ত্বকের যত্ন, সম্পাদকের পছন্দ, সৌন্দর্য পরামর্শ

ব্রণে বারবারই হাত চলে যাচ্ছে!

ইশ!! ওইতো একটু পুঁজ দেখা যাচ্ছে… আজকে একটু চাপ দিয়ে দেখি না ওটুকু বের করে ফেলা যায় কিনা! তাহলেই তো ব্রণটা শুকিয়ে যায়!

বেশ দুই হাতের মধ্যমা দিয়ে কষে টিপে পুঁজটুকু বের করার চেষ্টা করলেন, বের হল না… মনে মনে ভাবলেন- “এখনও পাকেনি! আচ্ছা কাল আবার দেখব… “ততক্ষণে আপনার চক্ষুসুল ব্রণটার আশেপাশের ১ ইঞ্চি যায়গা হাতের চাপে ফুলে লাল হয়ে আছে…

কিন্তু এসব ভাবার সময় কোথায়? কালকে আবার আয়নায় চোখ গেলেই মাথায় একই মন্ত্র বাজতে শুরু করবে তাই না?

“একটুই তো পুঁজ, দেখিনা একটা চাপ দিয়ে! কিই বা আর হবে”

কি? এই ঘটনাচক্র খুব পরিচিত লাগছে? লাগারই কথা, একইসাথে পড়তেও অনেকের ঘৃণা লাগতে পারে কিন্তু ব্রণে কোনভাবেই চাপ দেয়া/ প্রেস করা যাবে না জানা সত্ত্বেও ১৫-৩৫ এর যেকোনো নারী পুরুষই সাজগোজ ইনবক্সে একই উত্তর দেন- হ্যাঁ, একটু তো ব্রণ প্রেস করি!!

আর মজার ব্যাপারটা কি জানেন? এরা সবাই ইনবক্সে একই প্রশ্ন করেন –

ব্রণের দাগ যাবে কিভাবে একটু বলুন প্লিজ…

সমস্যার একটু ভেতরে গেলেই এদের বদভ্যাসটা বেড়িয়ে আসে।

প্রথমত, আজকে ব্রণে একটা চাপ দিলে তার ফলাফলে ১-২ বছর মেয়াদী একটা দাগ মুখে পড়ে যেতে পারে এই ধরণের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি বা মেধা সবার থাকে না। এটা মেনেই নিতে হবে। কিন্তু ভবিষ্যতের চিন্তা না করা যেমন এক ধরণের বোকামির উদাহরণ তেমনি ব্রণে হাত দিলে কি হবে সেটা জেনে বুঝেও যারা নিজের বদভ্যাস দূর করার চেষ্টা করেন না সেটা আবার আরেক ধরণের বোকামি। চিন্তা করেই দেখুন, সিগারেট ক্যান্সারের প্রধান একটি কারণ জানা সত্ত্বেও অনেক বোকারাই তো মনের আনন্দে পথে ঘাঁটে একশলা ধরিয়ে ফুঁকতে ফুঁকতে হাঁটেন তাই না? বোকামি আর ওভারকনফিডেন্সের এই উদাহরণের তুলনায় ব্রণে বার বার হাত চলে যাওয়ার অভ্যাস তো তেমন কিছুই না!

কিন্তু কেউ যদি চান নিজের বদভ্যাসটা কনট্রোল করতে তবে আজকের লেখাটা আপনাকে একটু হলেও হেল্প করবে-

  • ব্রণ প্রেস করার সাথে দাগের সম্পর্ক কি?

– ব্রণে প্রয়োজনের থেকে বেশি প্রেসার দিলে ব্রণের আশেপাশের সেনসিটিভ নরম ফেসিয়াল স্কিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক কোষ মারাও যেতে পারে।

– স্কিনে ফুটো হয়ে যেতে পারে এবং কেটে যেতে পারে

– যে ইনফেকশন বা পুঁজকে সহ্য করতে না পেরে এতো ফন্দি করে ব্রণে হাত দিলেন, আপনার সেন্সলেস প্রেসারে সেই ইনফেকশন স্কিনের বাইরে না এসে আরও গভীরে চলে যেতে পারে!

এই ঘটনাগুলোর ফলাফল হিসেবে, আপনার ত্বকের ওই অংশেই বার বার ইনফেকশন হয়ে একের পর ব্রণ উঠতেই থাকে, বা যাকে একটু এক্সট্রাকট করলে কালকেই শুকিয়ে যাবে ভেবেছিলেন, সেই ব্রণ লাল হয়ে ফুলে ফোঁড়ার আকার ধারণ করে, সাথে থাকে আরও চুলকানি, আরও রেডনেস, আরও বড় একটা বাম্প।

আর যদি টিপে স্কিন ছিঁড়ে ফেলেন? শরীরের নরমাল ইমিউন সিস্টেম ওই ছেড়া অংশে মেলানিন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, স্কিন মোটা করে ফেলে। ফুটো হওয়া অংশ যাতে বাইরে থেকে অন্য জীবাণু ঢুকতে না দেয় তা নিশ্চিত করে। এরপর ওই এলাকায় অনেক কোলাজেন সেন্ড করে দেয়। যাতে ছেঁড়া অংশ দ্রুত জোড়া লেগে যায়। কিছুদিন পর ওই ছেড়া স্কিন ঠিক হয় ঠিকই, কিন্তু? মেলানিন উৎপাদনের ফলে ডার্ক হয়ে যাওয়া স্কিনটাকে বডি আর ঠিক করে না। কারণ আপনার বোকামির খেসারত হিসেবে করা নিজের এই কাজটাকে সে ড্যামেজ হিসেবে মার্ক করেনি। সো একটু ফুলে কালো হয়ে যাওয়া যায়গাটা পার্মানেন্টলি অমনটাই থেকে যায়।

আর এটাই হচ্ছে ব্রণের দাগ।

বুঝতেই পারছেন, নিজেকে ‘এত্তগুলা’ বুদ্ধিমান মনে করে খুব একটা সুবিধা আপনি করতে পারবেন না। অনেকের জন্য আবার ব্রণ, হোয়াইট হেড খোঁটা অনেকটা স্ট্রেস রিলিভের কাজ করে। যেমন অনেকে নখ কামড়ায়, ঠিক তেমন! কিন্তু কারণ যাই হোক না কেনও রেজাল্ট একই, একটি পার্মানেন্ট দাগ যা বছরের পর বছর মুখের উপরে থাকবে। আর আপনাকে আপনার বোকামির কথা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেবে।

‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ এটা লিখতে লিখতে আমি ক্লান্ত। সো সেদিকে আরও বেশি কথা না বাড়িয়ে আসুন জেনে নিই, ব্রণে খোঁটাখুঁটি বন্ধ করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা আপনার থাকলে কিভাবে সেদিকে আগাবেন-

  • প্রথমত, ব্রণ/একনে স্টিক নামক যে অদ্ভুত জিনিসগুলো পাওয়া যায় সেসবের কাছ থেকে ১০০ হাত দূরে থাকুন। নিজে তো ইউজ করবেনই না, পার্লারে গিয়ে এটা সেটা যাই করান না কেনও, এই যন্ত্র যেন আপনার স্কিন না ছোঁয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। বাসায় এগুলো থাকলে এখনি ছুঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলুন।
  • ব্যক্তিগতভাবে যত বেশি লাল ফুলে থাকা ব্রণের দিকে চোখ যায় ততই মুখে হাত দিতে ইচ্ছা করে বলে আমার মনে হয়, সো হঠাৎ ব্রেকআউট হলে বার বার আয়নায় গিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকাটা কমান। এই ধরণেরর অসুস্থ অভ্যাসের নেক্সট স্টেপ হচ্ছে ব্রণ এক্সট্রাকট করার মতো সেলফ হার্ম।
  • শুনতে চিজি লাগলেও, আয়নায় একটা কাগজে “ব্রণে হাত দেয়া যাবে না” লিখে লাগিয়ে রাখুন । আই মিন, আপনার বয়স ৩৫-৪০, এতদিন ধরে কোনভাবেই বদভ্যাস কমাতে পারেননি, এটায় যদি একটু সেন্স ফিরে পান, সমস্যা কোথায়? রাইট?

এইতো গেল কিছু সাইকোলজিক্যাল স্টেপস, এখন আসি ব্রণেরর রেডনেস, ফোলা ভাব, চুলকানি কীভাবে কমাবেন, সেই দিকে। আফটার অল, এসবের জন্যই অনেকে মুখে হাত দিয়ে ফেলেন বারবার। দীর্ঘদিন ধরে ব্রণে ভুগেছি আমি, নিচের কাজগুলো আমাকে মুখে হাত দেয়া থেকে দূরে রাখতে অনেক হেল্প করেছে-

  • ব্রণ উঠছে টের পাবার সাথে সাথে যেটা করবেন সেটা হল পরিষ্কার পানি দিয়ে বানানো বরফ মুখে বুলানো। দেখবেন রেফ্রিজারেটর এ বরফ যেন মাছ মাংস রক্তের পাশেই পড়ে না থাকে। যতটা পরিষ্কার রাখা যায় রাখবেন। দিনে যতবার টের পাবেন ব্রণের যায়গাটা গরম হয়ে লাল হয়ে উঠছে ততবার আইস কিউব ইউজ করবেন। এতে ইমেডিয়েটলি ব্রণের চুলকানি, ইনফ্লেমেশন কমবে।
  • হাতের কাছে মুলতানি মাটি আর টি ট্রি ওয়েল রাখবেন। বাইরে ঘোরাঘুরি করলে একটিভ একনে লালচে হয়ে ফুলে উঠতে থাকে। আমি বাসায় এসেই তাই এক চা চামচ মুলতানি মাটির সাথে ২-৩ ফোঁটা বডিশপ টি ট্রি ওয়েল মিশিয়ে ব্রণের উপরে লাগিয়ে রাখি। এতে খুব দ্রুত ব্রণের ফোলা ভাব কমে যায়। রোজ একবার শুধু ব্রণের উপরে এটা করলেও ত্বকের ইনফ্লেমেশন কমবে।
  • এছাড়াও যাদের ব্রণের সমস্যা আর বার বার মুখে হাত দেয়া, চুলকানো বা ব্রণ চাপাচাপি করার বদভ্যাস আছে তারা সবসময় হাতের কাছে কোন একটা স্পট ট্রিটমেন্ট রাখবেন। রোজ রাতে মুখ ধুয়ে স্কিন কেয়ার রুটিনের লাস্ট স্টেপ হিসেবে মুখের সব ব্রণ, হোয়াইট হেডস এ অবশ্যই স্পট ট্রিটমেন্ট লাগাবেন। সকালে উঠে মুখ ধুয়ে ফেলবেন। অতি দ্রুত ব্রণ শুকিয়ে ফেলতে স্পট ট্রিটমেন্টের কোন বিকল্প নেই। এগুলো ব্রণটা ঢেকে ফেলে আর চুলকানি কমিয়ে দেয় বলে যখন তখন নখ দিয়ে ব্রণ খোঁটার প্রকোপ কমে যায়।

আমার খুব পছন্দের কিছু স্পট ট্রিটমেন্টের নাম দিয়ে দিলাম-

  1. Cosrx acne pimple master patch

কোরিয়ান একটি প্রোডাক্ট। এতি একটি একনে প্যাচ যা ব্রণের উপরে স্টীকারের মতো লাগিয়ে রাখা যায়। যেকোনো সাইজের ব্রণের উপরে ভালো কাজ করে। ক্যারি করাটাও ইজি। এক পাতার দাম প্রায় ৩০০-৪০০ টাকা। শপ.সাজগোজ.কম-এ পেতে পারেন। এছাড়াও যে কোন কে-বিউটি সেলারের কাছেও খোঁজ নিতে পারেন।

     2. Mario Badescu Drying Lotion 17$

কালট স্ট্যাটাস পাওয়া প্রোডাক্ট। মডেল, অভিনেত্রী সবাই এটা ইউজ করেই বলতে গেলে। দাম ২০০০ টাকার মতো পড়বে (১৭$)। সেফোরা/ আলটা থেকে প্রি অর্ডার করতে পারেন। ইউজ করা ইজি এবং অনেকদিন চলে বলে এটা আমি অনেককেই সাজেসট করি। রেজাল্টও খুব ভালো ।

      3. Proactive Emergency Blemish Relief

জেল ফর্মুলা। দাম প্রায় ৩৫০০ এর মতো। বাট খুব কুইকলি ছোট ব্রণ বা ইনফ্লেমেশন, চুলকানি দাগবিহীনভাবে শুকিয়ে ফেলে। আলটা, বিউটিলিশ বা প্রোএকটিভ ওয়েবসাইট থেকে প্রি অর্ডার করতে পারেন।

      4. CLEAN & CLEAR Active Clear Speed Clearing Gel

একটু বাজেটে ভালো প্রোডাক্ট। যেকোনো জনসন এন্ড জনসন কাউনটারে পাবেন। দাম ৪০০-৫০০। ব্রণের উপরে খুব ভালো কাজ করে তা বলব না। বাট চুলকানি রেডনেস কমাতে হেল্প করে। মুখে হাতটা যায় কম এজন্য।

     5. Kate Somerville EradiKate Acne Treatment

বিখ্যাত কেট সামারভিল ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট। ব্রণের উপরে খুবি ভালো কাজ করে। স্কিন শুকিয়ে ফেলে না। ব্রনের দাগ যেন না পড়ে সেটাও দেখে। প্রাইস প্রায় ২৬$ বা ৩০০০ টাকার আশে পাশে। সেফোরা বা আলটা থেকে প্রি অর্ডার করতে পারেন ট্রাই করতে চাইলে।

ব্রণে হাত দিয়ে খোঁটাখুঁটি করাটা বা ‘দ্রুত শুকানোর’ অজুহাতে এটা সেটা দিয়ে চামড়া ফুটো করে ফেলাটা একটা

অপ্রয়োজনীয় বদভ্যাস ছাড়া আর কিছুই নয়। সো আপনি যা করছেন এতে আপনার ছাড়া আর কারো ক্ষতি হচ্ছে না এটা মেনে নিন। নিয়ে নিজের সঠিক কেয়ারটা নেয়া শুরু করুন। যারা প্রাপ্তবয়স্ক আপনার ছেলে মেয়ে/ ছোট ভাই বোনকে এসব করতে নিষেধ করুন। আর আপনার নিজেরই এই অভ্যাস থাকলে সেটা কনট্রোলে আনার উপায় তো দেখলেন, এগুলো ফলো করুন।

লিখেছেন – তাবাসসুম মীম

 

 

Comments

comments

Recommended