপিকে আরও কোন প্রশ্ন থাকলে জানাতে পারেন। অবশ্যই যতটুকু সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করবো।

 

লিখেছেন: ডাঃ মারিহা আলম চৌধুরী

ছবি- টুইটার.কম