বডি মেকাপ! সেটা আবার কী? – Shajgoj



বডি মেকাপ! সেটা আবার কী?


ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৮



কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা গ্রুপে এক পরিচিত মেম্বারের পোস্ট দেখলাম। নিচের ছবিটি দেয়া, সাথে প্রশ্ন,

আচ্ছা আমাদের হাত পায়ের স্কিন তো এমন ঝকঝক করে না। ওরা এমন কি করে যে হাত পা বডি এত গ্লোয়ি? আমাদের তো মুখের ত্বকও এত ঝলমলে নয়! কারণটা কি?

 

তাইতো, হাইলাইটারের আধিপত্যের এই যুগেও আমাদের ফুল ফেইস মেকাপ এতটা শাইনি হয় না যতটা ছবির সেলেব্রেটির পা, তাই নয় কি?

তো অনেকেই উত্তর দিলেন- ওরা অনেক জিম করে, অনেক ভালো লাইফস্টাইল ওদের। অনেকের মতামত এসবই প্লাস্টিক সার্জারি এবং ফটোশপের কারসাজি… সত্যি বলতে গেলে উপরের সব পন্থাই কেউ না কেউ বেছে নেন ঠিক, কিন্তু ছবির মতন গ্লোয়ি শাইনি বডি স্কিনের জন্য এদের ভূমিকা কিন্তু খুবই কম !

 

এবার নিচের ছবিটি দেখুন-

একই বেয়ন্সের একই বডি স্কিনের ছবি। কি স্কিনের শাইন দেখে চোখ ঝলসে যাচ্ছে কি? না, তাই না? হ্যা, সে অবশ্যই একজন অপূর্ব সুন্দরী গুণবতী মানুষ, কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না, দুটো ছবি প্রায় একই সময়ের হলেও এদের মধ্যে তফাৎ আকাশ পাতাল। আর এখানেই চলে আসে বডি মেকাপ অ্যান্ড বডি স্কিন কেয়ারের প্রসঙ্গ।

অনেকেই আছেন যারা মেকআপ-শেমিং করে বিকৃত আনন্দ পাবার চেষ্টা করেন। তাদের বলব প্লিজ গেট এ লাইফ। আপনি অন্যকে নিয়ে যেমন বিদ্রুপ করেন তেমনি আপনাকে নিয়েও কেউনা কেউ বিদ্রুপ করছে। এটা মাথায় রাখবেন। কেউ যদি নিজেকে পরিপাটি রাখতে চায়, তার সেটা করার অধিকার আছে। সো নিজের চরকায় তেল দিন।

বডি মেকআপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জানি অনেকেই প্রশ্ন করবেন, আমাদের দেশের কনটেক্সট এ এই ধরণের গেট আপের কোন বিস্তার নেই, সো কেন আমি এই ছবি দুটো নিয়ে আর্টিকেলের ভূমিকা লিখলাম। আপনি একদম ঠিক। কিন্তু, নিচের কিছু পয়েন্ট দেখে নিন কাইন্ডলি-

  • আপনি কি বেইজ মেকাপ করার সময় আপনার ফাউনডেশন ঘাড়ে, গলায়, ডেকলটেজ (গলার নিচের অংশে) এবং কানের পুরো লতিতে লাগিয়ে নেন?
  • অনেকেই প্রথমবার কানে ফাউনডেশন লাগাবার কথা শুনলেন এইমাত্র রাইট?
  • বিয়ের মেকাপে এবং ছবিতে নিজের মুখ এবং হাতের দুই রকম রঙ দেখে চমকে গেছেন? মেকআপ মুখোশের মতো লাগছে? যেন মুখ একজনের বডি আরেক মানুষের তাই না?
  • খুব কমন প্রব্লেম। অনেকে ধরেই নিয়েছেন এটাই স্বাভাবিক! কিন্তু তাই কি? প্রথম ছবিতে বেয়ন্সের ফুল মেকআপ দেখুন, তারপরে আমাদের দেশের সো কলড পার্টি মেকাপের একটা ছবি দেখুন। কোনটা স্বাভাবিক লাগছে আপনার কাছে?

আপনার শরীর আপনারই অংশ এবং মেকাপের কাজ আপনার স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে একটু গুছিয়ে উপস্থাপন করা। মুখে ৪ শেড সাদা প্যান কেক অথচ হাতের ট্যান, অবাঞ্ছিত লোম ,পায়ে স্যান্ডেলের দাগ, মশার কামড়। সব মিলিয়ে যেটা হয় সেটা হচ্ছে ‘জবড়জং দশা’। কিন্তু নিশ্চয়ই আপনি নিশ্চয়ই বিশেষ দিনের মেকাপের জন্য কতদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন, টাকা খরচও করেছেন অনেক। এরপরে এমন একটা রেজাল্ট কি আপনার কাম্য? অবশ্যই না।  আর এইজন্যই আপনার দেহের অন্যান্য অংশেও আপনাকে একটু মনোযোগ দিতেই হবে। আর খুব কম খরচে কীভাবে সেই বিষয়টা সেরে ফেলবেন, জেনে নিন।

প্রস্তুতি

  • স্ক্রাবিং- স্কিনে যেন কোন ডেড সেল না থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
  • অবাঞ্ছিত লোম দূর করা- মসৃণ হাত পায়ের বেসিক হচ্ছে এটা। যারা ইন্টারেস্টেড নন তারা ভাববেন না আপনাকে জোর করা হচ্ছে। কিন্তু লোম রয়ে গেলে স্কিন কখনোই শাইনি এবং স্মুদ লাগবে না। সো আপনার সুন্দর ড্রেসকে শোকেস করতে অবশ্যই অবাঞ্ছিত লোম দূর করার ব্যবস্থা করবেন।
  • কোনভাবেই হেয়ার রিমুভাল ক্রিম ইউজ করবেন না।
  • বেস্ট উপায় হচ্ছে ওয়াক্সিং। ঘরে বসে নিজেই ওয়াক্স স্ট্রিপ কিনে নিতে পারেন। অথবা পার্লারে গিয়ে ওয়াক্স করতে পারেন।
  • শেভ করলে অবশ্যই ভালো ধার আছে এমন ব্লেড এবং শেভিং ক্রিম ইউজ করবেন। শেভিং ক্রিম না থাকলে হেয়ার কন্ডিশনার ইউজ করতে পারেন। অবশ্যই শেভ করার আগে স্কিন স্ক্রাব করে নেবেন।
  • প্রপার বডি স্কিন কেয়ার- কিছুদিন আগেই দুটি আর্টিকেল লিখেছি বডি স্কিন কেয়ারের উপর। “কীভাবে খুব দ্রুত ট্যান দূর করবেন” এবং “কীভাবে ৫০০ টাকার ভেতরেই সম্পুর্ণ বডি কেয়ার কমপ্লিট করবেন“। সেখানে বডি স্কিনের কেয়ার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

বডি মেকআপ, কীভাবে?   

সো ধরে নিচ্ছি আপনি সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছেন, এখন মেকাপের পালা। এই টপিককে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। বেইজ মেকাপ এবং হাইলাইট।

বেইজ মেকাপ 

ধরুন, হাতে একটু পুড়ে যাওয়া/ কেটে যাওয়া দাগ আছে। এঞ্জেজমেনট এর দিনে কিন্তু হাতের ক্লোজআপ ছবিই হবে ২০০-৩০০। সবগুলো ফটোশপে ক্লিন করবেন? অবশ্যই না! যেটা করবেন সেটা হল বেইজ মেকাপ। হাতের নিচের এবং উপরের অংশের রঙ ট্যান পড়ে আলাদা হয়ে গেলেও খুব সিম্পল লাইট কাভারেজের মেকআপ দিয়ে ঢেকে দিতে পারেন। কোন দাগছোপ বোঝা যাবে না।

প্রোডাক্ট সাজেশন-

  • স্যালি হানসেন এয়ার ব্রাশ লেগস (দাম প্রায় ২০০০ টাকার মতো, কিন্তু পরিমান খুবি কম, সো সে হিসেবে দামি প্রোডাক্ট, প্রফেশনাল শুটে ইউজ করা হয় এটা। হাতে পায়ে এবং বডিতে ইউজ করার জন্য তৈরি )
  • Mac face & body foundation (দাম ৩৬৯০ এর মতো, গলায় ঘাড়ে এবং কণ্ঠায় ইউজ করতে পারেন। কিন্তু দাম বেশি মানতেই হবে)
  • এছাড়া খুব গাঢ় দাগ কাভার করতে আপনাকে কনসিলার ইউজ করতে হবে।

কিন্তু খুব অল্প দামে কিভাবে একদিন বা দুদিন ইউজ করার জন্য একটা বডি মেকআপ এত দাম দিয়ে কেনা যায় তাই না? সেক্ষেত্রে কি করবেন?

খুব সহজ-

  • একটা বোতলে খুব স্মুদ ক্রিমি একটা বডি লোশন নিন। আমার ফেবারিট প্যারাসুট এডভান্সড ডিপ নরিশ লোশন।

(আগের আর্টিকেলগুলো  পড়লেই বুঝবেন আমি এটা একটু বেশি লাইক করি বলে এই প্রোডাক্টের প্রতি একটু বায়াজড। সব হোম রেমেডির জন্য কম দামে এর থেকে ভালো প্রোডাক্ট এখনও পাইনি। কেউ যদি আর ভালো কিছু জেনে থাকেন জানাবেন প্লিজ, ট্রাই করে দেখব… )    

  • এবার লোশনের সম পরিমান ফুল কাভারেজ ফাউনডেশন নিন (আমি  LA Girl Foundation ইউজ করেছি, কাভারেজ ভালো দাম কম। হাত পায়ে বেশি মাখার দরকার পড়লে গিলটি লাগে না ! )

ভালোভাবে মিক্স করে নিন। ব্যাস হয়ে গেল মিডিয়াম কাভারেজ বডি বেইজ মেকাপ। বিশেষ কোন দিনে অন স্পট নিজেই বানিয়ে নিতে পারেন। সময়ও লাগবে না। টাকাও এক্সট্রা খরচ হবে না।

বডি হাইলাইটার

পার্লারে পার্টি মেকাপে খুব বড় বড় কিছু গ্লিটার সারা গায়ে ছিটিয়ে দেয়। যা স্কিনের জন্যও খারাপ এবং কয়েকবার গোসল করলেও দূর করা অসম্ভব।কিন্তু হাইলাইটারের প্রপার ইউজই কিন্তু গ্লোয়ি-শাইনি স্কিনের মূলে! এবং ইউজ করবেন এমন কিছু যেটা শিমারি, গ্লিটার নয়! এতে ন্যাচারালি আপনার স্কিন সুন্দর লাগবে। উপরের ছবি দুটোর তফাৎ দেখলেই বুঝবেন।

প্রোডাক্ট সাজেশন- charlotte tilbury supermodel slimming body highlighter . দাম? প্রায় ৫০০০! কারণ এটাই মার্কেটের বেস্ট প্রোডাক্ট।

জানিয়ে দেই কীভাবে বানাবেন কমদামি সাবস্টিটিউট ।

  • আবার একটা জারে খুব অল্প প্যারাসুট অ্যাডভান্সড বডি লোশন নিয়ে নিন। ৩-৪ চামচ হলেই যথেষ্ট।
  • সাথে নিন একটা ফেস হাইলাইটার (পাউডার)। আমি elf/ makeup revolution highlighter ইউজ করি। এদের দাম ৫০০ টাকার মতো কিন্তু খুব স্মুদ শিমার। সাথে বেশ চড়া হাইলাইট। কম দামে এর থেকে ভালো প্রোডাক্ট আমার চোখে পড়েনি। প্যারাসুট লোশনে এই দুটো ব্রান্ডই খুব ভালো ব্লেন্ড হয়। লোশনের সমপরিমান হাইলাইটার নেবেন।

খুব ভালোভাবে মিক্স করে নিলেই আপনার বডি হাইলাইট তৈরি! কেউ যদি বেইজ মেকাপ ইউজ না করতে চান তবে তাকে বলব হাইলাইটটা ট্রাই করার জন্য। স্মুদ হাতে পায়ে একটু নিজের তৈরি হাইলাইটার মাখিয়ে নিলেই দেখবেন একটু আলতে গেলে স্কিন কতটা শাইনি গ্লোয়ি কিন্তু ন্যাচার লাগে! এমনকি ডেইলি ইউজের জন্য হাতের ঠিক মাঝ বরাবর আর কলার বোনের উপরে একটু হাইলাইটার মেখে নিতে পারেন। মনে হবে আপনার স্কিন মাখনের মত মসৃণ ! সাথে সাথে কলার বোন হাইলাইট করার কারণে আপনাকে স্লিমও দেখাবে অনেকটা!

ঠিক ছবির মতো করে হাইলাইট করবেন। বডি মেকআপের আগের এবং পরের তফাৎ দেখছেন?

মনে হচ্ছে না যে মডেলের ওজন ১০-১৫ কেজি কমে গেছে? এটাই মেকআপের ট্রিক!

কি? যাদের মনে প্রশ্ন ছিল কেন সেলেবদের স্কিন এত শাইনি, আমাদের কেন অমন নয়? উত্তর পেয়েছেন?

এ ধরণের আর কোন প্রশ্ন থাকলে আমাদের অবশ্যই জানাবেন। ইজি সলিউশন জানানোর ট্রাই করব।

ছবি – পিন্টারেস্ট ডট কম গট, সেলেব ডট কম

লিখেছেন – তাবাসসুম মীম