চুলের যত্ন, সম্পাদকের পছন্দ, সৌন্দর্য পরামর্শ

চুল ভাঙা ও ছিঁড়ে যাওয়ার কারণ এবং সমাধান

রিথিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই খেয়াল করছে, তার চুল আঁচড়ানোর সময় চুল পড়ার থেকে চুল ভেঙে এবং ছিঁড়ে আসছে বেশী। এছাড়া বাইরে খোলা চুলে গেলে, যখন বাসায় ফিরে আসে তখন চুলগুলো পাটের আঁশের মত হয়ে যায়। আর চিরুনি চালাতে গেলেই অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সে কেবল ভাবছিল কি করলে চুল ভাঙা রোধ করা যাবে। কয়েকটা হেয়ার প্যাকও ট্রাই করে ফেলল। কিন্তু কাজে দিল না।

কারণ খুঁজতে খুঁজতে অনেক পরে বেরিয়ে এল যে, সে প্রচুর শ্যাম্পু করে কিন্তু কন্ডিশনার লাগাতে একদমই গাফেলতি করে।

হ্যা, বলছিলাম রিথিয়ার গল্প। আসলেই আমরা বেশীরভাগ মানুষ সমস্যা সমাধানের পথটা আগে খুঁজি কারণ না জেনেই। যার ফলে সমাধানটাও সহজে মেলে না।

তো চলুন, আজ প্রথমে চুল ভাঙ্গা এবং ছিঁড়ে যাওয়ার কিছু কারণ জেনে নেই। তারপরেই না হয় সমাধানে আসি।

 

১. চুলে অপ্টিমাল হাইড্রেশন-এর অভাব পড়লেই চুল দূর্বল হয়ে ভেঙে যায়। এজন্য প্রথমেই দরকার চুলের জন্যে একরাশ ভালোবাসা। কারণ, প্রপার কেয়ার-এর মাধ্যমেই সুন্দর এবং হেলদি চুল পাওয়া সম্ভব। আর এজন্য বেসিক হেয়ার কেয়ার রুটিন কিন্তু একদম ঠিকঠাকভাবে মেনে চলা উচিত। চুলের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে। এই কমন কথা বার বার বলতে হয়। কারণ, কমন ব্যাপারগুলোই  অনেকে ভুলে যান। শ্যাম্পু লাগালেন তো, কন্ডিশনার লাগালেন না!!!

২. চুল ভাঙার আরেকটি কমন কারণ হল হার্ড ওয়াটার। পানির কারণে অনেকেরই চুল পড়া এবং ভেঙে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। কারণ, হার্ড ওয়াটার-এ ক্লোরিন এবং হেভি মেটাল থাকার ফলে তা চুলের কিউটিকল ড্যামেজ করে দেয়। ফলাফল- চুল ভাঙা।

এক্ষেত্রে ‘শাওয়ার হেড ফিল্টার’ আপনার একমাত্র বন্ধু হতে পারে। এটি পানি থেকে ক্ষতিকারক মেটাল ফিল্টার করে দেয়।

৩. চুলে স্টাইল করতে কে না পছন্দ করে। চুল স্ট্রেইট, কার্ল, পার্ম ইত্যাদি করতে চুলে প্রচুর হিট দেয়া হয়। যা চুলের স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। এর ফলে প্রচুর চুল ভাঙা শুরু হয়।
তাই চুলে যতটা সম্ভব হিট কম ব্যবহার করুন। একান্তই যদি প্রয়োজন পরে তবে, অবশ্যই প্রথমে হিট প্রোটেক্টর স্প্রে চুলে লাগিয়ে নিন। এতে করে হিটের ক্ষতি থেকে চুল বেঁচে যাবে।

৪. আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, গোসলের পর চুলের পানি ঝরাতে টাওয়াল দিয়ে ইচ্ছা মত চুল ঘষতে থাকেন। এই ইচ্ছা মতন ঘষার ফলে যে চুলটা নষ্ট করে ফেলছেন, তা জানেন কি? চুল ভাঙার পেছনে এটাও একটা কারণ। সবসময় আলতো করে চেপে চুলের পানি শুষে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। টাওয়েলের পরিবর্তে পুরোনো টি শার্ট ব্যবহার করতে পারেন এক্ষেত্রে । আর হেয়ার ড্রায়ার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা যায় ততই ভালো।

৫. চুল আঁচড়ানোর  পদ্ধতিটা কি আপনার? চুল সুন্দর, জটহীন রাখতে চুল আঁচড়ানো বা কোম্ব করাকে আমরা সবথেকে গুরুত্ব দেই। অনেকেই বলে থাকেন, চুল আঁচড়াতে গেলেই খুব চুল ভেঙে যায় । এর কারণ আছে। আপনি নিশ্চই চুল গোড়ার দিক থেকে আঁচড়ানো শুরু করেন। যার ফলে, উপর থেকে জটাগুলো চুলের আগা পর্যন্ত যেতে থাকে। আর শেষমেশ, নিচের সব জটাগুলো একসাথে ছাড়িয়ে নিতে গিয়েই বাঁধে বিপত্তি। চুল ভাঙতে এবং ছিঁড়তে থাকে। এজন্যে, চুল সব সময় আগার দিক থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে আঁচড়ে উপরের দিকে উঠতে হবে। এতে খুব বেশী জটা জমা হবে না এবং চুলও ভাঙবে/ছিঁড়বে কম।

৬. চুলের স্টাইল মানেই চুলে টিজ করে চুলটা একটু ফোলানো।দেখতে সুন্দরই লাগে। কিন্তু মানেন আর না মানেন, টিজ করা চুল দেখতে সুন্দর লাগলেও যখন টিজ করা চুলগুলো খুলতে যাবেন তখন কিন্তু প্রচুর চুল ছিঁড়বে এবং ভাঙবেই। আজকাল তো মার্কেটে চুল টিজ না করেও ফোলানোর অনেক এক্সেসরিজ আছে। চাইলে, সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এতে, চুলও ভালো থাকলো, স্টাইলও হলো!

৭. চুল বেঁধে রাখতে আমরা রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এক্ষেত্রে একদম রাবারের তৈরী চিকন ব্যান্ডগুলো থেকে চুলকে দূরে রাখলেই ভালো করবেন। কারন এসব ব্যান্ড চুলের স্বাস্থ্যের জন্য খুব একটা ভালো নয়। তাছাড়া, যখন ব্যান্ড চুল থেকে খুলতে যাবেন, তখন দেখবেন এই ইলাস্টিক ব্যান্ড-এর সাথে অনেকগুলো চুল ছিঁড়ে চলে এসেছে। তাই, কাপড়/ উলের তৈরী ব্যান্ডগুলো ব্যবহার করবেন। এছাড়াও চুল বেশী শক্ত করে বাঁধতে যাবেন না।

৮. আমরা স্কিন এক্সফোলিয়েট করে থাকি যেন স্কিন সুন্দর এবং গ্লোয়িং হয়। চুল ট্রিম করাটাকেও তেমনি বলা যায়। এতে চুল দেখতেও সুন্দর লাগে। কারণ, অনেকেই চুল লম্বা করার শখে চুলের আগা ট্রিম করেন না। যার ফলে পুরোনো চুলগুলো দুর্বল হয়ে গিয়ে আগা ফাটে, চুলে জট সৃষ্টি করে এবং চুল ভাঙে।

৯. অনেকের মেডিকেল প্রবলেম-এর কারণেও চুল পড়া এবং ভাঙার সমস্যা দেখা যায়। যেমন – থাইরয়েড-এর রোগীর। এছাড়াও ওয়েট লস-ও হেয়ার ব্রেকেইজ-এর একটা কারণ।

১০. একটা কথা প্রচলিত আছে যে, প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে চুল ১০০ বার আঁচড়ালে চুলের জন্য বেশ ভালো। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি? ওভার ব্রাশিং চুলের জন্যে সত্যি সত্যি কতটা ভালো? এর ফলে চুল ড্যামেজ হয়ে যায় এবং আগা ফাটা বেড়ে যায়। একটা সময়ে চুল ভাঙা শুরু হয়। তাই ওভার ব্রাশিং থেকে দূরে থাকুন। এছাড়াও সবসময় মোটা দাতের চিরুনি ব্যবহার করতে চেষ্টা করবেন।

১১. এতসব কিছুর সাথে সাথে প্রপার ডায়েট, ভিটামিন-এর অভাব, স্ট্রেইস ইত্যাদির কারণেও চুল ভাঙতে পারে।

১২. নিয়মিত নারকেল তেল না দেয়ার কারণে চুলের ময়েশ্চার নষ্ট হয়ে চুল নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। ফলে হেয়ার ব্রেকেইজ ও হেয়ার ফল-ও বেড়ে যায়।

 

এবার চলুন জেনে নেই হেলদি চুলের জন্যে কী কী করতে হবে।

চুলে শ্যাম্পুর চেয়ে কন্ডিশনার বেশী ব্যবহার করবেন। ডাবল কন্ডিশনিং এক্ষেত্রে ভালো কাজে দেবে। কিন্তু শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনার অবশ্যই জেন্টলি ব্যবহার করতে হবে।

 চুল ব্লো ড্রাই-এর দরকার পড়লে কুলিং সেটিং এ ব্যবহার করুন।

 চুলে হেয়ার এক্সটেনশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন তা যেন লাইট হয়।

 চুলে কোকোনাট অয়েল দেয়া বাদ দেওয়া যাবে না। সপ্তাহে ২-৩ দিন চুলে তেল দেওয়া কিন্তু মাস্ট।

 এছাড়া নিজের ডায়েটের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 সবশেষে হেলদি হেয়ারের জন্য ২ টি হেয়ার মাস্ক-এর রেসিপি জানাচ্ছি।

  • ১ কাপ মেয়োনিজ ও ১/২ চা চামচ নারকেল তেল নিয়ে পুরো চুলে লাগিয়ে রাখুন। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু করে কন্ডিশনার লাগাবেন।
  • একটি বাটিতে ২ টি ডিমের সাদা অংশ, ২ টেবিল চামচ নারকেল তেল এবং ২ টেবিল চামচ টক দই মিলিয়ে চুলে লাগান। ৪০ মিনিট পর শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনার লাগিয়ে নিন।

কি? এবার নিজের চুল ভাঙার কারণ ও তার সঠিক সমাধানটা খুঁজে পেয়েছেন তো? এবার সেই অনু্যায়ী লাইফস্টাইল মেনটেইন করুন। আপনি নিজেই আপনার চুলে পার্থক্য দেখতে পাবেন।

 

লিখেছেন- জান্নাতুল মৌ

Comments

comments

Recommended