ত্বকের যত্ন, সম্পাদকের পছন্দ

কষ্টের উপার্জন কিভাবে খরচ করছেন?

“ফেসবুকের গ্রুপে এক ফেমাস ব্লগারের প্রোডাক্ট রিভিউ দেখলাম। একটা ফেসওয়াশের অনেক প্রশংসা করলেন সেই ব্লগার। যা বুঝলাম তা হল- তিনি তার জীবনে এতো ভালো ফেসওয়াশ খুব কম দেখেছেন। দেখেই লোভে পড়ে গেলাম। কিন্তু নেট ঘেঁটে ফেসওয়াশের দাম খুঁজে বের করে আমার চোখ কপালে উঠে গেল! ওমা!! একটা ফেসওয়াশের দাম ৩৪০০ টাকা!! ভাবতে বসলাম, কয়েক মাস টাকা জমিয়ে কিনেই ফেলব কিনা! যেহেতু ভরসার একজন মানুষ এতো ভালো রিভিউ দিলেন, নিশ্চয়ই টাকা গুলো নষ্ট হবে না, তাই না?”

উপরের কথাগুলোর সাথে নিশ্চয়ই অনেকে রিলেট করছেন! তাই না? একটা কথা আস্ক করি- “বাজেট প্রোডাক্ট”, “রিজনেবল দাম”- এসব বিশেষণ দিয়ে আপনি কি বোঝেন?

উদাহরণ দেই?  আমার কাছে একটা ফেসওয়াশের রিজনেবল দাম হচ্ছে ৯০০-১৩০০ টাকার ভেতরে।

অনেকেই আঁতকে উঠলেন, তাই না? যেমনটা আমি ৩৪০০ টাকার ফেসওয়াশ দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। আমার অনেক রিডারের কাছেই রিজনেবল ফেসওয়াশের দাম- ৩০০-৪০০, তাই না?

রিজনেবল দাম- একেকজনের জন্য একেকরকম। আর কিছু কিনতে গেলে সেই বাজেটটা আমাদের মাথায় রেখেই আমরা শপিং করি রাইট? প্রবলেমটা কখন হয়?- (১) যখন আমরা এই বাজেট সম্পর্কেই সচেতন থাকি না,  (২) খুব প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সারের কথায় লোভে পড়ে যাই এবং (৩) প্রোডাক্ট কি? তার কাজ কি? আমার স্কিনের জন্য এই জিনিসের আসলেই দরকার আছে কিনা সেটা বুঝে ওঠার আগেই কিভাবে কিভাবে যেন সেটা কিনে বসে থাকি বা অর্ডার দিয়ে ফেলি। তাই না?

বিশাল লম্বা ভূমিকা লিখে যা বোঝাতে চাইলাম তা হচ্ছে, আজ জাস্ট স্কিন কেয়ারের বিভিন্ন প্রোডাক্টের মধ্যে কিসের ওপর খরচ করবেন আর কোথায় টাকাটা সেভ করবেন তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

প্রথমে আসি, স্কিন কেয়ারের স্টেপস প্রসঙ্গে।

ফেসওয়াশ

ফেসওয়াশ বা ক্লিঞ্জারের কাজ কি? ত্বকের ধুলাস-ময়লা, তেল পরিস্কার করে ফেলা, রাইট? কিন্তু, অনেক ব্র্যান্ডের প্রোডাক্টে আরও কিছু আকাশ কুসুম ক্লেইম দেখা যায় আজকাল, যেমন- রিঙ্কেল কমিয়ে দেয়া, স্কিন কালারে চেঞ্জ এনে দেয়া ইত্যাদি। কথা হচ্ছে ফেস ওয়াশ খুব বেশি হলে স্কিনে ১ মিনিট থাকবে। এরপর তা ধুয়ে ফেলা হবে। কোন প্রোডাক্ট যদি এসব কাজ করার মতো উপাদান দিয়েও তৈরি হয়, ১ মিনিটে নোংরা স্কিনে সেসব উপাদান কোনভাবেই কাজ করবে না। মানে সেই ইনগ্রেডিয়েন্টগুলো সম্পূর্ণ ওয়েস্ট হচ্ছে। আর এসব ক্লেইম আর এসব ‘এক্সক্লুসিভ’ উপাদান ভর্তি এক টিউব ফেসওয়াশ ৩০০০-৪০০০ টাকায় কিনে আপনি আপনার টাকাও নষ্ট করছেন।

তাই ফেসওয়াশ কেনার সময় শুধু ‘ওয়াশ’ পয়েন্টটার দিকেই লক্ষ্য রাখুন। পিএইচ যেন ৫.৫ এর আশে পাশে হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এটাই এনাফ। আর প্রমিস, ৩০০-১০০০ রেঞ্জে অনেক অনেক ভালো ফেস ওয়াশ আপনি পেয়ে যাবেন। সো কোন শ্রেণির ক্রেতারই নিজের বাজেটের প্রোডাক্ট খুঁজে পেতে কষ্ট হবার কথা নয়।

*এন্ড লাইনঃ ফেসওয়াশে সেভ করুন। নিজের বাজেটের বাইরে যাবেন না।

টোনার

একইভাবে টোনার নামক স্টেপের কাজ হচ্ছে ফেস ওয়াশের পর থেকে যাওয়া হালকা পাতলা ময়লা ক্লিন করা এবং ত্বকের পিএইচ স্বাভাবিক অর্থাৎ ৫.৫ এ নিয়ে আসা। আর কিছুই না। এমনকি আপনার যদি কোন স্পেসিফিক স্কিন কেয়ার কনসার্ন না থাকে এবং আপনি যদি অলরেডি এমন ফেসওয়াশ ইউজ করেন যা আপনার পিএইচ মেনটেইন করে তবে টোনার ব্যবহার করাটা ‘মাস্ট ডু’ স্টেপ ও নয়! সেক্ষেত্রে খুব কষ্ট করে জমিয়ে জমিয়ে ২০০০-৩০০০ টাকার ‘লাক্সারি’ টোনার কেনার বেসিকালি কোন প্রয়োজন নেই।

*এন্ড লাইনঃ এখানেও সেভ। বাজেট টানাটানি থাকলে একটা পারফেক্ট ফেসওয়াশ কিনে টোনার বাদ দিয়ে সেই টাকাটা অন্য কোথাও কাজে লাগান বা গোলাপ জল দিয়ে কাজ চালান। বেশ ভালভাবেই সে আপনার স্কিন টোন করে ফেলবে।

এসেন্স

ইট ডিপেনডস। সাধারনত এসেন্স ড্রাইনেস, এজিং এসব স্কিন কেয়ার কনসার্নে বেশ কাজে আসে। তাই যদি একটু সেভ করে মিশা, ইন্নিসফ্রি, সিক্রেট কী এসব ব্র্যান্ডের ২০০০-৩০০০ টাকা দামের এসেন্স কিনতে চান তো কিনতে পারেন। এখানে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে , সত্যিই এসেন্স আপনার ত্বকের জন্য কিনা। আই মিন, ১৮ বছর বয়সে কয়েকমাস ধরে টাকা জমিয়ে মিশা এসেন্স ৩০০০ টাকা দিয়ে কিনে ফেললেন, অ্যান্ড এটা একটা অসাধারন প্রোডাক্ট, নিঃসন্দেহে। কিন্তু এর অ্যান্টি এজিং ইফেক্ট কি আপনার ১৮ বছর বয়স্ক ত্বকে কোন ইফেক্ট দেবে? না। তাই অযথা যে প্রোডাক্ট আপনার জন্য নয় সেটা হাজার হাজার টাকা খরচ করে “অমুকে বলেছে ভালো” এই লজিকে কিনতে যাবেন না।

*এন্ড লাইনঃ চিন্তা করে খরচ করুন। যদি আপনার স্কিন ম্যাচিউর হয়। এজিং ডিহাইড্রেশন কনসার্ন থাকে তবে একটা ভালো এসেন্স আপনাকে অনেক হেল্প করতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি টাকা ইনভেস্ট করলে ঠকবেন না।

সিরাম

২০১৮ তে এসেও ‘সিরাম’ কি এটা ভেবে অনেককেই মাথা চুলকাতে দেখি। কিন্তু সিরাম কি, কেন ইউজ করবেন , কিভাবে করবেন সেসব নিয়ে বিস্তারিত আরেকদিন লিখব। আপাতত বলি- স্কিনের নির্দিষ্ট একটি প্রবলেমে টার্গেট করতে সিরামের কোন বিকল্প নেই। রিঙ্কেল, স্পট, অ্যাকনি, এসব প্রব্লেমের জন্য ডে অ্যান্ড নাইট কেয়ার রুটিনে টার্গেটেড সিরাম অপরিহার্য। বলতে গেলে প্রবলেম সল্ভ করার কাজটা সেই করবে।

আর যেহেতু সব কাজের ভার মোটামুটি এরি উপরে তাই রিঙ্কেল বা স্পটের জন্য ‘ক্রিম’ বা ‘ফেসওয়াশ’-এর পেছনে হাজার টাকা না ঢেলে সেটা ঢালবেন সিরামের পেছনে। আপনার বাজেট যাই হোক না কেন বেস্ট রেজাল্টের জন্য নিজের সাধ্যের মধ্যের বেস্ট সিরামটি আপনি ইউজ করলে স্কিনের উন্নতি কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে।

বলাই বাহুল্য একই কাজ করে এমন যেমন, একটি ১০০০ টাকা দামের সিরাম আর ৫০০০ টাকার সিরামের কার্যক্ষমতা সেম হবে না। আর আপাতত মার্কেটে একটিভ উপাদান সমৃদ্ধ রিঙ্কেল, অ্যাকনি বা স্পট প্রিভেনশনের জন্য যত সিরাম আছে তার মধ্যে ‘সত্যি কাজ করে’ এমন প্রোডাক্টের দাম ১৫০০ টাকার নিচে নয়।

*এন্ড লাইনঃ এই প্রোডাক্টের পেছনে ম্যাক্সিমাম বাজেট রাখবেন। টাকা জমিয়ে কেনার প্রয়োজন হলেও ভালো একটি প্রোডাক্ট কিনবেন। অযথা ২০০-৫০০ টাকা দামের ‘সিরাম’ নামক আজেবাজে প্রোডাক্ট ১০ টা কিনে টাকা না উড়িয়ে একটা ভালো প্রোডাক্ট কিনে দিনে একবার ইউজ করে ৬ মাস চালান। কষ্ট হলেও ফল পাবেন। কতোর মধ্যে দেখবেন? কোন সীমা নেই। শুরুটা কোন রেঞ্জে করবেন সেটা জেনে রাখুন।

ময়েশ্চারাইজার

বা ‘ক্রিম’। আমাদের দেশের ম্যাক্সিমাম স্কিন কেয়ার সম্পর্কে অন্ধ মানুষের একমাত্র সহায়! আজকাল অনেকের দাবি আর চাওয়া শুনে মনে হয় তারা এমন একটা ক্রিম চান যেটা তাদের শহরে বাড়ি তুলে দেবে, আর ককেশিয়ানদের মতো ‘ফর্সা’ বানিয়ে দেবে, বোনাস হিসেবে উড়তে শিখিয়ে দেবে,  আর হ্যাঁ, সেই ক্রিম আবার খুবই অল্প দামের মধ্যে হতে হবে।

জোক মনে হলেও সিরিয়াসলি অনেকেই এধরনের একটা ‘ক্রিম’ বছরের পর বছর খুঁজে নিজের টাকা, স্কিন আর সময় সবই নষ্ট করেছেন। আমাদের ইনবক্সেই এমন উদাহরণ কয়েকশ আছে যারা ২০১৫ থেকে ‘মনের মতো ক্রিম’ খুঁজে পাচ্ছেন না!! কিন্তু আমার প্রশ্ন, হাতি আর বানরের গল্পটা জানেন তো? ঐ যে হাতির বাবা মা হাতিকে বানরের মতো গাছে উঠতে না পাড়ার জন্য গালিগালাজ করে যেখানে? গল্পের মরাল কি ছিল?-“যার কাজ যেটা তাকে দিয়ে সেটাই করানো উচিৎ।”

এখন এই ‘ক্রিম অভিযান’-এ যারা আছেন তাদের অবস্থা হাতির বাবার মতো। তাদের প্রোডাক্টের কাজ সম্পর্কে আইডিয়া শূন্যের কাছাকাছি। নয়ত তারা বুঝতেন ‘ময়েশ্চারাইজার’ এর নামকরণের সার্থকতা ষোল আনা! যে ‘ময়েশ্চারাইজ’ করে, সেই ময়েশ্চারাইজার! এখন পণ্ডস ময়েশ্চারাইজার কেন ১৫০০ টাকার সিরামের রেজাল্ট দেয় না সেটা নিয়ে হাত পা ছুঁড়ে কাঁদলে সময় কার নষ্ট হবে? আপনার। পণ্ডস ‘ভালো না’ বলে ঠোঁট উল্টে ৫০০ টাকার পাকিস্তানি ‘গোরি, চাঁদনী’ দিন রাত মুখে ঘষলে স্কিন কার নষ্ট হবে ? আপনার।

*এন্ড লাইনঃ তাই ক্রিমকে ক্রিমের কাজ করতে দিন। যেকোনো বাজেটের ক্রিম মার্কেটে অ্যাভেইলেবল। ৫০০-১৫০০/- টাকার ভেতরে আপনি আপনার কাংখিত প্রোডাক্ট পেয়ে যাবেন যা যেকোনো সিজনে ত্বকে আদ্রতা দেবে, তেল বা টানটান ভাব দুটোই কনট্রোলে রাখবে। বাজেট কম হলে কষ্ট করে দামি একটা ক্রিম কেনার দরকার নেই।

সানস্ক্রিন

একটা ভালো সানস্ক্রিন, যা অ্যাকনি বাড়ায় না, মুখ তেলতেলে করে না, সঠিক প্রটেকশন দেয়, মুখে সাদা আস্তর ফেলে রাখে না, আবার ইজিলি রিঅ্যাপ্লাইও করা যায়! মামা বাড়ির আবদার মনে হচ্ছে? একেবারেই না। এমন একটা প্রোডাক্ট খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু এমন প্রোডাক্ট আছে এবং এগুলোর ফরমুলেশন জটিল বলে দামটাও চড়া। এজন্য সানস্ক্রিনের বাজেট থাকবে সিরামের মতই বা কাছাকাছি।

আর যখনি চান্স পাবেন মার্কেটের নতুন ফরমুলেশন ট্রাই করে দেখবেন । আজ যে সানস্ক্রিন তা আপনার ভালো লাগছে কাজের থেকেও ভালো কিছু মার্কেটে আসতে পারে। সো একটু সেভ করে ভালো একটা প্রোডাক্ট কিনবেন। you will thank yourself later.

*এন্ড লাইনঃ ভালো ব্র্যান্ডের ট্রাইড অ্যান্ড টেস্টেড সানস্ক্রিন ১২০০/- টাকা বা এর উপরে হবে। সো এখানে টাকা বাঁচানোর চেষ্টা না করলেই ভালো করবেন।

তাই, উপরের পয়েন্টগুলো থেকে আমরা যে বাজেট আউটলাইন পেলাম –

সিরাম  >  সানস্ক্রিন  > ময়েসচারাইজার  >  ফেস ওয়াশ  > টোনার

ম্যাক্সিমাম                                                                             মিনিমাম

বাজেট

এবার নিজের কালেশনের প্রোডাক্টগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন তো? হিসাব মিলছে কিনা? যদি না মেলে সিওর থাকুন কিছু টাকা আপনি নষ্ট করেছেন এবং অযথা সময়ও অপচয় করছেন।

** লেখাটি যারা খুব বাজেটে স্কিন কেয়ার শপিং করে তাদের জন্য। কষ্টের উপার্জনের প্রতিটি পয়সা অমূল্য। তাই কারো যদি একটা টাকাও সেভ করতে হেল্প হয় তাহলেই লেখাটি সার্থক।

** আপনি যদি সঙ্গতিপূর্ণ হন তবে নিজের ইচ্ছামত যেকোনো লাক্সারি প্রোডাক্ট কিনতেই পারেন। কিন্তু যদি আপনি বাজেটে থাকেন তবে লাক্সারি আর নেসেসিটি গুলিয়ে ফেললে ফাঁপরে পড়বেন ।

** টাকা বাঁচাতে ত্বক আর স্বাস্থ্যের ঝুকি নেবেন না। বাজারে সব শ্রেণীর মানুষের জন্য ‘সেফ’ প্রোডাক্ট আছে। ‘ফর্সা’ হওয়ার ক্রিম মেখে ক্যান্সারের রিস্ক তৈরির মতো বোকা আপনি হলে আপনাকে আর কিভাবে বোঝানো সম্ভব আমার জানা নেই।

লিখেছেন- তাবাসসুম মীম

Comments

comments

Recommended