মাইক্রোওয়েভ-এ রান্না করা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না খারাপ? (পর্ব-২) – Shajgoj



মাইক্রোওয়েভ-এ রান্না করা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না খারাপ? (পর্ব-২)


সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৮



গত পর্বে মাইক্রো ওভেন সম্পর্কিত কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বলেছিলাম। কিন্তু এসব ছাড়াও আরও কিছু অত্যন্ত জরুরী তথ্য আছে যেগুলো জানেন না অনেকেই। যেমন, বেশীরভাগ ব্যবহারকারীরই জানা নেই মাইক্রো ওভেন-এর সঠিক ব্যবহার! ঠিকভাবে ব্যবহার করতে না জানলে মাইক্রো ওভেন আপনার খাবারের সকল পুষ্টিগুণ যেমন শেষ করে দিতে পারে, অন্যদিকে ক্যান্সারের মতন ভয়ানক ব্যাধির সৃষ্টিও হতে পারে।

তাই মাইক্রো ওভেন ব্যবহার করার কয়েকটি সহজ পদ্ধতি মেনে চললেই আমরা অনেক রকম শারীরিক সমস্যার হাত থেকে রেহাই পেতে পারি।  মাইক্রোওয়েভ ওভেনের উচ্চ তাপমাত্রা বিকিরণের ফলে খাদ্যের বিভিন্ন পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। একান্তই যদি মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ খাবার গরম করতে হয় বা রান্না হয় তাহলে মাইক্রো ওভেন সেফ অর্থাৎ যেসব বাসনপত্র  মাইক্রো ওভেন-এর পক্ষে উপযোগী তেমন জিনিস যেমন কাচের পাত্র বা সিরামিকের পাত্রতেই গরম করা উচিত। মাইক্রো ওভেন-এ প্লাস্টিকের বাটিতে খাবার গরম ও রান্না করলে তা শরীরের পক্ষে মারাত্মক প্রমাণিত হতে পারে।

তাই যারা অনেক পরিমাণে মাইক্রো ওভেন-এর রান্নাবান্না খান তাদের প্রচুর তাজা শাক-সবজি খেতে হবে এবং সপ্তাহে দুবার কী তিনবার মাইক্রো ওভেন ব্যবহার করলে এর কুপ্রভাব অনেকটাই কম হয়।

 

মাইক্রো ওভেন-এ যে ৮ টি উপাদান রান্না বা গরম করার কাজে ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ, আজ সেগুলো চিনে নিই চলুন।

ফলমূল

যে কোনো ফলই মাইক্রো ওভেন-এ দিলে সেটা স্বাদ-গন্ধ-পুষ্টি হারিয়ে ফেলবে। কেবল তাই নয়, আঙ্গুর জাতীয় ফল বিস্ফোরিত হবে এবং কিসমিস-খেজুরের মতো শুকনো ফল পুড়ে গিয়ে ধোঁয়া তৈরি করবে।

অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল

সাধারণ গ্যাস বা ইলেকট্রিক ওভেন-এ অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ব্যবহার করে রান্না করা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মাইক্রো অয়েভ-এ এই জিনিস বিপজ্জনক। ধাতব কোনো পাত্র বা জিনিস মাইক্রো ওভেন-এ ব্যবহার করা যায় না। কারণ ধাতু মাইক্রো ওভেন প্রতিফলিত করে। ফলে খাবার তো গরম হবেই না, উল্টো আগুন লাগার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যায়।

প্লাস্টিকের পণ্য

দামে খুব সস্তা বলে দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশে। জেনে রাখুন, মাইক্রো ওভেন-এ প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ। এমনকি তাতে “মাইক্রোয়েভ সেফ” লেখা থাকলেও। প্লাস্টিক গরম হয়ে গেলে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান খাবারে মিশে যায় ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে।

ডিম

মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ ডিম সেদ্ধ করতে যাওয়াটা হবে বোকামি। কারণ ডিমটি গরম হয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ বিস্ফোরিত হবে। যদি একান্তই ডিম সেদ্ধ করতে হয়, তাহলে ডিমের অপেক্ষাকৃত সরু অংশে ফুটো করুন, তারপর পানির মাঝে ডুবিয়ে ওভেন-এ দিন। ফুটো ঠিকমতো না হলে কিন্তু ডিমের মাঝে বাষ্প বের হতে পারবে না। এতে ডিমটি বিস্ফোরিত হবে।

হিমায়িত মাছ, মাংস

তাড়াতাড়ি রান্না করার জন্য হিমায়িত মাছ, মাংস মশলা মেখে মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ দিয়ে দেন অনেকে। এই কাজটি করাও উচিত না। মাছ, মাংস একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রান্না করতে হয়, তা না হলে রোগ-জীবাণু থাকার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। হিমায়িত অবস্থায় মাছ, মাংস ওভেন-এ দিলে ভেতর পর্যন্ত সেই নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছায় না। ফলে রয়ে যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি।

পুরানো বাসনকোসন

সাধারণত নানী-দাদী কিংবা মায়ের আমলের স্মৃতিময় কিছু তৈজসপত্র বাড়িতে থাকে। এগুলো মাইক্রো ওভেন-এ দিতে যাবেন না। কারণ এ সব পণ্য মাইক্রোওয়েভ ওভেনপ্রুফ নয়। অহেতুক ফেটে গিয়ে নষ্ট হবে শখের জিনিসটি।

কাগজের প্যাকেট, রেস্তোরাঁর খাবারের বাক্স

এগুলো তৈরি হয় অত্যন্ত নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে, মাত্র একবার ব্যবহারের জন্য। কাগজের ব্যাগ বা রেস্তোরাঁর নানা রকমের খাবারের বাক্স অনেকেই মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ সরাসরি দিয়ে থাকেন। এই কাজটিও ঠিক না। এ সব নিম্নমানের প্যাকেট বা বাক্সগুলো গরম হলেই ক্ষতিকর রাসায়নিক পণ্যে খাবারে মিশে যাবে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করে। সময়ও বাঁচায়। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে বুঝেশুনে। স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কোনো অবহেলা নয়।

ব্রকোলি

ইন্টারনেট-এ স্পেনের এক গবেষণার খবর ছড়িয়ে পড়ছে, যাতে দাবি করা হয়েছে যে মাইক্রোওয়েভে ব্রকোলির ফাইটোকেমিক্যাল প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফল মারাত্মক হতে পারে। উটে গম বলেন, ”ফাইটোকেমিক্যাল ক্যানসার থেকে শরীরকে রক্ষা করে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাই স্বাভাবিক কারণেই খাবারের মধ্যে তাকে অক্ষত রাখার চেষ্টা হয়। তাজা ফল বা শাক-সবজির মধ্যে ফাইটোকেমিক্যাল ও রং থাকে।”

*সাবধানতা-

  • খাবারের মধ্যে থাকা ভিটামিন বি-১২ নষ্ট করে দেয় মাইক্রোওয়েভ। বিশেষত গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এই খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।
  • মাইক্রোওয়েভে খাবার রান্না করলে তাতে রাসায়নিক রশ্মি প্রবেশ করে, ফলে এতে বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হওয়ার প্রবণতা থাকে বেশি।
  • মাইক্রোওয়েভে খাবারের অনু-পরমাণুর বিন্যাসকে ওলোটপালট করে দেয়। যা শিশুদের পক্ষে মারাত্মক হতে পারে।
  • মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে খাবারে নন-আয়োনাইজিং রশ্মি প্রবেশ করে। এতে কার্সিনোজেনিক উপাদান তৈরি হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
  • মাইক্রোওয়েভ ২.৪ গিগা হার্জ রেডিয়েশন তৈরি করতে পারে। যা রক্তচাপ বাড়ায়। পাশাপাশি হৃদস্পন্দনও বাড়িয়ে দেয়।
  • খাবারের মধ্যে যে তরল অংশ থাকে তা আমাদের শরীর হাইড্রেট করতে সাহায্য করে। কিন্তু মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ রান্না করলে খাবারের মধ্যের জল অনেকটাই শুকিয়ে যায়।
  • ধাতব কিছু যেমন- চামচ, স্টেইনলেস স্টিলের তৈজস- এগুলো মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ রাখবেন না। এতে গরম হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
  • খালি মাইক্রোওয়েভ ওভেন কখনো চালু করবেন না।
  • খাবার অতিরিক্ত গরম করাও অনুচিত। এতে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • শুকনা মরিচ কখনো মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করবেন না। এতে মরিচ পুড়ে ধোঁয়া নির্গত হতে পারে।
  • মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করতে দিয়ে সতর্ক থাকুন। কারণ হঠাৎ বেশি গরম হয়ে ছিটকে ওভেন নষ্ট হতে পারে।
  • ওভেন সবসময় কাঠের টেবিলের উপর রাখবেন। তবে টেবিল যেন বেশি উঁচু না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি।
  • পাত্রে অতিরিক্ত খাবার নেবেন না। সবসময় খাদ্যদ্রব্য ঢেকে দিবেন।
  • খাদ্যের ধরন অনুযায়ী গরম করার জন্য সময় নির্ধারণ করুন। স্ট্যান্ডিং টাইম-এর পরও রান্না না হলে আবার অল্প সময়ের জন্য দিন ওভেন। তবে প্রথমে কম সময় নির্ধারণ করে দেওয়াই ভালো।
  • ওভেন-এ রান্না করতে বেশি তেল লাগে না। তাই ডুবোতেলে কিছু রান্না করতে যাবেন না। এতে বিরাট দুর্ঘটনা ঘোটতে পারে।
    গরম অবস্থায় কখনো খালি হাত ঢোকাবেন না। গরম পাত্র ধরতে মোটা ও ভারী গ্লাভস ব্যবহার করুন। কাজ শেষ হলে ওভেনের বৈদ্যুতিক সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলুন।
  • হাই পাওয়ার সেটিং ব্যবহার করবেন না।

*মাইক্রোওয়েভ ওভেন পরিষ্কার করার টিপস-

১) মাইক্রোওয়েভ ওভেন পরিষ্কার রাখার খুব সহজ উপায় অনেকটা এ রকম। একটি ছোট কাঁচের বাটিতে পানির সাথে লেবুর রস মিশিয়ে নিয়ে ৭৫০ ওয়াটে পাঁচ মিনিট চালিয়ে রাখুন। তারপর একটি অল্প ভেজা কাপড় দিয়ে ভালো করে মুছে ফেলুন। দেখবেন মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ ভেতরটা কী সুন্দর ঝকঝক করছে। এমনকি খাবারের কোনো গন্ধ বা মসলার দাগও যাবে উধাও হয়ে।

২) প্রতিবার ব্যবহারের পর ওভেন-এর ভেতরটা পরিষ্কার করতে হবে। না হলে দুর্গন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে অবশ্যই ঠাণ্ডা হওয়ার পর পরিষ্কার করবেন। মাঝে মধ্যে ওভেনের গ্রিল-গুলো বের করে পাতলা কাপড় দিয়ে মুছে রাখুন।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এ রান্না করার প্রক্রিয়াকে রন্ধনশিল্পে মোটেই কদর করা হয় না। রান্নার বদলে শুধু খাবার গরম করার ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ভালো ও সহজ প্রক্রিয়া বটে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, যে ছোট সংসারে মাইক্রোওয়েভ ওভেন-এর ব্যবহার মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু আদর্শ স্বাদ পেতে হলে ঠান্ডা খাবার খাওয়াই ভালো।

 

লিখেছেন- নিকিতা বাড়ৈ

ছবি- পিন্টারেস্ট.কম

 

মাইক্রোওয়েভ ওভেন: কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় (পর্ব-১)