হরমোনাল ওয়েট গেইন এবং আমাদের অভ্যাস – Shajgoj



হরমোনাল ওয়েট গেইন এবং আমাদের অভ্যাস


এপ্রিল ২২, ২০১৮



আমরা এমন একটা সময়ে বাস করি যেখানে সবাই হয় সৌন্দর্য বা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নিজের ওজন , ফিগারের দিকে চড়া নজর রাখে… সেখানে হঠাৎ যদি একদিন দেখি শখের জামাটার হাতা টাইট হয়ে যাচ্ছে, শরীরের এখানে সেখানে নতুন কিছু চর্বির আস্তর! তখন যে কতটা কষ্ট হয় সেটা আমরা সবাই কমবেশি জানি তাই নয় কি?

আচ্ছা এমনটা কি আপনার সাথেও হয়? রোজ যেমনটা খান তেমনই খাওয়াদাওয়া, কাজকর্ম, হালকা এক্সারসাইজ করছেন। কিন্তু কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ ৫ কেজি ওজন বেড়ে গেল! টেরই পেলেন না! আর যারা ওজন লক্ষ্য করেন না তারা তো মিনিমাম ১৫-২০ কেজি বাড়ার আগে নিজের এই চেঞ্জ নিয়ে তেমন চিন্তাই করেন না! আবার কেউ কেউ আছেন, প্রানপন চেষ্টা করেও ওজন কমাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাতাসেও যেন ওজন বাড়ে, তাই না?

উপরের একটা সিচুয়েশনেও যদি আপনি পড়ে থাকেন কখনো, আজ আপনার সাথেই কথা বলতে চাই…!

কি ভাবছেন নতুন একটা ‘ডায়েট চার্ট’ নামক বস্তু দেব? না না , এক্সারসাইজ আর হেলদি লাইফস্টাইল ছাড়া যে  স্বাস্থ্য, ফিগার কোনটাই কনট্রোলে আনা সম্ভব না সেটা আমরা ভালভাবেই জানি।  কিন্তু অনেক সময় সেসব কিছুই কাজ করে না, কিন্তু কেন? আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই প্রবলেমের গভীরে যাবার চিন্তাটুকুও না করে বছরের পর বছর ‘ক্রাশ ডায়েট’ নামক টর্চার নিজের উপরে চালান। লাভতো কিছুই হয় না, ফ্রি হিসেবে পান গ্যাস্ট্রিক, এসিডিটির জীবনভর সমস্যা!

হ্যাঁ, একটা বিশাল অংশের মানুষের অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধির মূল কারণ ‘হরমোনাল ইমব্যালেন্স’ । আর এই ক্ষেত্রে ওজন কমানোর চিন্তা করার আগে হরমোন লেভেল কনট্রোল করতে হবে। এছাড়া কোন উপায় আসলে নেই। আর শুধু মাত্র ডায়েট বা লাইফস্টাইল দিয়েও আবার হরমোন লেভেল কন্ট্রোলে রাখাটা সম্ভব নয়। এজন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেডিকেল হেল্পের দরকার হয়। হরমোনের কারনে ওজন বেড়ে যাওয়াটা কিন্তু এখানে মেইন প্রবলেম নয়। হরমোন ইমব্যালেন্সটা মেইন প্রবলেম! আর ওজন বেড়ে যাওয়া এই ইমব্যালেন্স এর কারণে তৈরি রোগ ব্যাধির একটা ‘উপসর্গ’ মাত্র। তাই মেইন প্রবলেমটা কোথায় সেটা বের করে ট্রিট যত কুইকলি করবেন ততই ভালো।

আসুন কিছু জেনারেল হরমোনাল ইমব্যালেন্স এরক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস এবং লাইফস্টাইল এর কিছু চেঞ্জ নিয়ে কথা বলি-

করটিসল (Cortisol)

শরীরে তৈরি প্রধান ‘স্ট্রেস হরমোন’।নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে যেকোনো স্ট্রেসফুল সিচুএশনে অ্যাডরেনাল গ্ল্যাণ্ড ‘করটিসল’ প্রডিউস করে। আর দেহে প্রচুর পরিমাণে করটিসল থাকলে দেহ ‘ইনফ্লেমেটোরি মুড’-এ চলে যায়। যার লং টার্ম রেজাল্ট ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, বিভিন্ন অটো ইমিউন রোগ ব্যাধি। খুব অল্প সময়ের স্ট্রেসে করটিসল আমাদের অ্যাংজাইটি কমাতে হেল্প করে, বাট সবসময় এই হরমোনের লেভেলে ইমব্যালেন্স থাকলে দেহের পুরো সিস্টেম ধ্বংসও সে একাই করতে পারে। যেমন- অতিরিক্ত ইনসুলিন প্রোডাকশন এবং ফ্যাট সেল প্রোডাকশন ( ওজন বাড়ার কারণ)।

*কি করবেন?

অবশ্যই যেকোনো মূল্যে প্রতি রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমাবেন। রোজকার রুটিনে স্ট্রেস কন্ট্রোল করা শহরের বিজি লাইফে খুবই জটিল। কিন্তু উপায় নেই। তাই মেডিটেশন করার ট্রাই করুন। অবশ্যই যেকোনো ভাবে প্রসেসড ফুড, প্রিজারভেটিভ এভয়েড করবেন।

থাইরয়েড (Thyroid)

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ হরমোনের সমস্যা বলতে এক প্রজনন হরমোন আর এই থাইরয়েডকেই চেনে! তাই একে নতুন করে পরিচিত করিয়ে দেবার কিছু নেই। থাইরয়েড প্রবলেমে ওজন বাড়ে, কমন নলেজ, কিন্তু কেন? ভেবেছেন কখনো? বলছি, থাইরয়েড গ্ল্যাণ্ড থেকে নিঃসরিত হরমোনের একটা প্রধান কাজ আমাদের মেটাবোলিজম , ঘুম, হার্ট রেট, বৃদ্ধি কন্ট্রোল করা। যখন যথেষ্ট হরমোন শরীরে তৈরি হয় না, তখনই হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে। কেন দরকারি হরমোন ঠিকভাবে তৈরি হচ্ছে না? ডাক্তাররা অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল আর জেনেটিকস কে দায়ি করেন। ম্যালনিউট্রিশন, টক্সিক আবহাওয়া- এসবও বেশ বড় কালপ্রিট! থাইরয়েডের অভাবে একি সাথে বডির মেটাবোলিজম মানে ক্যালরি থেকে এনার্জি কনভার্সনের রেট বাধাগ্রস্থ হয়, ফ্যাট বাড়তে থাকে এবং দেহে পানি জমতে থাকে। দুই মিলে কি হয়? হঠাৎ করে ২০ কেজি ওজন বেড়ে যায়!

*কি করবেন?

থাইরয়েড রিলেটেড সমস্যা আছে সন্দেহ থাকলে কোন দিকে না তাকিয়ে সাথে সাথে ডাক্তার দেখাবেন। আর মেডিকেশনের সাহায্যে সবসময় হরমোন ব্যালান্সে রাখার চেষ্টা করবেন। আয়োডিন যুক্ত লবণ খাবেন এবং কাঁচা শাক সবজি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবেন। ডাক্তারের সাহায্য ছাড়া কোনভাবেই এই প্রবলেম আপনি কন্ট্রোল করতে পারবেন না।

লেপটিন (Leptin)

খাবারের সময় পেট ভরেছে কি ভরে নি এটা আপনি কিভাবে বোঝেন বলুনতো? এই ‘ভরপেট ফিলিং’ দেবার পেছনে হাত আছে ‘লেপটিন’ নামক আমাদের কাছে মোটামুটি অপরিচিত এই হরমোনের। লেপটিন আমাদের বডিকে সিগন্যাল দেয় যে কখন তার ফুয়েল ট্যাংক পুরো ভরে গেছে, তাই আমরা সেটা টের পেয়ে খাওয়া বন্ধ করি। কিন্তু অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার, প্রিজারভেটিভ, চিনি এবং চিনি যুক্ত খাবার আমাদের দেহে অতিরিক্ত লেপটিন তৈরি করে। এতে কি হয়? দেহের ‘লেপটিন সেনসিটিভিটি’ কমে যায়। অর্থাৎ লেপটিন তৈরি হলেও তখন বডি এটা বোঝে না যে তার আর খাবারের দরকার নেই যথেষ্ট হয়েছে। সে অতিরিক্ত খাবার খেয়েই যায় । আর এরই ফল অতিরিক্ত ওজনের ভার।

*কি করবেন?

দুই তিন ঘণ্টা পরপর স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খান। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি এবং মিষ্টি ফল পরিহার করুন। এবং প্রচুর প্রচুর পানি খান। বিস্কিট, চানাচুর, সাদা চিনি, কোল্ড ড্রিংক খাওয়া একেবারেই বন্ধ করুন।

মেলাটোনিন (Melatonin)

‘ঘুমের হরমোন’ নামেই এর পরিচিতি বেশি। আজকাল অনেকেই ঘুমের ন্যাচারাল সাইকেল মেনটেন করতে মেলাটোনিন সাপ্লিমেনট খেয়ে থাকেন। পিনিয়াল গ্ল্যাণ্ড থেকে তৈরি এই হরমোন আমাদের ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে এবং রোজ একই সময়ে ঘুমানোর সিগন্যাল দেবার কাজটা করে। ন্যাচারালি রাতে দেহে মেলাটোনিন বেশি নিঃসরিত হয় এবং সকালে কমে আসে (সান সাইকেলের সাথে তাল রেখে) এজন্য সকালে ঘুমানো স্বাভাবিক মানুষের জন্য কঠিন এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়াটা সহজ। দেহ রাতের ঘুমের সময়টাতে দেহের ক্ষয় ক্ষতি গুলো সারিয়ে তোলে। কিন্তু ঘুমের সাইকেল এবং মেলাটোনিন-এর লেভেলে অসামাঞ্জস্য দেখা দিলে এই রিপেয়ারের কাজগুলো ঠিকভাবে হয় না। এতে ইনফ্লেমেশন বাড়ে, দেহে অতিরিক্ত পানি জমে যায়, মেটাবলিসম স্লো হয়ে যায় এবং ফলাফলে ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

*কি করবেন?

রাত ১০ টার পড়ে ঘরে কোন আলো জ্বালাবেন না, চোখের সামনে ব্লু লাইট (যেকোনো স্ক্রিন যেমন ফোন, পিসি, টিভি ব্লু লাইট নিঃসরণ করে) রাখবেন না। পিসি, ফোনে নাইট লাইট সেটিং ইউজ করুন যাতে সূর্য ডোবার সাথে সাথে কালার টোন কুল থেকে ওয়ার্ম হয়ে যায়। এতে অনেক রাত পর্যন্ত “ঘুমাতে পারছি না” এই অজুহাতে জেগে থাকার সমস্যা কমবে। কাঠবাদাম, চেরি, সূর্যমুখীর বীজ, এলাচি এসব হচ্ছে ন্যাচারাল মেলাটোনিনের সোর্স। তাই খাবার তালিকায় এসব রাখার ট্রাই করুন।

ইসট্রোজেন (Estrogen)

প্রধান নারী প্রজনন হরমোন। কিন্তু নারী পুরুষ দুইয়ের দেহেই ন্যাচারালি বা আর্টিফিশিয়ালি এই হরমোনের লেভেল কন্ট্রোলের বাইর চলে যেতে পারে। সমস্যাটা তখনি শুরু হয়। আপনি কি জানেন, খাবারের মাধ্যমেও আপনার দেহে এক্সেস ইসট্রোজেন আসতে পারে? স্পেশালি পেসটিসাইড আর গ্রোথ হরমোন দিয়ে তৈরি খাবার খেলে এই সমস্যা এড়ানোর উপায় নেই বললেই চলে। আবার অনেকের দেহে জেনেটিক কারণেই অতিরিক্ত হরমোন তৈরি হয়! ইসট্রোজেন লেভেল বেড়ে গেলে দেহে ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা কমে আসে। আর তখনি অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি (একচুয়ালি অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধি) শুরু হয়। ফলাফলে প্রজননে সমস্যাসহ আরও অনেক জটিল শারীরিক রোগ ব্যাধি দেখা দেয়।

*কি করবেন?

সাদা ময়দা, সাদা ভাত, সাদা চিনি এসব বাদ দিন। হোল ফুড খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। যতটা পারেন ক্লিন অরগানিক প্রোডাক্ট খান। রোজ ৩০ মিনিট এক্সারসাইজ দেহের নিজের হরমোন লেভেল ঠিক রাখতে হেল্প করবে। ফার্মের গ্রোথ হরমোন দেয়া পোলট্রি, রেডমিট, ডেইরি একেবারেই বাদ দিন।

কি? থাইরয়েডের সমস্যা বা পিরিয়ডের সমস্যাতেই যে শুধু ওজন বাড়ে না সেটা দেখে চমকে গেছেন? জী, দেহে অনেক ধরনের বিক্রিয়াই চলে যা আমরা নিজের হাতে নষ্ট করি, তারপরে সেটাকে অবহেলা করে বছরের পর বছর ‘ডায়েট’ আর ‘শর্ট জিম কোর্স’ করে একমাসে ২০ কেজি কমানোর আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখি, এরপর গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি, ডায়াবেটিসে  বিধ্বস্ত নিজের ভাঙ্গা চোরা শরীরটা টানতে টানতে ডাক্তারের চেম্বারে ফেলে দিয়ে হতভম্ব ডাক্তারের ১৪ পুরুষ তুলে গালি দেই।

কিন্তু কি জানেন? দিন রাত কোঁকাতে কোঁকাতে জীবনটা কিন্তু আপনাকেই পার করতে হবে। তাই সময় থাকতে একটু সেন্সও গ্রো করার চেষ্টা কেন করি না সবাই? উপসর্গ দেখা মাত্র ট্রিট করুন। এটাই শেষ কথা।

 

 

লিখেছেন- তাবাসসুম মীম