যৌনবাহিত রোগ কী, জানেন?


নারী-পুরষের মাঝের জৈবিক সম্পর্ক একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে এ সম্পর্ক যদি অনিরাপদ হয় তবে তা হতে পারে আত্নঘাতী। একদিকে যেমন তা অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের কারণ তেমনি তা হতে পারে ভয়ংকর কিছু অসুখের কারণ যেগুলোকে আমরা সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ বা সংক্ষেপে এস.টি.ডি. বলি। কাজেই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই জরুরী।

এস.টি.ডি. মূলত বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশাস ডিজিজ যা অনিরাপদ শারীরিক সংসর্গের ফলে একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায়। এস.টি.ডি. এর বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে যার মাঝে কিছু প্রচলিত বা পরিচিত নাম হচ্ছে-

  • জেনিটাল হারপিস
  • গনোরিয়া
  • সিফিলিস
  • ক্ল্যামাইডিয়া
  • এইচ.আই.ভি./এইডস
  • এইচ.পি.ভি.
  • হেপাটাইটিস বি/সি

এইচ.আই.ভি. এবং এইডস

নামটির সাথে কমবেশি অনেকেই পরিচিত। এইচ.আই.ভি. মূলত একটি ভাইরাস (হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস) আর এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার পর অসুখের লাস্ট স্টেইজ-এর নামই এইডস (অ্যাকোয়ারড ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি সিন্ড্রোম)। এইচ.আই.ভি. দ্বারা আক্রান্ত হবার দীর্ঘ সময় পর সাধারণত তা এইডস-এর রূপ নেয়। তবে একবার যদি আপনি এইচ.আই.ভি. দ্বারা আক্রান্ত হন তবে এই ভাইরাস আজীবনের জন্য আপনার দেহে রয়ে যায় এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলতে থাকে। ফলে সহজেই যক্ষা, ফাংগাল ইনফেকশন এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বহুগুণে  বেড়ে যায়।

সিফিলিস

শারীরিক সম্পর্ক থেকে ছড়াতে পারে এমন আরেকটি ছোঁয়াচে রোগ হচ্ছে সিফিলিস। এটি মূলত একটি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন যা সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে টারশিয়ারি সিফিলিসের রূপ নিতে পারে।

  • বাতের সমস্যা, ব্রেইন ড্যামেজ, অন্ধত্ব  এমনকি স্ট্রোক এবং হৃদরোগেরও কারণ হতে পারে।
  • গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে সিফিলিস রক্তের মাধ্যমে অনাগত সন্তানের মারাত্মক স্বাস্থ্যহানি এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

গনোরিয়া

সিফিলিস-এর মতই আরেকটি ব্যাকটেরিয়াজনিত এস.টি.ডি. হচ্ছে গনোরিয়া যা অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে অন্যের দেহে ছড়ায় এবং নারীদেহে তা অনাগত শিশুর অন্ধত্বের জন্যও দায়ী হতে পারে। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে প্রায় এক দশমাংশ পুরুষ এবং প্রায় ৫০ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রেই এই অসুখের কোন উপসর্গ প্রাথমিক স্টেইজ-এ ধরা পড়ে না। তাই সবসময় প্রোটেকশন গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী।

এইচ.পি.ভি.

ইউটেরাস বা জরায়ু ক্যানসার যা ব্রেস্ট ক্যান্সার-এর পরই সারাবিশ্বে নারীর সবচেয়ে কমন ক্যান্সার, এর জন্য দায়ী এইচ.পি.ভি. বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ছড়ানোর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিও কিন্তু অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক। জরায়ু ক্যান্সারের পাশাপাশি গলা, পায়ুপথ ইত্যাদির ক্যান্সারের জন্যও দায়ী এই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস।

হেপাটাইটিস বি

হেপাটাইটিস বি নামটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। এর ভয়াবহ পরিণতি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর এবং ক্যান্সারের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ৬ লাখেরও বেশি মানুষ  মারা যায়।

কেন সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ এতটা ভয়ংকর?

এস.টি.ডি. শুধু যে আপনার ক্ষতি করতে পারে তা নয়, বরং তা আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্কে থাকা মানুষটির জন্যও সমানভাবে ক্ষতিকর।

কারণ এ অসুখগুলো জৈবরস, যেমন – সিমেন বা ভ্যাজাইনাল ফ্লুইড-এর মাধ্যমে ছড়াতে পারে। সিফিলিস-এর ক্ষেত্রে প্রাইমারি স্টেইজ-এ থাকা অবস্থাতেই এক ধরনের আলসার তৈরি হয় যার সরাসরি সংস্পর্শে এলেই তা দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এস.টি.ডি. মূলত আপনার আশপাশের সবার জন্যই ক্ষতিকর কেননা এস.টি.ডি.-তে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণের ফলে তা ছড়াতে পারে, পাশাপাশি তা ইনফেক্টেড স্কিন-এর সংস্পর্শে এসে (যেমন সিফিলিস বা স্ক্যাবিস-এর মত অসুখে) আপনার পরিবারের যেকোন সদস্যের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি হল যে এস.টি.ডি. আপনার অনাগত সন্তানকেও রেহাই দেয় না। বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যেমন- মস্তিষ্ক, চোখ, হাড় ইত্যাদির ভয়াবহ ইনফেকশন এমনকি আপনার শিশুর ভ্রূণাবস্থায় বা জন্মের পর মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

প্রতিরোধে করণীয়-

অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কে না জড়ানো এ অসুখগুলো থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই প্রতিবার সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বে অবশ্যই কনডম ব্যবহার করতে হবে। এটি আপনাকে ইনফেকশন-এর সংস্পর্শে আসতে বাধা দেবে এবং ক্ষতিকারক  অরগ্যানিজম-গুলো আপনার দেহে ঢুকতে দেবে না।

মনে রাখা জরুরি যে, এস.টি.ডি.-এর উপস্থিতি কিন্তু খালি চোখে বোঝা প্রায় অসম্ভব এবং অনেকসময়ই তা নীরব ঘাতক সেজে আপনার পার্টনার-এর দেহে উপস্থিত থাকতে পারে, যা আপনার অজান্তেই আপনার দেহেও বাসা বাধতে পারে।

হতে পারে আপনি আপনার  ভালোবাসার মানুষটিকে বিশ্বাস করেন। তবে মনে রাখা জরুরী, যেকোনো ইনফেক্টেড ব্যক্তির রক্তগ্রহণের মাধ্যমে, এমনকি ইনফেক্টেড ব্যক্তির ব্যবহৃত ক্ষুর/ব্লেড দিয়ে কোথাও কেটে গেলেও কিন্তু এই ইনফেকশন আপনার পার্টনারের দেহে বাসা বাঁধতে পারে। এমতাবস্থায় কনডম ব্যবহার না করার ফলে তা আপনার ও আপনার শিশুর জন্য মরণঘাতী হতে পারে। কাজেই সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে নিয়মিত কনডম ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলুন। পাশাপাশি রক্তগ্রহণের পূর্বে রক্তদাতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং ক্ষুর-ব্লেড ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা খুবই জরুরি। সাবধান হোন এবং নিজেকে ও আপন মানুষগুলোকে নিরাপদ রাখুন।

 

লিখেছেন- ডাঃ তাসনিম তামান্না হক, চিফ কনসালটেন্ট, স্কিনেজ ডারমাকেয়ার