“ভয়গাঁথা” – Shajgoj



“ভয়গাঁথা”


অগাস্ট ১৯, ২০১৮



ভয় লাগে…। ভীষণ ভয় লাগে আজকাল। জীবনের শুরুটা কিন্তু ভয় দিয়ে হয় নি। তখন অবুঝ ছিলাম। তবে এখন কেন এত ভয়? যত বুঝতে শুরু করেছি তত “আশেপাশের মানুষ কি ভাববে?”– নামক ভয়টা আরও যেন জেঁকে বসেছে বুকের ভিতর। এত ভয়ের ভিড়ে আমরা ভুলে যাই আমাদের স্বপ্নকে, আমাদের প্যাশন-কে। কি হতে চাই জীবনে আসলে? কেন হতে চাই? কিছু মানুষের স্বপ্ন কিন্তু বাস্তবায়িত হয়, তারা তাদের প্যাশন-টাকে খুঁজে পায়। আর যাদের স্বপ্ন পূরণ হয় না? তারা কি করে? তাদের গন্তব্য কোথায়? কি পরিণতি তাদের? আবার কেউ এমনও থাকে, যারা জানেই না যে তাদের প্যাশন কি আসলে! বিভিন্ন জায়গায় তারা তাদের প্যাশন-টাকে খোঁজার চেষ্টা করে, যদি পেয়ে যায় এই আশায়। পেলে তো ভাল, আর না পেলে? তখন কি উপায়?

 

ছোটবেলায় দারুণ সব কৌতূহল কাজ করতো। এটা কেন, ওটা কেন, এটা কিভাবে হল, ওটা কি… আরও কত কিছু!! সব যে অজানা ছিল তখন! জানার তাড়া ছিল খুব বেশি, জানতে গিয়ে কোন ভয় বা তাড়া কিন্তু কেউই করি নি আমরা। এভাবে কতশত নতুনত্বের উদ্ভাবন করেছি শৈশবে আমরা, তাই না? তখন হেরে যাওয়ার বা ব্যর্থতার ভয়টার সাথে তো পরিচিতই ছিলাম না। তাই হাজার হাজার স্বপ্ন বুনেছিলাম তখন। হয়ত এখন তার সব অবাস্তব ভেবে হাসি পায়, কিন্তু যদি সত্যিই ভেবে দেখি, সেগুলোর ভিড়ে কিন্তু সমষ্টিগতভাবে বাস্তব একটা স্বপ্ন লুকিয়ে ছিল, আর সেটা হল নিজের মত করে বাঁচার স্বপ্ন যা কিনা পরবর্তীতে এই ভয় নামক আবরণে ঢাকা পড়ে যায়।

যখন স্কুল জীবন শুরু হয়, পড়ালেখার দৌড় আরম্ভ হয়, নতুন পরিবেশ, পরিস্থিতি আর মানুষ আমাদের আশপাশটা ঘিরে ফেলতে থাকে, সেই পরিবর্তন থেকে ভয়ের যাত্রা শুরু হয়। জীবনে প্রথমবারের মত আম্মু-আব্বুর কাছ থেকে কিছু সময় আলাদা থাকার ভয়টা কিন্তু ঐ মুহূর্তটায় খুব বড় একটা ধাক্কার মত লাগে ছোট্ট ঐ মানুষটার মনে… মনটা ওত পেতে থাকে কখন ছুটির ঘণ্টা বাজবে আর বাবা-মায়ের প্রিয় মুখখানি দেখবে বলে! যদিও পরবর্তীতে এই বিশাল পরিবর্তনটা প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।

এরপর শুরু হয় আগে যাওয়ার ভয়। “অমুকের পরীক্ষার ফল এত ভাল, তমুক বৃত্তি পেয়েছে, ও গান-নাচ সবকিছুতে সেরা… ইত্যাদি ইত্যাদি… তো তুমি কেন পারো না?”এই “তুমি কেন পারো না?”– নামক চাপে পড়ে আমরা রোবট হতে শুরু করি। এভাবে করে সবকিছুতে জেতার ভয় আমাদের প্রথম দ্বিধান্বিত হতে শেখায়। কেউ কেউ এতটাই ভয় পেয়ে যায় যে এই প্রতিযোগিতার ভয়টাকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু বানিয়ে চলতে থাকে। অথচ এত ভয়ে আমরা ভুলে যাই নতুন ভাল কিছু শেখার এবং করার ব্যাপারটাকে।

এরপর শুরু হয় ভাল কলেজে ভর্তির ভয়। “যদি ভাল কোন কলেজে ভর্তি হতে না পারি, তবে? তবে যে সব শেষ!”নতুন একটা বিশেষণের সাথে পরিচয়, “ভাগ্য ভাল/ খারাপের ভয়”। আর এটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকুরী পাওয়া, জীবন অতিবাহিত করা সহ একদম মৃত্যু অবদি থাকবে। যে পায় সে ভাগ্যবান/ভাগ্যবতী, আর না পেলে অভাগা/অভাগী।
কলেজ জীবনের শেষটায় সরকারী আর বেসরকারী নামক ভয় জপে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের প্রারম্ভ ঘটে। শুরু হয় গ্রেডের ভয়। সিজিপিএ ভাল রাখতে শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। “আরে তা না হলে ভাল চাকুরী হব না যে! এই বিষয়ে চাকরীর বাজার ভাল, এটা খারাপ, ওটায় টাকা কম”… এ যেন এক পরিপূর্ণ গরুর হাট!

চারটা বছর মাথার ভিতরটা এই ভয়ের যন্ত্রণায় বিষিয়ে অতঃপর সেই বহুপ্রতীক্ষিত চাকরীর ভয়ের শুরু। এখানেও যন্ত্রণার শেষ নেই! লিংক, টাকা, তেল নামক অনেক ধরণের ধাপ আছে এখানে। যাদের আছে, ভাল, বেঁচে গেল। আর যাদের নেই? শুরু হয় হতাশা আর ব্যর্থতার ভয়। আশপাশ থেকে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়ার মত কটুবাক্য অন্তহীন শুনতে শুনতে তারা হতাশা আর ব্যর্থতার ভয়ের চাদর মুড়ে শুয়ে থাকে। মেয়েদের জন্য তো আরেক সমস্যা যুক্ত হয়। কিছু হলে বিয়ে দিয়ে দাও। ব্যস! সব মুশকিল আসান।

দাঁড়ান, একটু চা গিলে আসি, এখানেও তো ভয়! পাছে জিহ্বা যদি পুড়ে যায়! হাহাহা!!

২ মিনিটের চা বিরতির পর আবার লিখতে বসলাম। যাই হোক যেটা বলছিলাম দুনিয়ার যাবতীয় ভয়ের কথা। আচ্ছা, অনেকে আবার “না” বলতে পারে না। সবাইকে “হ্যাঁ” বলে এই ভয়ে, “পাছে বিপরীতে থাকা মানুষটা যদি কষ্ট পায়?!” এভাবে কিন্তু তাদের অনেকেই প্রতারিতও হয়। আর তখন পরিস্থিতি তাকে পাথর করে দেয়, অবিশ্বাস মনে দানা বাঁধে আর অবশেষে “না” বলতে শিখিয়ে দেয়। তখন আবার শুরু হয় “হ্যাঁ” বলার ভয়! কি আজব, তাই না?

ভালবাসার ভয়ের কথা বলতে তো ভুলেই গেছি! ভুল বা ঠিক মানুষ চেনার যে দ্বিধা, তার মারপ্যাঁচে পড়ে শুরু হয় হৃদয় ভাঙ্গার ভয়! ভয় পেতে পেতে অনেকে ভুল পথে আগায়। ঠিক হলে তো খুবই ভাল; আর ভুল হলে… কেউ হয়ে যায় অনুভূতিশুন্য, কেউ হৃদয়ের দরজাটা চিরতরে বন্ধ করে দেয়, কেউবা নতুন করে ভালোবাসা খোঁজা শুরু করে আবার কেউ হয়ত বেছে নেয় আত্মহত্যার নোংরা পথ!!

আবার সংসার আর অফিসের ভয়টাও বাদ দেয়া যায় না কিন্তু! এই দুটো নিদারুণ ভয় অসম্ভব মানসিক চাপ সৃষ্টি করে অনেকের চুল অবদি ঝরিয়ে ফেলে!

আমরা অন্যায় দেখছি, প্রতিবাদ কি সবাই করি? না। কেন? ভয়ে! কোথাও ক্যারিয়ার করার ইচ্ছা, তাতেও ভয়- “পাছে অপমানিত আর বাতিল হয়” এবং এই ভয়ে চেষ্টা করাই ছেড়ে দেয়। সুযোগ নেয়া, স্বপ্ন দেখা- সব হয়ে ওঠে তখন বিলাসিতা!

টাকাটাই কি সব?- কিছুক্ষেত্রে না, কিছুক্ষেত্রে কিন্তু হ্যাঁ! এটাও কিন্তু ভয়।

বেঁচে থাকার ভয়, শারীরিক গঠনজনিত মোটা-চিকনের ভয়, পাওয়া-না পাওয়ার ভয়, হারানোর ভয়, অপমানিত-লাঞ্ছিত-ধর্ষিত হওয়ার ভয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভয়, ব্যর্থতার ভয়, ডিজিটাল-এনালগ ভয়, মৃত্যুর ভয় ভয় পাওয়ার ভয়, ভয় না পাওয়ার ভয়..

ভয়…

ভয়….

ভয়…..

ভয়……

ভয়…………… ব্যস! অনেক হয়েছে! আর পারছি না!

আবার শুরুতে ফিরে আসি। কিছু প্রশ্ন, যা নিজের মনকে করতেও ভয় লাগে!

আমার স্বপ্ন কি?

আবেগটা আমার কিসের জন্য আসলেই কাজ করে?

স্বপ্ন কি আমার সত্যি হবে একদিন?

কখনও কি পারবো আমার আকাশটা ছুঁতে?

কখনও কি পারবো তাতে তারা হয়ে জ্বলতে?

পারবো কি আমি?

মস্তিষ্ক বলছে, “ভয় পাও, ভয় পাও!” কিন্তু বিশ্বাস করুন, মনটা চিৎকার করে বলছে,

“পারবে মেয়ে, তুমি পারবে…।।”

 

লিখেছেন- আনিকা ফওজিয়া

ছবি- ইমেজেসবাজার.কম