“ভালো দর্জি” কিভাবে খুঁজি?


দিলো দর্জি আমার জামাটার বারোটা বাজিয়ে!

স্বামী ভদ্রলোক এমনিতেই মহাব্যস্ত, সময়ই পান না। গতমাসে দেশের বাইরে গিয়েছিলেন, আমার জন্য ভীষণ সুন্দর একটা শাড়ি এনেছেন। এবারের বৈশাখে ভাবছি এটাই পড়ে বেড়াতে বের হবো। ব্লাউজটা বানাতে দিয়েছি একটু ডিফারেন্ট স্টাইলে এবার, দর্জিকে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি, এত সুন্দর শাড়ির সাথে ব্লাউজটা সুন্দর হলে তাহলেই না সুন্দর লাগবে! আজ তো ডেলিভারি দেয়ার কথা, যাই, নিয়ে আসি দর্জিবাড়ি থেকে, ফেরার পথে মার্কেটে টুকটাক কেনাকাটা সেরে একবারে বাড়ি ফিরবো।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ভাবলাম ব্লাউজটাসহ শাড়িটা ট্রায়াল দেই। যেই ভাবা, সেই কাজ! উফ! এ কি অবস্থা! ব্লাউজের স্লীভ তো ভয়াবহ লুজ! আর বানাতে বললাম বোটনেক, গাধাটা বানিয়ে দিয়েছে হাইনেক! এই দর্জির কল্যাণে আমার পহেলা বৈশাখ মাটি!

উপরের মেয়েটা কি আপনি? দর্জির কল্যাণে পছন্দের জামা একবারও নষ্ট হয়ে যায়নি, এমন সৌভাগ্যবতী নারী খুঁজে পাওয়া কিন্তু দুষ্কর! বিশেষ করে উৎসব, জীবনের বিশেষ উপলক্ষ্য আর পার্বণের সময় শখের জামা দর্জির কল্যাণে নষ্ট হয়ে গেলে মনটাই তেতো হয়ে যায়। রেডিমেড ওয়েস্টার্ন পোশাক নিজের সাইজ মতো পাওয়া গেলেও আমাদের দেশের নারীদের একটা বিশাল অংশ নিয়মিত দর্জিদের কাছ থেকেই পোশাক বানিয়ে থাকেন, কখনো গজ কাপড় আর লেইস-অ্যাক্সেসরিজ কিনে, কখনো বা থ্রিপিস, টুপিস বা ওয়ানপিস কিনে। আবার রেডিমেড পোশাক মাপমতো না হলে সেটা ওয়াল্টার করার প্রয়োজনে হলেও টেইলরের কাছে কিন্তু আমাদের যেতেই হয়! আমি আগে অনেক জায়গায় জামা বানিয়ে ধরা খেয়েছি, তো এই রেগুলার বিভিন্নভাবে ধরা খাওয়ার পর আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, আমি যখন আমার কষ্টের টাকায় কাপড় কিনে দর্জিকে সেটা বিশ্বাস করে বানাতে দিচ্ছি, তখন আমার একটু যাচাইবাছাই করেই দর্জি বাছাই করা উচিৎ, যেন আমি সবসময় একজনের কাছেই পোশাক বানাতে পারি, এতে করে আমার সময় এবং এনার্জি দুটোই বাঁচবে, এবং আমি আমার পোশাকের ফিটিংস এবং কোয়ালিটি নিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো।

আমার ক্ষুদ্র জীবনের সীমিত অভিজ্ঞতায় আমার কাছে যেগুলো মনে হচ্ছে –

১. টেইলরের ঠিকানা এবং আমার বাসা থেকে দূরত্ব : দর্জিবাড়ি যদি বাসা থেকে অনেক দূরে হয়, তাহলে অবশ্যই সেটা আপনার জন্য কনভেনিয়েন্ট হবে না।

২. দর্জি টাকাপয়সা কেমন চার্জ করেন : আমি বাকিদেরটা জানি না, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা বিশ্বাস করি, সস্তার তিন অবস্থা। দেড়শ টাকা মজুরির জামা অবশ্যই কখনো হাজারের কাছাকাছি মজুরির জামার মতো হবে না।

৩. দর্জি মাপ কীভাবে নেন : দর্জি মাপ ঠিক মতো না নিলে, মাপে ভুল হলে পোশাক সুন্দর হবে না। অনেকে ফিতে হাতে মেপে নেন ঠিকই, কিন্তু কাগজে ঠিক মতো লিখে রাখেন না, মুখে বলেন যে মনে থাকবে এবং এই মনে থাকার চক্করেই সাধের পোশাকের বারোটা বেজে যায়।

৪. চলতি ফ্যাশন সম্পর্কে দর্জির কতটুকু আইডিয়া আছে : ফ্যাশন রেগুলারই পরিবর্তন হচ্ছে। কাজেই দর্জি যদি আপনাকে চলতি ফ্যাশনের চাপা সিগারেট প্যান্টের জায়গায় একছাটের সালোয়ার বানিয়ে পড়তে দেন, আপনার কি ভালো লাগবে?

৫. পোশাকের মাপ নিতে গিয়ে টেইলর যেন শুধু পোশাকের মাপই নেন,  আপনার ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের না : কিছু টেইলর আছেন যারা মুখে মিষ্টি করে আপু ডাকেন ঠিকই, কিন্তু বুকের মাপ নিতে গিয়ে ইচ্ছে করে গায়ে ছুঁয়ে যান।

৬. ডেলিভারি অন টাইম : যেদিন ডেলিভারির ডেট দর্জি সেদিন সেই সময়েই পোশাক ডেলিভারি করলে অবশ্যই সে একজন ভালো দর্জি।

৭. পোশাকের কাটিং এবং ফিটিংস : দর্জিবাড়িতে কিন্তু আমর যাই ই ভালো কাটিং এবং ফিটিংসের ড্রেস পেতে, কাজেই যার হাতের এ কাজ দুটো ভালো না, তার কাছে পোশাক দেয়া মানে বিপদ বাড়ানো।

৮. কাপড়ের বেঁচে যাওয়া অংশ ফেরত দেয়া : আমরা যেসব থ্রিপিস বা টুপিস কিনি, অথবা গজ কাপড়ের ও অনেক সময় দেখা যায় যে বেশ অনেকখানি কাপড় বানানোর পর রয়ে গিয়েছে। ঐ বেঁচে যাওয়া কাপড়টুকু দিয়ে ছোট বাচ্চাদের জামা, পুতুলের জামা, টুকটাক হ্যান্ডিক্রাফটের কাজ ছাড়াও ক্রিয়েটিভ কাজে ব্যবহার করা যায়। অনেক দর্জিই এই কাপড়টুকু ফেরত দেন না, নিজেরাই রেখে দেন। যিনি ফেরত দিয়ে দেন, তিনি নিঃসন্দেহে একজন ভালো দর্জি।

৯. আপনাকে ফ্যাব্রিক ও ডিজাইন সম্পর্কে ভালো আইডিয়া দেয়া : সবার গায়ে কিন্তু সব ফ্যাব্রিক মানায় না। খুব ক্ষীণদেহী একটা মেয়ে যদি বাটার সিল্ক ফ্যাব্রিকের জামা পড়ে, তাকে সেটাতে আরো রোগা দেখাবে। আবার ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী কেউ যদি অ্যান্ডি সিল্ক পড়েন, তাকে আরো মোটা দেখাবে। একই কথা ডিজাইনের ক্ষেত্রেও খাটে। আপনার বডি স্ট্রাকচার অনুযায়ী লেটেস্ট ট্রেন্ডি কোন কাটিং এর পোশাকে আপনাকে মানাবে সেটা আপনার দর্জিকে জানতে হবে।

১০. ডেডলাইন থাকলে ইমারজেন্সিতে ড্রেস বানিয়ে ডেলিভারি দেয়া : হঠাত করে কোন দাওয়াত, বা অন্য কোন ইভেন্ট। আপনার ইমারজেন্সি নতুন একটা পোশাক লাগবে। এমন অবস্থায় যে আপনাকে ঐ ডেডলাইনের ভিতর সুন্দর করে পোশাকটি বানিয়ে দিতে পারবে, নিঃসন্দেহে সে একজন বিশ্বাসযোগ্য দর্জি।

এবার তাহলে একটু যাচাইবাছাই করে নিন, আর ভালো দর্জির কাছ থেকে মন মতো পোশাক বানিয়ে নিন।

 

লিখেছেন – ফারহানা প্রীতি