ভিন্ন শখ: কুকুর ছানা-কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (পর্ব-২) – Shajgoj



ভিন্ন শখ: কুকুর ছানা-কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (পর্ব-২)


সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮



আগে আমরা কথা বলেছি কুকুর ছানা নিয়ে। আজ কিছু ইম্পরট্যান্ট ইনফরমেশন নিয়ে জানবো… যেমন: কেমন হতে পারে, কেন পালবেন ইত্যাদি। কিছু পোষার আগে এ সম্বন্ধে সঠিক তথ্য জানা ভালো। তাহলে সিধান্ত নিতে সুবিধা হয়। দায়িত্ব নিতে হলে আগে জানতে হবে। হুট করে না নিয়ে বুঝে শুনে নেয়াটাই ভালো। কুকুর কোথায় পাবেন, কিভাবে এদের যত্ন নিতে হয় এসব কিছু নিয়ে আমরা আজ কথা বলবো।

 

বাসস্থান বুঝে বেছে নিন আপনার ছানা

কুকুরের অনেক ধরন আছে। আমাদের দেশের আবাহাওয়া বুঝে কুকুর অ্যাডপ্ট হবে। তাপমাত্রা বাসার সাইজ ফ্ল্যাট না বাড়ি বুঝে কুকুর নিতে হবে। সব কুকুর সব বাসায় সেট হয় না। এদের ধরনের উপর এদের সাইজ অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিপেন্ড করে। একেক কুকুরের ব্রিড একেক রকম। নেচার সব আলাদা। অনেক কুকুর আছে প্রায় মানুষের সমান উচ্চতা। আবার অনেক আছে একদম গরম তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। আমাদের দেশের জন্য না, এমনকি গরম থেকে মৃত্যুও হতে পারে। এই ব্রিড হচ্ছে হাস্কি। সাইজ-এ বড় দেখতে অনেকটা শিয়ালের মতো হয়। কিন্তু খুবই শান্ত স্বভাবের আর খুবই বন্ধুসুলভ হয়। আমাদের দেশের জন্য এরা ঠিক নয়। এদের যদি অ্যাডপ্ট করতে হয় তবে সারাদিন এসি-এর মধ্যে রাখতে হবে। এই ব্রিড শীতল দেশের জন্য।

 

লাব্র্যাডর রিট্রাইভার (Labrador Retriever) আরেকটি ব্রিড, এরা সাইজ-এ অনেক বড় হয়। খুবই ফ্রেন্ডলি, অ্যালার্টিং ও অ্যাক্টিভ ব্রিড। ফ্ল্যাট বাড়িতে রাখতে প্রবলেম হবে কারণ এদের সাইজ বড়। একটু বড়ো প্লেস-এ রাখতে হবে এদের। প্রতিদিন ওয়াক করাতে হবে।

জার্মান শেফার্ড (German Shepherd) ব্রিডটি আমাদের দেশে প্রচুর দেখা যায়। সাধারণত যাদের বড় বাড়ি আছে তাদের এটি পালতে দেখা যায়। এরা খুবই অ্যালার্টিং ও আক্রমণকারী হয়ে থাকে। দৃষ্টিশক্তি খুবই প্রখর। দূর থেকে বুঝে যায় কে আসছে। মানুষের গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। ডিটেকটিভ পুলিশ সার্ভিস-এ দেখা যায় এদের।

লাসা অ্যাপসো (Lhasa Apso) এটি খুবই কিউট একটা ব্রিড। ঢাকার ফ্ল্যাট বাড়িতে বেশি লাসা-ই দেখা যায়। সাইজ-এ ছোট লোমশ কিউট-এর ডিব্বা একটা পাপ্পি। দেখলেই মনে হবে আদর করে দিতে। এরা তিব্বত থেকে আসে। আপনি এদের সহজে কোলে নিয়ে ঘুরতে পারবেন। খুবই আদুরে স্বভাবের হয় এরা। ফ্রেন্ডলি ও অ্যালার্টিং তো বটেই। যদি রেগ্যুলার ওয়াক না করাতে পারেন তাহলে ঘরেই খেলুন এদের সাথে। লাসা নিলে আপনার জীবন আদরে-মায়ায় ভরপুর হয়ে থাকবে। কি করে বলছি এই কথা কারণ আমারই আছে। এদের আদর মায়া আপনার সারাদিনের ক্লান্তি-বিভ্রান্তি সব কমিয়ে দিবে।

কোথায় ও কেমন করে চিনে অ্যাডপ্ট করবেন

আমাদের দেশে কোন পেট শপ বা সেন্টার নেই। কাঁটাবনে কিছু সেল করে বা ওদের অর্ডার দিলে ওরা এনে দেয়। এছাড়া অনলাইন-এ কিছু পেজ আছে যারা কুকুর সেল করে থাকে। কিন্তু আপনি যখনই অ্যাডপ্ট করবেন অবশ্যই দেখে নিবেন কুকুরের বাচ্চাটির বাবা-মায়ের ভ্যাকসিন দেয়া আছে কিনা। দেয়া না থাকলে ভ্যাটেরিনারিয়ান-এর কাছ থেকে দিয়ে নিবেন। বাবা মায়ের যদি দেয়া থাকে তাহলে কুকুরের ৩ মাসের সময় একটা ভ্যাকসিন দিয়ে নিতে হবে। কেনার সময় সব দেখে নিবেন। ব্রিড-এর উপর দাম ডিপেন্ড করে। কিন্তু লাসা ব্রিড এর দাম এবং ফ্ল্যাট বাড়িতে সুবিধা বলে সেল বেশি হয়, তাই অ্যাভেইলেবল-ও।

ভ্যাটেরিনারি ক্লিনিক এবং ওদের ট্রিটমেন্ট

আমাদের দেশে এখনো কোন তেমন পশু হাসপাতাল নেই যেখানে প্রপার-ভাবে ওদের ট্রিটমেন্ট হয়। কিছু আছে পশু হাসপাতাল ভালো। ধানমন্ডি ২৭-এ আছে একটা, পুরান ঢাকা ও গুলশান ২-এও। কিন্তু অনেকেই এদের নিয়ে বের হয় না বলে হোম সার্ভিস দেয়ার জন্য কিছু ভ্যাটেরিনারিয়ান-ও আছে। এরা বাসায় গিয়ে সব ট্রিটমেন্ট করে। নিয়ম হছে কুকুরের ছানা যদি ৭ দিন বা ১ মাসের হয় আর কুকুরের বাচ্চাটির বাবা মার যদি ভ্যাকসিন দেয়া থাকে, তাহলে ৩ মাস পর আরেকটি ভ্যাকসিন দিতে হবে যা কুকুরটিকে বাইরের সব জীবাণু থেকে রক্ষা করবে। এরপর প্রতি ১ বছর পরপর এই ভ্যাকসিন দিতে হবে। আর বছরে ২ বার ৩ মাস পরপর ক্রিমির ভ্যাকসিন দিতে হবে। ভ্যাকসিন না দিতে চাইলে মুখেও খাওয়াতে পারেন। আর যদি এদের কামড়ও লাগে আপনার, তাহলে আপনার কিছুই হবে না এই ভ্যাকসিন-এর জন্য। বছরে ২ বার এদের লোম ট্রিম করতে হয়। গরমের সময় করাই ভালো। নখ, হাত, পা ও তালুর লোমও কেটে দিতে হবে।

ছোট বয়স থেকে যদি ট্রেনিং দেয়া যায় তাহলে তারা লোম-নখ কাটার সময় কিছু করবে না। কিন্তু যদি চঞ্চল হয় তাহলে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে করতে হবে। ভয় নেই এতে, এদেরেও কষ্ট কম হবে আর  দেরও। ছোটো কুকুর ছানা গুলোর দাঁত উঠে ওদের ৩ বা ৪ মাসে, তখন তারা অনেক কিছু কামড়াবে, এ সময় ঘরের জিনিস গুলো একটু সাবধানে রাখতে হবে না হলে আপনার প্রয়োজনীয় অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই সময় নরম কিছু বল বা বাচ্চাদের কামড়ানো সফট খেলনা দিতে পারেন। এছাড়া অস্বাভাবিক কিছু দেখলে ভ্যাটেরিনারিয়ান-এর সাথে যোগাযোগ করুন।

কী খাওয়াবেন

অনেকেই এদের খাওয়া নিয়ে কনফিউজড  হয়ে থাকেন। কিন্তু এদের খাওয়া-দাওয়াতে কোন ভেজাল নাই। ক্যান ফুড থেকে ঘরের খাবার স্বাস্থ্যকর। মুরগী, একটু সবজি, হলুদ আর খুবই সামান্য তেল দিয়ে বয়েল করে ভাত দিয়ে মেখে দিলেই হবে। আলু, কুমড়া ও গাজর বয়েল করে ভাত দিয়ে দিতে পারেন। ডিম সিদ্ধ করে ভাত দিয়ে মেখে দিলেও খাবে। যদি কুকুর ছানাটি ১ মাসের হয়, তাহলে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের দুধ বায়োটিন খাওয়াতে হবে। চাইলে সেরেলাক-ও দেয়া যাবে। সাথে ভাত মেখে ২ বেলা দিতে হবে। ১ বছর পর পরিমাণটা একটু কমাতে হবে। চাইলে ১ বেলা দিতে পারেন, নাহলে পরিমাণ কমিয়ে ২বেলা। সকালে আপনি যা নাস্তা করেন তার থেকে একটু ওদেরকেও খাইয়ে দিবেন।

ট্রেনিং

অ্যাডপ্ট করার পর থেকেই ট্রেনিং শুরু করতে হবে। ওদের একটা নাম ঠিক করবেন। এরপর এই নামে ডাকতে থাকবেন, ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে ওরা এটা এক্সেপ্ট করে নিবে। অ্যাডপ্ট করার পর থেকেই পটি, পি- কোথায় করবে দেখিয়ে দিবেন। একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে দিবেন। খাওয়ার পর সেখানে নিয়ে যাবেন ৭ দিনের মধ্যে ওদের অভ্যাস হয়ে যাবে। এরপর আর কখনোই অন্য কোথাও পটি ও পি আর করবে না। একটা বল নিয়ে ছুরে মারবেন আর বলবেন নিয়ে আসতে। কুকুরদের সেন্স অফ হিউমার অনেক স্ট্রং, আপনি যা ইন্সট্রাকশান দিবেন তাই তারা তাদের ব্রেইন-এ সেট করে নিবে। যেমন, যদি আপনি নরমালি একটা কিছু দিয়ে কোথায় রাখতে হবে দেখিয়ে দেন, ওরা ঠিক করবে । নিত্য সব প্রয়োজনীয় কাজে আপনাকে সাহায্য করবে। এছাড়াও ইউটিউব-এ ট্রেনিং-এর অনেক ভালো ভিডিও আছে, সেগুলো দেখে আপনি সহজেই এদের ট্রেনিং দিতে পারবেন। যদি আপনি এদের বংশ বৃদ্ধি করতে চান, আলাদা একটা প্লেস করে দিতে হবে। বাচ্চা হওয়ার প্রসেস-টা ভ্যাটেরিনারিয়ান থেকে যেনে নেয়াটাই ভালো। সেক্ষেত্রে আপনার স্পেস-ও বড় হতে হবে। ছোট স্পেস-এ হবে না।

শেষে এটাই বলবো এরা আপনার জীবন ও আপনাকে কি করে যে পালটে দিবে, আপনি বুঝতেও পারবেন না। আপনি যদি ফ্রাস্ট্রেশন-এ থাকেন, লোনলি থাকেন- এদের থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড আর কিছু হতে পারে না। কি করে বলছি? কারণ আমারও একটা আদরের কুকুর ছানা আছে। আমার খারাপ মুড-কে মুহূর্তে বদলে দেয় সে। আপনার যদি অনেক রাগ থেকে থাকে, আপনার নিজের অজান্তেই আপনার অশান্ত মনটাকে শান্ত করে দেবে এদের সংস্পর্শ। এদের মায়া-ভালোবাসা লিখে আসলেই বুঝানো কখনই সম্ভব নয়। এদের মতো ভালোবাসা মানুষের পক্ষেও করা সম্ভব না। এরা আপনার কাছে কিছুই চাইবে না, বদলে শুধু আপনাকে ভালোবাসা দিয়েই যাবে। তবে হ্যাঁ, বুঝে শুনে এদের পুষবেন! দেখানোর জন্য বা শখের জন্য নয়।

আশাকরি যারা সত্যি পোষা প্রাণী নেয়ার প্লেন করছেন কিন্তু সংশয়ে ভুগছিলেন, এই ইনফরমেশন-গুলো তাদের সাহায্য করবে। জীব প্রেমে মগ্ন হয়ে ভুলে থাকুন কিছু সময়ের জন্য যান্ত্রিক জীবনটার এলোমেলো সব কষ্টগুলো। ভরিয়ে দিন আপনার জীবনকে এক সত্য ভালোবাসায়।

 

লিখেছেন- শ্রেষ্ঠা