ক্যারিয়ার, সম্পাদকের পছন্দ

কর্পোরেট আদবকেতা : পর্ব ১

পরশু যে সিভিটা খুললাম, খোলামাত্রই চমকে উঠলাম, সিভিটা সুন্দর এবং গোছানো, কিন্তু সাথে যে পাসপোর্ট সাইজের ছবিটা অ্যাটাচমেন্টে দেয়া সেটা উল্টা। ছেলেটি বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছে, রেজাল্ট ও ভালো, কিন্তু সিভিতে ছবিটাই উল্টা!

গত সপ্তাহে যে মেয়েটার ইন্টার্ভিউ নিলাম সে সুন্দর একটা ড্রেস পড়ে এসেছিল, মার্জিত এবং রুচিশীল সাজগোজ। কিন্তু ইন্টারভিউ এর সময় ওড়নাটা ঠিকভাবে না পড়ার কারণে কথা বলতে বলতে বারবার পড়ে যাচ্ছিল এবং সে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বারবার ওড়না ঠিক করছিল, যেটা আমাদের কনভারসেশনেও বেশ বিরক্তি এবং আনপ্রোফেশনালিজমের সৃষ্টি করেছিল।

যে ছেলেটার দারুণ একাডেমিক স্কোর দেখে তাকে ডেকেছিলাম, সে ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট টাকড ইন করে, কিন্তু পায়ে একটা দুই ফিতার স্যান্ডেল।

ইন্টারভিউতে মেয়েটা যেসব কাজ জানে খুব কনফিডেন্সের সাথে বলেছিল, জয়েনিং-এর দ্বিতীয় দিনেই জানা গেলো ওগুলো চাকরী পাবার জন্য ভুল তথ্য দিয়েছিল। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ছিল, তাকে সাথে সাথেই টার্মিনেট করা হয়।

বিভিন্ন অরগানাইজেশনের ক্যারিয়ার মেইলিং অ্যাড্রেসে যত ইমেইল আসে, অনেকগুলোতেই দেখি কোন সাবজেক্ট মেনশন করা থাকে না। তাহলে এমপ্লয়ার কিভাবে বুঝবেন আপনি কোন পোস্টের জন্য অ্যাপ্লাই করেছেন?

উপরের এই সমস্যাগুলো কিন্তু এখন খুব প্রকট। ছেলেমেয়েরা সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে, অনেকে আবার পড়াশোনা করা অবস্থাতেও চাকরীর জন্য বিভিন্ন জায়গায় অ্যাপ্লিকেশন পাঠান। কিন্তু সঠিক আদবকেতা না থাকায় দেখা যায় তারা ইন্টার্ভিউ সেশন পর্যন্তই যেতে পারেন না, সিভি পাঠানোর লেভেলেই ছিটকে পড়েন। আজকে আমরা কর্পোরেট ম্যানারের প্রথম পর্বে একদম বেসিক কিছু আদবকেতা শেখার চেষ্টা করবো।

(১) প্রথমেই আমাদের যেটা জানতে হবে সেটা হলো সিভি তৈরি করা। একটা ভালো মানের সিভি তৈরি করাটা কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারের ফার্স্ট ইমপ্রেশন তৈরি করতে কাজে দেয়। নিজে যদি না জানেন, গুগলের সাহায্য নিন, আজকাল কিন্তু অনেক তথ্যই গুগলে পাওয়া যায়। আপনি যদি সেটাও না পারেন, সিনিয়র কারো সহযোগিতা নিন। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ফরম্যাটের চেয়ে পিডিএফ ফর্ম্যাটে সিভি পাঠালে ভালো।

(২) অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিবেন না এবং প্রয়োজনীয় তথ্য অবশ্যই দিবেন। অনেকে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস লিখেন না, কিন্তু এমপ্লয়ার আপনার এ তথ্যগুলো জানলে আপনার পোটেনশিয়ালিটিও জানতে পারবেন।

(৩) কোন মিথ্যা তথ্য লিখবেন না। অনেকেই সিভিকে সমৃদ্ধ দেখানোর জন্য মাইক্রোসফট অফিস, অ্যাডোবের একগাদা জিনিস লিখে বসে থাকেন, পরে জয়েনিং-এর পর কলিগদের কাছে এক্সেল শীট নিয়ে দৌড়ে বেড়াতে হয়।

(৪) অবশ্যই সঠিক মাপে নিজের ছবিটা সিভিতে অ্যাটাচ করবেন। অনেককেই দেখেছি নিজের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচারটাই কপি পেস্ট করে সিভিতে বসিয়ে দিয়েছেন। এটা কিন্তু আপনার প্রতি আপনার এমপ্লয়ারকে বিরক্ত করে তুলতে পারে।

(৫) কাভার লেটার কি জেনে নিন এবং অবশ্যই সিভির সাথে কাভার লেটার সংযুক্ত করুন। আপনি যে পোস্টের জন্য অ্যাপ্লাই করছেন, সেই ডেজিগনেশনে কেন আপনিই সেরা প্রার্থী হতে পারবেন, সেটা সুন্দর করে খুবই অল্প কথায় গুছিয়ে লেখাই কাভার লেটারের কাজ। একটা ভালো কাভার লেটার আপনার সিভিকে কমপ্লিমেন্ট করবে। কোন এক পর্বে সুন্দর করে কাভার লেটার কিভাবে তৈরি করা যায় সেগুলো নিয়ে কথা বলবো।

(৬) যে পোস্টে অ্যাপ্লাই করছেন ইমেইলে সাবজেক্ট হিসেবে সেটাই লিখুন। যেমন – আপনি যদি Trainee Marketing Manager পজিশনের জন্য অ্যাপ্লাই করেন, তাহলে ইমেইলের সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন – Application for the Post of “Trainee Marketing Manager”, অনেকেই সাবজেক্ট না লিখে মেইল পাঠিয়ে দেন, সেক্ষেত্রে অর্গানাইজেশন বুঝতেই পারে না, আপনি আসলে তাদের সিভিটা কেন পাঠিয়েছেন।

(৭) র‍্যান্ডমলি সিভি পাঠাবেন না, আপনার সাথে যাচ্ছে এমন কোন পোস্ট হলেই অ্যাপ্লাই করুন এবং অবশ্যই ভালো করে যেখানে সিভি পাঠাচ্ছেন, সেই অর্গানাইজেশন সম্পর্কে জেনে নিন। আপনি যদি অর্গানাইজেশনটির কাজের ধরণ সম্পর্কে ন্যূনতম আইডিয়া ও না রাখেন, তাহলে এমপ্লয়ার আপনাকে আসলে প্রশ্ন করার কিছুই খুঁজে নাও পেতে পারেন এবং আপনার ইন্টার্ভিউ কিন্তু শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাবে।

(৮) ফোনকলের মাধ্যমে যখন মৌখিক ইন্টার্ভিউ বা লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়, তখন অবশ্যই নিজের কথা বলার টোনের ব্যাপারে লক্ষ্য রাখুন, আপনার কথায় যদি ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়, অথবা আত্মবিশ্বাসের অভাব বোঝা যায় – যিনি আপনাকে কল করেছেন, তিনি শুরুতেই আপনার প্রতি একটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে পারেন। যেটা আপনার ক্যারিয়ারের জন্য ভালো হবে না নিশ্চয়ই।

(৯) অবশ্যই সবাইকে “আপনি” করে সম্বোধন করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আমাদের দেশে, আমাদের ভাষায় “আপনি” আছে, “তুমি” ও আছে, ইংরেজির মত সহজ একটি “YOU” নেই যে বলে ফেললেই হলো। শুরুতে “আপনি” করেই সবাইকে সম্বোধন করাটা সেইফ অপশন, তাই না?

(১০) আজকাল জব পোর্টাল্গুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন ফেসবুক সার্কুলার গ্রুপেও জব সার্কুলার দেয়া হয়। যিনি জব সার্কুলার দিচ্ছেন, তিনি কিন্তু ভবিষ্যতে আপনার এমপ্লয়ার হতে পারেন। আপনি যে এই পোস্টের জন্য আগ্রহী সেটা তাকে বোঝানোর জন্য বা সেই তথ্য তাকে জানানোর জন্য তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো বা মেসেঞ্জারে টেক্সট পাঠানো কিন্তু অশোভন এবং অনুচিত।

(১১) নিজের ফেসবুক প্রোফাইলটা একটু গুছিয়ে রাখুন। এখন অনেক অর্গানাইজেশনই ক্যান্ডিডেটদের ফেসবুক প্রোফাইল দেখেন। যদি এমপ্লয়ার দেখেন আপনার নামটাই দেয়া আছে – প্রিন্সেস অমুক বা চকোলেট ব্রাউনি তমুক বা তমুক কুল বয় , অথবা ওয়ার্কস অ্যাট বাপের হোটেল / ফেসবুক, তাহলে আপনার ইমেজ কিন্তু দাঁড়ানোর আগেই ধপ করে বসে পড়বে।

 

আগামী পর্বে কথা বলবো আরো কিছু কর্পোরেট আদবকেতা নিয়ে। ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকুন। শুভকামনা রইলো।

 

লিখেছেন ঃ ফারহানা প্রীতি

Comments

comments

Recommended