চুলের যত্ন, সৌন্দর্য পরামর্শ

চুলের সমস্যা দূরীকরণে মেথির ব্যবহার

আদিকাল থেকেই মানুষের চুল নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। চুল নিয়ে বিব্রত থাকতে হয়েছে অনেককে অনেক সময়। কি করে চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা যায়, চুলের সুন্দর আকার দেওয়া যায়- এসব ভাবনা কিন্তু সবসময়ই ছিল। সুমেরু সভ্যতার ললনারা বিশেষ করে উচ্চ সম্প্রদায়ের সুন্দরীগণের কাছে বড় চুলই ছিল সৌন্দর্যের প্রতীক। তারা চুলে স্বর্ণরেণু ব্যবহার করতেন, নাম না জানা হলুদ সুগন্ধীও চুলে মাখতেন। এছাড়াও মেহেদী ব্যবহারে চুল কাঁচা করে বয়স ঢেকে রাখার চেষ্টা সব দেশেই ছিল। রোম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতকালে যেসব যুদ্ব বন্দিনীর চুলের রং ছিল স্বর্ণালী তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হত। পরে লোহার আঁকশিতে চুলকে কিছুদিন জড়িয়ে রাখার পর যখন চুল জট পাকিয়ে কোঁকড়া মত হত তখন তা এক ধরণের হলুদ সাবান(সম্ভবত মেহেদী) দিয়ে কাঁচা করা হত। এরপর এই সোনালী পরচুলা পরে স্ত্রীরা স্বামীদের কাছে নিজেদের আকষর্ণীয় করে তুলতো।

মুসলিম বিশ্বে বেশ আড়ম্বর সহকারেই কেশচর্চা করা হত। ধনী আরব বণিকরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে খুশবু সংগ্রহ করত। গোসলের চৌবাচ্চায় সেসব খুশবু ঢেলে মরু সুন্দরী তাতার ললনাগণ দিনশেষে সেই পানিতে  গোসল করতো।

বাঙালীদের কেশচর্চার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নানা কৌশলে সুবিন্যস্ত কেশই ছিল তাদের শিরোভূষণ। এমনকি পুরুষরাও লম্বা বাবরীর ন্যায় চুল রাখতেন।

চুল আভিজাত্য, সামাজিক অবস্থান ও সৌখিনতার প্রতীক। রমনীর কেশ বাঙালীর এক অবসেশন। কিশোরীর বুকে আছড়ে পড়া বিনুনী দেখতে কার না ভাল লাগে। কিন্তু সেই বিনুনী বাঁধার কৌশল জানা দরকার। দরকার চুলের সেই ঢল। তার উপর রয়েছে চুলের নানা রকম সমস্যা যেমন চুল পড়া, খুশকী, চুলের অকালপক্কতা, মাথার ছত্রাক সমস্যা এবং আরো অনেক। সঠিকভাবে চুলের প্রকার ও সমস্যা চিহ্নিত করে উপযুক্ত সমাধান বেছে নিতে পারলে এই সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

 

১. চুল পড়া সমস্যা

চুল পড়া সত্যিই একটি বিব্রতকর সমস্যা। বহুবিধ কারণেই চুল পড়তে পারে তবে দৈনিক গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত  চুল পড়াকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে বেশী করে চুল পড়া শুরু করলে তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এর জন্য চিন্তার ভারটা মেথির উপর ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। চুল পড়া সমস্যায় মেথির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকরী।

৫০ গ্রাম মেথি ২০০-৩০০ মিলি পানিতে সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই পানিটুকু ছেঁকে নিন। এ থেকে এক গ্লাস পানি খালি পেটে পান করুন। মেথিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও নিকোটিনিক এসিড রয়েছে যা চুলকে ভেতর থেকে পুষ্টি যোগায় এবং চুলকে মজবুত করে। এই পানি প্রতিদিন পান করলে পেটের যাবতীয় পীড়াজনিত ও পরিপাকজনিত সমস্যা দূর হয়। দেহের অতিরিক্ত ওজন ও কমে। বাকী পানিটুকু একটি স্প্রে বোতলে নিয়ে নিন। এবার মাথার ত্বকে এবং চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত এই পানি স্প্রে করুন। এবার আঙুলের ডগার সাহায্যে সারা মাথা ৭-১০ মিনিট ম্যাসাজ করুন। ১ ঘন্টা অপেক্ষা করে চুল ধুয়ে ফেলুন। চাইলে সারারাত এটা মাথায় রাখা যেতে পারে। চুল পড়া কমাতে এবং চুলের ভিত্তিকে মজবুত করতে এর জুড়ি নেই।

২. চুলের খুশকি দূর করতে

খুশকি চুলের অন্যতম প্রধান সমস্যা যা সাধারণত বয়:সন্ধিকালের পূর্বে দেখা যায় না। খুশকি হলে মোটামুটি সবাই লক্ষণ দেখে সহজেই বুঝতে পারে যে মাথায় খুশকি হয়েছে। একটু সচেতনতা ও যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে সহজেই খুশকিকে দমন রাখা যায় এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিস্কৃতি লাভ করা যায়। ২-৩ চা চামচ মেথি ১ কাপ পানিতে ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এবার মেথিসহ কিছুটা পানি ব্লেন্ড করে পেস্ট করে নিন। এতে ২-৩ চা চামচ টক দই যোগ করুন। এবার এই প্যাকটি মাথার ত্বকে ভালভাবে লাগিয়ে নিন। ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করে তারপর   শ্যাম্পু করে ফেলুন। খুব বেশী খুশকি সমস্যা হলে সপ্তাহে অন্তত ১ দিন আর কম হলে ১৫ দিনে একবার এই প্যাকটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

খুশকি সাধারণত শুষ্ক ত্বক এবং ছত্রাক সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। মেথি মাথার পুষ্টি যোগায় এবং ছত্রাক সংক্রমণ রোধ করে।

৩. চুলের অকালপক্কতা রোধে

চুল পাকা নিয়ে অনেকেই হতাশায় ভোগেন।  বিশেষ করে অল্প বয়সেই যাদের চুল পাকা শুরু হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অপুষ্টি ও অযত্নের জন্যও চুলে অকালপক্কতা দেখা দিতে পারে।  শরীরে আয়োডিন ও ভিটামিনের অভাবে চুলের যে স্তরে রঙের কোষ তৈরী হয়, সেই স্তরের রংকোষ তৈরী বন্ধ হয়ে যায় এবং চুল সাদা হতে শুরু করে।অনেক সময় তীব্র মানসিক আঘাতে, জটিল অসুখেও কম বয়সে চুল সাদা হয়ে যেতে পারে। নারিকেল তেলে কমপক্ষে ২দিন মেথি ডুবিয়ে রাখুন।  এবার এই তেল কুসুম গরম করে মাথায় ত্বকে ম্যাসাজ করুন।  চুলের ফলিকলের যেকোন সমস্যা সমাধানে এই তেল যাদুর মতো কাজ করে।  এটি চুলে টনিকের মতো কাজ করে চুলের হারানো রঙ ফিরিয়ে আনে।  চুলকে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত পুষ্টি যুগিয়ে চুলের অকালপক্কতারোধে এটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। এটি চুলের বৃদ্ধিতেও সমানভাবে কাজ করে।

৪. চুলের বৃদ্ধি এবং নতুন চুল গজাতে

মেথিতে প্রচুর পরিমাণে লেসিথিন রয়েছে যা চুলের গোড়ায় পুষ্টি যোগায় এবং চুলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।  ১ টেবিল চামচ মেথি এবং ১ চা চামচ সরিষা দানা পাউডার করে নিন।  ২-৩ টেবিল চামচ কুসুম গরম পানিতে এই পাউডার ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এতে ১ চা চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে মিহি পেস্ট তৈরী করুন। এবার এই পেস্ট ভালভাবে মাথায় ত্বকে লাগিয়ে ম্যাসাজ করুন।১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার শ্যাম্পু করে চুল ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি মাসে একবার ব্যবহার করা যেতে পারে।  নিয়মিত ব্যবহারে চুলের ড্যামেজ দূর হয়। সরিষাতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-এ রয়েছে যা চুলের দ্রুত বৃদ্ধিতে উদ্দীপকের কাজ করে। এই প্যাকটি নতুন চুল গজাতে খুবই কার্যকরী।  মেথি মাথার ত্বককে ঠান্ডা রাখতেও বিশেষভাবে উপযোগী।

৫. ময়েশ্চারাইজার ও কন্ডিশনার হিসেবে

৩ টেবিল চামচ মেথি ১ কাপ পানিতে সারারাত ভিজিয়ে সকালে পানিটুকু ছেঁকে নিন। চুল শ্যাম্পু করার পর এই পানিটুকু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। মেথির এরুপ ব্যবহার চুলকে কন্ডিশন করে এবং চুলে ময়েশ্চারাইজিং-এর কাজ করে। এটি চুলকে নরম এবং ম্যানেজেবল করে চুলকে সিল্কি এবং চকচকে করে তুলতেও সাহায্য করে।

এভাবেই মেথি চুলকে সমস্যামুক্ত রাখতে যুগের পর যুগ রেখে চলেছে স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা। তাই চুল থাকুক সুন্দর, মসৃণ ও নমনীয়।

 

লিখেছেন- শারমিন আক্তার

Comments

comments

Recommended