খাদ্য ও স্বাস্থ্য, সম্পাদকের পছন্দ, সুস্বাস্থ্য

সারাদিন ব্যস্ত! ডায়েটের সময় কই?

একজন চাকরিজীবী মহিলার জীবন একজন গৃহিণীর জীবনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ব্যাপারটি আমি বুঝতে পারি নিজে চাকরিতে জয়েন করার পর। আমাকে দিনের ১০ থেকে ১১ ঘন্টা বাসার বাইরে থাকতে হয়। তার উপর আমার কাজের জায়গা কিন্তু দুইটি। অফিস এবং নিজের বাসা। অফিস শেষে নিজের বাসাও সামলাতে হয় আমাকেই। শুরুর দিকে একটা সময় এতো কাজের প্রেসারে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ডাক্তার আমাকে জানান, অতিরিক্ত পরিশ্রম ও সঠিক ডায়েট প্ল্যানের অভাবে আমার শরীর অসম্ভব দূর্বল হয়ে পড়েছে। তখন তিনি আমাকে সারাদিনের একটি প্রপার ডায়েট প্ল্যান দেন।

আমার মতো এমন অবস্থা নিশ্চয় অনেক কর্মজীবি মহিলারই হয়। আমার নিজের পরিচিত অনেকজনেরই একই অবস্থা দেখেছি আমি। তাদেরকে যখন এই ডায়েট প্ল্যান ফলো করতে বললাম শুরুতে সবাই অবহেলা করলেও পরে তারাও আমার মতোই ভালো ফল পায়। তাই ভাবলাম আমার ডায়েট প্ল্যানে অনেক চাকরিজীবি মহিলারই উপকার হতে পারে। খুব কঠিন কিছু নয় কিন্তু। সামান্য নিয়ম মেনে খাবার খেলেই আপনি সারাদিনের কাজের পরও থাকবেন অ্যাক্টিভ। তাছাড়া শরীর ও মুখে বয়সের ছাপ ও পড়বে দেরিতে। নিচের টিপসগুলো মেনে চলুন-

(১) খাবারে সামঞ্জস্যতা রাখুন ও বৈচিত্র্য আনুন

একইরকমের খাবার যদি প্রতিদিন খাওয়া হয় তাহলে একঘেয়েমি ভাব চলে আসে। তাই আপনার ডায়েটে আনুন বৈচিত্র্যতা, সাথে খেয়াল রাখতে হবে ডায়েট যাতে ব্যালেন্সড হয়। যেহেতু মহিলাদের পুরুষের তুলনায় এনিমিয়া হওয়ার প্রবণতা বেশি, তাই প্রতিদিনের লাঞ্চে অবশ্যই একটি শাক বা সবজির আইটেম থাকতে হবে। এছাড়া একটি ফ্রেশ সালাদ ও ক্যালসিয়ামের জন্য যেকোন ডেইরি প্রোডাক্ট যেমন টকদই, পনির বা বাটারমিল্ক রাখুন আপনার ডায়েট চার্টে। অফিসে কাজ করেন মহিলারা প্রতিদিনের ডায়েটে নিচের গ্রুপগুলো থেকে খাবার বেছে নিন-

  • শাকসবজি ও ফলমূল
  • শস্য ও আঁশজাতীয় খাবার
  • লিগিউমস (শিম, মটর, ডাল ইত্যাদি)
  • মাছ, মাংস, ডিম
  • ফ্যাট ফ্রি মিল্ক
  • বিভিন্ন রকম তেল

(২) সকালের নাস্তা কখনও বাদ দেয়া যাবে না

বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে, সকালে যারা এক কাপ কফি খেয়ে কাজে বের হয়ে যায় তাদের তুলনায় যারা নাশতা করে কাজে যায় তারা সারাদিন কাজে সবচেয়ে ভালো পার্ফরমেন্স দেখান এবং সহজে ক্লান্ত হন না। অনেকে ওজন বেড়ে যাবে ভেবে সকালের নাশতা এড়িয়ে যান। কিন্তু এটি আপনার শরীরের মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে তাই ওজন বাড়ে না। সকালের এই নাশতা হতে হবে অবশ্যই শর্করা ও কিছু প্রোটিন যোগে। সাথে কোন ফল থাকলে ভিটামিন ও মিনারেলসের অভাবও পুর্ণ হবে।

  • ওটস, ব্রেড স্যান্ডউইচ, কর্ণফ্লেক্স ইত্যাদি
  • যেকোন একটি ফল
  • ১ কাপ দুধ

(৩) ঘরে তৈরি লাঞ্চ নিয়ে যান অফিসে

দুপুরের খাবারটি বাসা থেকেই তৈরি করে নিয়ে যান। অনেকেই যে কাজটি করেন অতিরিক্ত কাজের প্রেসারে দুপুরে বাইরে খেয়ে নেন। এতে ব্যালেন্সড ডায়েট তো হয়ই না, এমনকি শরীরে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি ও পূরণ হয় না। তাই একটু সময় বের করে দুপুরের খাবারটি ঘর থেকেই তৈরি করে নিয়ে যান।

  • লাল চালের ভাত/ এগ স্যান্ডউইচ/ চিকেন স্যান্ডউইচ/ পাস্তা
  • সবজি বা ফ্রুট সালাদ
  • ১ কাপ টক দই

(৪) অতিরিক্ত চা বা কফি পান করা কমিয়ে আনুন

অফিসে সাধারণত কফি মেকার বা চায়ের সুব্যবস্থা থাকায় সারাদিনে কয়েক কাপ চা খাওয়া হয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন আপনাকে ডিহাইড্রেটেড করে দেয় অর্থাৎ শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। তাই দিনে ২ কাপের বেশি চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন।

(৫) অফিসে জাঙ্ক ফুড খাওয়া বাদ দিন

অফিসে সাধারণত স্ন্যাক্স হিসেবে সবাই সিঙ্গারা-সমুচা, ভাজা-পোড়া এসব খেয়ে থাকেন। এতে কোনরকম পুষ্টিগুণ তো থাকেই না উল্টো কিছু অতিরিক্ত ফ্যাট হিসেবে আমাদের শরীরে জমা হয়। তাই এসব জাঙ্ক ফুড খাওয়ার পরিবর্তে যেকোন ফ্রেশ ফ্রুট, খেজুর, কাজুবাদাম, আমন্ড ইত্যাদি খেতে পারেন। আর গরমের সময় রসালো ফল যেমন কমলা, তরমুজ, আম, পাকা পেপে ইত্যাদি খেতে পারেন।

(৬) রাতের খাবার

অনেক চাকরিজীবী মহিলা ওজন বেড়ে যাবে এই ভয়ে রাতের খাবারটি বাদ দেন। কিন্তু ডায়েট মানেই না খেয়ে থাকা নয়। দুপুরের খাবারের মতো রাতেও একটি ব্যালেন্স ডায়েটের প্রয়োজন।

  • গমের রুটি/ ব্রেড/ ১ কাপ ভাত
  • ডাল/ চর্বিহীন মাংস এবং মাছ
  • সালাদ
  • ফল দিয়ে তৈরি ডেজার্ট

(৭) প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা

পানির অভাবে ডিহাইড্রেশন হয় যা আপনাকে করে তুলে দুর্বল ও অবসাদগ্রস্ত। তাই সবসময় সাথে পানির বোতল রাখুন। অফিস ডেস্কে এক বোতল পানি রাখুন। তাহলে কাজের অনেক চাপ থাকলেও ফাঁকে ফাঁকে পানি খাওয়া হবে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করুন।

(৮) ব্যায়াম করুন

আমাদের দেশের মহিলারা এক্সাইরসাইজ করাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। কিন্তু প্রতিদিনের এত স্ট্রেস ও কাজের প্রেসারের কারণে মহিলাদের দ্রুত বয়সের ছাপ চলে আসে, দুর্বল হয়ে যায় ও নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়। তাই শরীরকে অনেকদিন ফিট ও বয়স ধরে রাখতে প্রতিদিন অন্তত আধা ঘন্টা সময় বের করে ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেকোন রকম ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন।

সবসময় পরিবারের সবার খেয়াল রাখতে রাখতে আমরা ভুলে যাই আমাদের নিজেদেরও যত্নের প্রয়োজন আছে। সবার খাওয়ার পাশাপাশি নিজের শরীরকে ফিট রাখার জন্য কোন খাবারটি জরুরী, কীভাবে, কোন সময় খেতে হবে এইদিকেও একটু নজর দিন। আপনি নিজেই যদি সুস্থ না থাকেন পরিবারের অন্যদের যত্ন নিবেন কি করে?

রেসিপি – শাবনাজ বেনজীর

Comments

comments

Recommended