ফিটনেস, সুস্বাস্থ্য

আচ্ছা…দড়িলাফ কি মেয়েদের জন্য সেইফ?

স্কুলে বার্ষিক স্পোর্টস ডে-তে দড়িলাফ নিয়ে আমাদের ভেতরে এক্সাইটমেন্ট দেখার মতো ছিল! কারণ আমাদের এক ক্লাসমেট ছোটবেলা থেকেই দড়িলাফে ছিল এক্সপার্ট। স্কুলের রেকর্ড তার হাতেই থাকতো সবসময়। মেইন ইভেন্টে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে লাফিয়ে গিয়েছিলো সে একবার অনায়াসে! আর এই রেকর্ডের জন্য তাকে স্কুলের তরফ থেকে একটা ম্যাডেল দেয়াও হয়েছিল। দড়িলাফের কথা শুনলেই আমার সেই ফ্রেন্ডের কথা মনে পড়ে যায়।

আচ্ছা আপনিও কি আজকাল লাফিয়ে দেখেন আগের মতো ৫০০ টা লাফ দিতে পারেন কিনা? সেই ফিটনেস-টুকু আর আছে কিনা? নাকি মোবাইলের স্ক্রিনে আপনি আর আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দুইয়েরই চোখ সেঁটে থাকে?

যাক গে, আপাতত ফেবুতে কিছু বহুল প্রচলিত বানী নিয়ে আলাপ করতে চাইছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় কথা বলব দড়িলাফ বা স্কিপিং নিয়ে। অত্যন্ত বাজেট ওয়ার্কআউট যা একদম ফ্রিতে আপনাকে কার্ডিও এবং ওয়েটলস বেনেফিটস দেয়।

কিন্তু আজকাল বিভিন্ন অনলাইন বিশেষজ্ঞ (!) এবং শেডি পেজের ক্লিকবেইট টাইটেল দাবি করে যে-

দড়িলাফ দিলে মেয়েদের জরায়ু ক্ষতিগ্রস্থ হয়, মেয়েদের দড়ি লাফানো উচিৎ নয়, প্রবলেম হয় ইত্যাদি ইত্যাদি…!!

এই টাইটেল-এর একটা লেখা একবার দেখে ফেললেই হয়েছে! অনেকেই নিজের মাথায় রাখা মাইলের পর মাইল লম্বা “মেয়েরা এগুলো করে না” লিস্টে অলরেডি দড়িলাফের নাম লিখে বসে আছেন, না?

ওয়েইট, কূপমণ্ডূক লিস্ট-টা তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, দৌড়ে নিজের ১০ টা ফ্রেন্ডের কাছে এই অসাধারন টিপ-টা পৌঁছে দেয়ার আগে আসুন একটু দেখি, আসলেই মেয়েদের দড়িলাফ দিলে প্রবলেম হয়? কি না?

দড়িলাফের বেনেফিট-গুলো কী?

এটা দৌড়, সাঁতারের লেভেলের কার্ডিও এক্সারসাইজ।

কিন্তু এর জন্য মাঠ বা সুইমিং পুল দরকার নেই, নিজের ঘরে টিভি দেখতে দেখতেই ডেইলি এক্সারসাইজ করে ফেলতে পারবেন।

এক ঘণ্টার দড়িলাফে ম্যাক্সিমাম ১৩০০ ক্যালরি বার্ন হয়। ওজন এবং এক্সারসাইজের ইনটেনসিটি-এর উপর ভিত্তি করে ক্যালরি বার্ন কম হতে পারে, কিন্তু তারপরেও সোনা পাতা, ‘হারবাল’ স্লিমিং টি ইত্যাদি হাবিজাবি মুঠো মুঠো খাওয়ার থেকে অনেক বেশি কার্যকরী এবং সেইফ।

বুঝতেই পারছেন একটা দড়ি ছাড়া আর কিছুই কেনার দরকার পড়বে না। তাই মোটামুটি ফ্রি-তে ব্যায়াম করতে পারছেন।

এবার দেখি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ভাইরাল আর্টিকেল কি ক্লেইম করছে-

দড়িলাফ দিলে নারীদের জরায়ু নিচে নেমে যায় , এটা কতটুকু সত্যি?

আগে জেনে নেই ‘জরায়ু নিচে নেমে যাওয়া’ বা Uterine Prolapse বলতে কি বোঝানো হচ্ছে।
জরায়ু নিচে তখনি নেমে যেতে পারে যখন যেসব লিগামেন্ট জরায়ু দেহের ভেতরে ধরে রাখছে সেগুলো যথেষ্ট দুর্বল হয়ে যাবে এবং জরায়ুকে তার জায়গায় আটকে রাখতে পারবে না। তাই জরায়ু নিজের জায়গা থেকে সরে যাবে। তো, কিভাবে এই লিগামেন্ট-গুলো দুর্বল হতে পারে জেনে নেই-

১) জরায়ুর আশেপাশের লিগামেন্টে যদি নরমাল প্রেগন্যান্সি বা নরমাল ডেলিভারির সময় ড্যামেজ হয়।

২) নরমাল গ্র্যাভিটি।

৩) বছরের পর বছর খুব হেভি মাসল ড্যামেজ নেয়া।

৪) ইসট্রোজেন হরমোনের অভাব।

সবচেয়ে কমন রিজন হল ১ নম্বর। প্রেগন্যান্সি এবং ডেলিভারি। কিন্তু ৩ নম্বর পয়েন্ট দেখে মনে হতে পারে যে দড়িলাফ হয়তো আপনার দেহে ‘হেভি ড্যামেজ’ করে ফেলছে! তাই না? দেখি এ বিষয়ে ACE (American Council of Exercise) কি বলে।

কাউন্সিলের মতে, দড়িলাফ দেহে হালকা জগিং এর চেয়ে বেশি প্রেসার ফেলে না। এ কারণে একে খুব লাইট ইনটেনসিটি-এর ওয়ার্কআউট-এর লিস্ট-এ ফেলা হয়। এমনকি ফিট নারীরা প্রেগন্যান্সি-এর সময়ও হালকা এক্সারসাইজ হিসেবে নিজের ডাক্তারের সাথে কথা বলে দড়িলাফ দিতে পারেন। স্বাভাবিক অবস্থায় এক্ষেত্রে রিস্ক-এর প্রশ্নই আসে না।

এবার দেখি, যদি অলরেডি যাদের জরায়ু ডিসপ্লেসড হয়ে গেছে অন্য কোন কারণে তাদের বেলায় ডাক্তারের উপদেশ কি-
অবশ্যই যেকোনো এক্সারসাইজের আগে এক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে হবে। আর নরমাল ডে টু ডে লাইফেও কোন কাজের সময় দেহে কোন টান বা ডিসকমফোরট অনুভব করলে সাথে সাথে তা বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে ডাক্তাররা দড়িলাফের চেয়ে নরমাল কাজ যেমন ভারী জিনিসপত্র তোলা, নামানো, খুব দ্রুত সিঁড়ি বাওয়া- এসব বিষয়ে বেশি কেয়ারফুল হওয়ার ব্যাপারে জোর দেন।

তাই ফিটনেস এক্সপার্ট এবং ডাক্তারের মতামত অনুসারে-

দড়িলাফ নিজে থেকে দেহের কোন ক্ষতি নারী পুরুষ কারো ক্ষেত্রেই করে না। তাই অযথা গুজবে কান দেয়ার দরকার নেই। আপনার জেন্ডার যাই হোক, অলরেডি হাড়ের সমস্যা, ডেলিভারিতে কমপ্লিকেশন থাকলেও খুব সহজেই নিজের ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিজের জন্য কোনটা ঠিক তা জেনে নিতে পারেন।
হাতুড়ে-দের কথায় কান দেবেন না।

দুনিয়ায় কি হচ্ছে আজকাল জানেন?

সেরেনা উইলিয়ামস পৃথিবীর ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে যাচ্ছে!

দেশের মেয়ে নিশাত মজুমদার এভারেস্টের চুড়ায় আপনারই দেশের ঝাণ্ডা পুঁতে ফেলেছে!

আর এদিকে আমরা?? হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন নিয়েও কলিকাতা হারবাল মার্কা “হারবাল স্লিমিং পিল” খেয়ে যাচ্ছি!!

মেয়েরা দড়িলাফ দেবে কি দেবে না ভেবে ফেবু কাঁপিয়ে ফেলছি।

আমরা কি আদৌ একবিংশ শতাব্দীর যোগ্য?

 

 

লিখেছেন- তাবাসসুম মীম

Comments

comments

Recommended