ত্বকের যত্ন, সম্পাদকের পছন্দ

মাইক্রোডারমাবরেশন: যা জানা দরকার

আমাদের সমাজে এই ‘মাইক্রোডারমাবরেশন’ শব্দটি খুব নতুন শোনা যাচ্ছে আজকাল কিছু পার্লারের কল্যাণে। বলিরেখা, ত্বকের দাগ, গর্ত, কালচে ছাপ সব কিছুর বিরুদ্ধে একে ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে দেখাচ্ছে কেউ কেউ। আর আমরা যেহেতু ডাক্তারকে ৫০০ টাকা ভিজিট দেয়ার কথা শুনে ১০ বার পার্স চেক করি, দোনোমোনো করি কিন্তু মাসে মাসে পার্লারে ২০০০ টাকা দিয়ে ‘ফেসিয়াল’ ‘ম্যাসাজ’ করাতে বেশ ‘সেইফ’ ফিল করি!! এই ধরণের সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং পোস্ট দেখে আমাদের লোভ সামলানো যে দায় হয়ে পড়েছে তা বলাই বাহুল্য…

তো ঠিক করলাম, এই ‘মাইক্রোডারমাবরেশন’ সম্পর্কে খুব বেসিক কিছু তথ্য আজ জানাবো। যা একজন কিওরিয়াস ক্লায়েন্ট হিসেবে আপনার জানা উচিৎ, স্পেশালি যদি আপনি এই প্রসেস সম্পর্কে ইন্টারেস্টেড হন।

মাইক্রোডারমাবরেশন আসলে কী?

বেশ পুরনো টেকনোলজি। এর মেইন কনসেপ্ট হচ্ছে শিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষে রুক্ষ কাঠ যেমন স্মুথ করা হয় ঠিক তেমন। খুব ছোট ছোট ক্রিস্টালের টুকরো দিয়ে ঘষে আপনার ত্বকের উপরের স্তরের ডেড সেলের লেয়ার সম্পূর্ণ তুলে দেয়া হবে। এতে আপনার স্কিনের ন্যাচারাল রিজেনারেটিভ প্রক্রিয়া সচল হবে। ত্বকের ড্যামেজড অংশগুলো ঠিক হতে শুরু করবে। ত্বকের ম্যাক্সিমাম এক্সফোলিয়েশন করা হবে। টেকনিক্যালি ত্বকের উপরের stratum corneum লেয়ারকে একটু ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে যাতে ত্বকের ডিপ ব্যাসাল লেয়ার এই অংশ সারাতে দ্রুত কাজ করে এবং একই সাথে এক্সিসটিং দাগ, ফাইন লাইন সারিয়ে তোলে।

এই প্রসেসে কোন পেইন বা অফিশিয়াল ডাউনটাইম নেই।

মাইক্রোডারমাবরেশনের প্রফেশনাল মেশিন দেখতে এ ধরণের-

কলমের মতো অংশটি দিয়ে খুব কনট্রোলড ভাবে আপনার স্কিনের একেক অংশে একবার স্ক্রাব করা হবে। এই পেনের ভ্যাকুম >আপনার উঠে আসা ডেড সেলের লেয়ার শুষে নিয়ে জমা করবে।

এছাড়া ঘরে নিজে এই ট্রিটমেন্ট করার জন্য আজকাল অ্যাট হোম হ্যান্ডহেলড মেশিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পপুলার এবং সবচেয়ে ভালো রিভিউ নিচের প্রোডাক্টটির। এর নাম PMD (personal microdermabrasion device) । এই প্রোডাক্টের দাম ২০০০০ টাকা বা এর উপরে এবং প্রতি ২-৩ মাসে ২৫০০-৩০০০ টাকার নতুন ক্রিস্টাল ডিস্ক (ছবিতে দেখানো) কিনতে হবে এটা রেগুলার ইউজ করার জন্য।

ডাক্তার নিজে আপনার স্কিন সেনসিটিভিটি বুঝে আলাদা আলাদা শক্তির ডিস্ক প্রফেশনাল মেশিনে ইউজ করেন। এই অ্যাট হোম মেশিন আপনাকে এমন কিছু অপশন দিয়ে দেয়। সেখান থেকে নিজের ত্বকের ধরণ বুঝে কোন লেয়ারের এক্সফোলিয়েশন ডিস্ক আপনি কিনবেন সেটা আপনাকেই ডিসাইড করতে হবে। কিন্তু বলাই বাহুল্য অ্যাট হোম মেশিন প্রফেশনাল ট্রিটমেন্টের মতো কম সময়ে রেজাল্ট দেবে না কারণ এসব অপেক্ষাকৃত উইক। আবার একটু অসাবধানতায় বড় দুর্ঘটনা ঘটার চান্সও থেকে যাবে।

মাইক্রোডারমাবরেশন সার্ভিস কারা প্রোভাইড করেন?

ডারমাটলোজিস্ট, এ ধরণের সার্ভিস প্রোভাইড করার জন্য ট্রেইনড ও সার্টিফাইড এসথেটিশিয়ান এবং কসমেটিক সার্জনরা লিগ্যালি এই সার্ভিস প্রোভাইড করতে পারেন।

সো, জেনে রাখুন কার কাছ থেকে এ ধরণের সার্ভিস কোনভাবেই নেবার চেষ্টা করবেন না-

এক পার্লারে একটি মেশিন আছে, সেটা পার্লারের কর্মীরা (অর্থাৎ যাদের এই মেশিন অপারেট করার সার্টিফিকেট নেই) তারা ইউজ করে ক্লায়েন্টের স্কিনে। এমন কোথাও অথবা এমন কোন পার্লার কর্মীকে আপনার স্কিনে মাইক্রোডারমাবরেশন করতে দেবেন না।

অবশ্যই সার্টিফিকেট ধারী কেউ যেন আপনার স্কিনে হাত দেয় সেটা নিশ্চিত করবেন। দরকার হলে দেখতে চাইবেন তার ক্রিডেনশিয়াল। আপনি টাকা দিচ্ছেন, স্কিনের রিস্ক নিচ্ছেন। আপনার এই অধিকার আছে।

মাইক্রোডারমাবরেশন করানোর আগে যা জানতে হবে-

– অবশ্যই অবশ্যই ‘মাইক্রোডারমাবরেশন’ করাবে এটা ঠিক করার আগে ডারমাটোলজিস্টের কনসালটেশন নেবেন। এটা একটা নন সার্জিকাল প্রসিডিওর। কোন অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেলে সেটার রেজাল্টে ডাক্তার না দেখিয়ে যে কটা টাকা বাঁচালেন তার ১০ গুন বেড়িয়ে যাবে।

– ডাক্তার বলবে আপনার স্কিনে এই প্রসিডিওর করানো ঠিক হবে কিনা। অন্য কেউ নয়।

– আপনার কারেন্ট স্কিনকেয়ার রুটিনে যদি কোন এসিড, রেটিনল, ট্রেটিন এ থাকে। সেটা অবশ্যই ডাক্তার অথবা আপনার এসথেটিশিয়ান কে জানাবেন। না জানালে ওভার এক্সফোলিয়েশনে স্কিনে পার্মানেন্ট ডার্ক স্পট পড়তে পারে। স্কিনে ভয়াবহ সানবার্ন হতে পারে।

– অবশ্যই এই ট্রিটমেন্ট করানোর আগে রেগুলার সানস্ক্রিন ইউজ করার হ্যাবিট তৈরি করবেন। স্কিনের উপরের লেয়ার উঠে যাওয়ায় স্কিন অতিরিক্ত সান সেনসিটিভ হবে। তার প্রটেকশনের জন্য ম্যাক্সিমাম সান কেয়ার দরকার।

– যেকোন এসিড ট্রিটমেন্ট/ প্রোডাক্ট মাইক্রোডারমাবরেশনের ১ সপ্তাহ আগে বন্ধ করে দেবেন।

– আপনার স্পেসিফিক প্রব্লেম (ব্রণের দাগ/ ফাইন লাইন) এ ইমেডিয়েট রেজাল্ট দেখতে কতদিন পরপর কতটা সেশন করতে হবে সেটা ডাক্তার আপনাকে জানাবে। রেজাল্ট, সেশন ক্লায়েন্ট ভেদে আলাদা হবে।

– মাইক্রোডারমাবরেশনের পরের কয়েকদিন সূর্যের আলো একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে। এরপর থেকে বাইরে গেলে ঐ যে! সানস্ক্রিনের কথা কোনভাবেই ভোলা যাবে না।

মাইক্রোডারমাবরেশন কার জন্য ?

১৮+ বয়সের যে কেউ ডাক্তারের পরামর্শে নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য মাইক্রোডারমাবরেশন করতে পারে। বাংলাদেশে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা অনেক বছর ধরেই এই নামে/ ডায়মন্ড পিল নামে মাইক্রোডারমাবরেশন প্র্যাকটিস করে আসছেন। বয়সভেদে ত্বকের ব্রণ, ব্রণের দাগ, গর্ত, ডার্ক প্যাচ এসবের জন্য ১৮-২৫ বছর বয়সীদের এই ট্রিটমেন্ট সাজেস্ট করা হয়।

৩০ আপ দের স্কিনে ফ্রেকলস, মেছতা, ফাই লাইন, রিঙ্কেল কনট্রোলে রাখতে এর কার্যকারিতা বেশ। তাই কসমেটিক রিজনে বা স্কিনের হেলথ বজায় রাখতে এই বয়সের নারী পুরুষ মাইক্রোডারমাবরেশন করালে বেস্ট রেজাল্ট পান। বয়স বাড়লে স্কিনের স্বাভাবিক রিজেনারেশন ক্ষমতা কমে গেলে, এই প্রসিডিওর বেশ হেল্প করে।

আর কার জন্য নয়?

স্কিন অতিরিক্ত সেনসিটিভ হলে, রোসেশিয়া, একজিমা, সানবার্ন থাকলে বা এক্সসেসিভ একটিভ একনে থাকলে তাদের সাধারনত মাইক্রোডারমাবরেশন থেকে দূরে থাকা উচিৎ।

খরচের হিসাব!

বাংলাদেশে যেকোন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা স্কিন ক্লিনিক এই প্রসিডিওর করায় । দাম শুরু হয় পার সেশন অনলি ফেইসের জন্য প্রায় ৫০০ টাকা থেকে। জায়গা ভেদে, প্রব্লেম ও সার্ভিস ভেদে আপনাকে পার সেশন ফেইস ও নেক ২০০০ এর মতো পে করতে হতে পারে।

সাধারণত কোন প্রব্লেমের জন্য ক্লায়েন্ট ভেদে ৪-৮ সপ্তাহে একটা সেশন নিতে বলা হয়।

শেষ কথা হচ্ছে, এটা বেশ কস্টলি একটা ট্রিটমেন্ট এবং এটায় একটু হলেও রিস্ক আছে। কিন্তু সঠিক জায়গায় সঠিক লোক সঠিকভাবে করলে এবং আপনি কোন বিশাল বোকামি না করলে অবশ্যই সেফলি সাইড ইফেক্ট ছাড়া রেজাল্ট পাবেন। সো যাই করবেন, যেখানে করবেন, চিন্তা করে ধৈর্য ধরে করবেন।

ছবি – ওমেনফিটনেস ডট নেট

লিখেছেন – তাবাসসুম মীম

Comments

comments

Recommended