ব্রেস্ট ক্যান্সার | লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি – Shajgoj



ব্রেস্ট ক্যান্সার | লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি


অক্টোবর ১১, ২০১৮



বিশ্বে নারীদের ক্যান্সারের মধ্যে ব্রেস্ট বা স্তন ক্যান্সার এক নম্বরে আছে। কিন্তু উন্নত বিশ্বে নিয়মিত স্ক্রিনিং আর সচেতনতার কারণে একদম প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার ধরা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বে শতকরা ৬৫ ভাগ স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। এ কারণে সেখানে ব্রেস্ট ক্যান্সারজনিত মৃত্যু অনেকটা কমে এসেছে। যার ফলে সারা বিশ্বে নারীদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর এক নম্বর কারণ এখন ফুসফুস ক্যান্সার! ব্রেস্ট ক্যান্সার নয়।

কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এর কারণ অনেক দেরীতে ও শেষ পর্যায়ে এসে ক্যান্সার ধরা পড়া। বিগত পাঁচ বছরে আমাদের দেশে ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া ও রোগ শনাক্ত হওয়ার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আমাদের দেশে দেরীতে ও শেষ পর্যায়ে ডায়াগনোসিস হওয়া আর দেরীতে চিকিৎসা নিতে আসার পেছনে অন্যতম কারণ রোগী ও তার পরিবারের এই বিষয়ে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা এবং ব্রেস্ট ক্যান্সারের নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম-এর স্বল্পতা। আমার আগের লেখায় “ব্রেস্ট ক্যান্সার কী এবং কেন?“-তে ব্রেস্ট ক্যান্সার ও এর কারণ সম্পর্কে লিখেছিলাম। এবার ঘরে বসেই আমরা যেন ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয় করতে পারি সেই দিক-নির্দেশনা দিতেই আজকের এই লেখা।

 

লক্ষণসমূহ

  • স্তনে চাকা ও লাম্প বা পিন্ড অনুভব করা যা ব্যথাহীন ও খুব দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে আকারে।
  • স্তনের ত্বকে বিভিন্ন পরিবর্তন যেমন চামড়া কুঁচকে যাওয়া, কমলার খোসার মত ছোট ছোট ছিদ্র দেখা দেয়া, চামড়ায় টোল পড়া, দীর্ঘস্থায়ী ঘা ইত্যাদি।
  • নিপল (বোঁটা) দিয়ে রস নিঃসরণ হওয়া বা রক্তপাত হওয়া।
  • নিপল ও তার আশেপাশের (Areola) কালো অংশা ফুঁসকুড়ি ও চুলকানি হওয়া।
  • স্তনে দীর্ঘদিন ব্যথা অনুভূত হওয়া।
  • স্তনের আকার পরিবর্তন হওয়া।
  • গলার কাছে অথবা বগলে চাকা অনুভব করা।
  • স্তনের বোটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া অথবা বোটা দিয়ে পুঁজ নির্গত হওয়া।

নিজে নিজেই স্তন পরীক্ষা করার পদ্ধতি

২০ বছর বয়স থেকেই প্রত্যেকের উচিত স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে নিজের স্তন পরীক্ষা করা। মাসিক শুরুর ৫-৭ দিন পর এই পরীক্ষা করতে হবে যখন স্তন নরম ও কম ব্যথা থাকে।

  • শুয়ে বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্তনকে চারটি ভাগে ভাগ করে প্রতিটি অংশের অভ্যন্তরে কোন চাকা বা দলার মতো আছে কিনা তা অনুভব করুন।
  • স্তনের আকৃতির বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা দেখুন।
  • সাধারণত দুই স্তনের আকার এক রকম নাও হতে পারে। এটা অস্বাভাবিক নয়। তাই চিন্তার কিছু নেই।
  • নিপল থেকে অকারণে কোন তরল রস বের হয় কিনা তা লক্ষ্য করুন। তবে প্রসব পূর্ববর্তী বা প্রসব পরবর্তী নিঃসরণকে এর সাথে মিলিয়ে ফেলা চলবে না।
  • বগলে কিংবা ঘাড়ে কোন চাকা অনুভব করতে পারছেন কিনা লক্ষ্য করুন।
  • আপনার বাম হাত দিয়ে ডান পাশের ও ডান হাত দিয়ে বাম পাশের স্তন পরীক্ষা করুন।

এই পরীক্ষা করার সময় অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন যাতে আপনার সম্পূর্ণ স্তনটি পরীক্ষা করা হয়। এক্ষেত্রে আপনি নিপল থেকে শুরু করে বৃত্তাকারভাবে বাহিরের দিকে যেতে পারেন অথবা উপর-নিচ করে সম্পূর্ণ স্তন পরীক্ষা করতে পারেন। লক্ষ্য রাখবেন যাতে আপনি সকল টিস্যু (চামড়া থেকে স্তনের নিচের বুকের খাঁচা পর্যন্ত) অনুভব করেছেন। চামড়া ও চামড়ার অল্প নিচের অংশের জন্য অল্প চাপ দিন, স্তনের মাঝের অংশের জন্য মাঝারি চাপ দিন ও স্তনের নিচের অংশ অনুভবের জন্য গভীরভাবে চাপ দিন।

স্তন বা ব্রেস্ট ক্যান্সার নিশ্চিত হওয়ার উপায়

সাধারনত তিনটি উপায়ে ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়।

  • উপরে উল্লেখিত পরীক্ষার মাধ্যমে।
  • ম্যামোগ্রাফি বা স্তনের আল্ট্রাসনোগ্রাম করে।
  • বায়োপসি অথবা এফএনএসি (FNAC) করে।

চিকিৎসা পদ্ধতি

ব্রেস্টে যে কোন ধরনের পিন্ড বা চাকা মানেই যে তা ব্রেস্ট ক্যান্সার তা কিন্তু নয়। তাই চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়ে গেলে সার্জারি প্রথম অপশন।

  • লাম্পেক্টমি (lumpectomy)টিউমার ও তার আশেপাশের কিছু টিস্যু কেটে এই অপারেশন করা হয়। টিউমার আকারে ছোট হলে এই অপারেশন করা হয়ে থাকে।
  • মাস্টেক্টমি (mastectomy): এই অপারেশন-এ সম্পূর্ণ স্তন কেটে ফেলা হয় অথবা স্তন এবং এর নিচের মাংসপেশি, বগলের লসিকাগ্রন্থিসহ আনুসঙ্গিক আক্রান্ত টিস্যু কেটে ফেলা হয়। সাধারণত এখন আর তেমন করা হয় না। কোন কোন রোগীর স্তনের চামড়া সংরক্ষণ করে বিকল্পভাবে স্তন পূণর্গঠন করা হয়।
  • রেডিও থেরাপি: এই ক্ষেত্রে সাধারণত একটি বড় মেশিন-এর সাহায্যে শরীরের দিকে লক্ষ্য করে তেজস্ক্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করে ক্যান্সারের কোষ নির্মূল করা হয়। তাছাড়া শরীরের ভেতরে তেজস্ক্রিয় পদার্থ স্থাপন করেও চিকিৎসা করা যায়।
  • কেমোথেরাপি: যদি টিউমার বেশি বড় হয় সেক্ষেত্রে সার্জারি-এর পূর্বে কেমোথেরাপি প্রয়োগ করে টিউমার-এর সাইজ ছোট করার চেষ্টা করা হয়। কেমোথেরাপি ক্যান্সার কোষকে ধ্বংসকারী ওষুধ হিসেবে কাজ করে। যদি ক্যান্সার পুনরায় হওয়ার এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার কোন আশঙ্কা থাকে তখন চিকিৎসক কেমোথেরাপি-এর পরামর্শ দিতে পারেন। যা ক্যান্সার পুনরায় হওয়ার আশঙ্কা দূর করে।

ব্রেস্ট ক্যান্সার ৯৯.৫% ক্ষেত্রে মহিলাদের হয় বটে, বাকি রইল ০.৫%। যত ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগী আছে তার মধ্যে ০.৫% পুরুষ। অনেক পুরুষের একটি বা দুইটি ব্রেস্ট স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হতে পারে। এমন হলে ভালো সার্জারি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যার নাম গাইনাকোম্যাসিয়া। তবে সকল ক্ষেত্রেই চিকিৎসার পর নিয়মিত নির্দিষ্ট সময় পর পর ফলোআপ করতে হয়।

তো জেনে নেয়া গেলো  স্তন ক্যান্সার ও এ ব্যাপারে যাবতীয় তথ্যাদি। আশা করছি আমরা নারীরা নিজেরা সচেতন হবো এবং অন্য সবাইকেও সচেতন করবো। কারণ একটু সচেতনতা ও সতর্কতাই পারে নারীদের নিরাপদ রাখতে। পারে অকাল মৃত্যু ঠেকাতে।

 

লিখেছেন- ডাঃ মারুফা আক্তার

ছবি- টুইটার.কম