হেয়ার কালার করতে চাচ্ছেন? ওয়েইট!


নিজের লুকে একটা মডার্ন ফ্যাশনেবল আপডেট আনতে মেকআপ, আউটফিটের চেয়েও ইজি ওয়ে হচ্ছে নিজের চুলে একটা বড় চেঞ্জ নিয়ে আসা। আর আমরা চুলের লেন্থ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে একটু ভয়ই পাই আবার রিবনডিং অনেকের জন্য কস্টলি হয় একই সাথে এটা অনেক রিস্কি… তাই আজকাল সবাই হেয়ার কালারের দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছে অনেক বেশি।

কিন্তু প্রব্লেম হল, হেয়ার কালার মাত্র ৩০ মিনিট ১ ঘণ্টার মামলা, তাই সবাই আগে-পরে কি করবেন কীভাবে কালার অথবা নিজের চুলের হেলথ মেনটেন করবেন চিন্তা ভাবনা না করেই হঠাৎ একদিন ফেসবুকে পরিচিত একজনের চুলের কালার দেখে, আমারও এটা ‘করতেই’ হবে – ধরে নিয়ে পার্লারে চলে যাচ্ছেন। অনেকে আরও এককাঠি সরেস! রেগুলার চুলে তেল দেয়া, কন্ডিশনার দেয়ার অভ্যাস নেই এমন মানুষও কেনই যেন একবক্স হেয়ার কালার কিনে এনে নিজে নিজেই ঘরে বসে সেটা মেখে ফেলছেন।

ফলাফল কিন্তু একই, ২-৩ মাস পড়ে কড়া কমলা রঙের শনের মতো চুলের গোছা।

আর তাই আজ কথা বলব হেয়ার কালার করার আগে কি করতে হবে কীভাবে করতে হবে এবং কি এড়িয়ে চলবেন তাই নিয়ে। চলুন শুরু করি-

তো, হেয়ার কালার করবেন ঠিক করে ফেলেছেন। এখন কি করবেন?

  • প্রথমে নিজের চুলের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করুন। আবারো বলছি, রেগুলার হেয়ার অয়েল ইউজ করা, ঠিকভাবে শ্যাম্পু কন্ডিশন করার অভ্যাস থাকতে হবে। চুল পড়া অথবা স্কাল্পে ড্যানড্রাফ আছে কিনা দেখুন। চুল ফাটা থাকলে সেই ফাটা আগা আগেই ট্রিম করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনার চুলে কালারের ফলে যে ড্যামেজ হবে সেটা হ্যান্ডল করা এবং সেই ড্যামেজ কনট্রোল করতে যে পরিমাণে কেয়ার আপনাকে নিতে হবে সেটা করার ক্ষমতা এবং সময় আপনার আছে কিনা।
    মানে, হাতে সময় এই কিন্তু হঠাৎ একদিন শখ হয়েছে বলে চুলে ব্লণ্ড কালার করে বসে থাকবেন না প্লিজ। মাসের পর মাস তেল না দেয়া কালার করা শনের গোছা চুল কেটে ফেলা ছাড়া আর কোন জাদু মন্ত্র নেই! মনে রাখবেন প্লিজ।
  • কালার করার আগে চুলের ধরণ, কালার, কেমন লুক চাইছেন, কি ব্র্যান্ড ভালো সেগুলো যতটা সম্ভব জেনে নেবেন। অনেক পাঠক পাই, যারা চুলে রঙ করে ফেলেছেন, কিন্তু কি রঙ করেছেন সেটার নামই জানেন না। আপনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ।সো নিজের দায়িত্ব এবং নিজের কাজ কর্মের দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে।“পার্লার আমার চুল নষ্ট করেছে’ এই কথা বলে কান্নাকাটি আপনাকে আপনার চুল ফিরিয়ে দেবে না। জাস্ট আপনার আশেপাশের মানুষ বিরক্ত হবে। এটাই সত্যি।
  • নিজে কালার করার চেষ্টা করবেন নাকি পার্লারে যাবেন অনেক অনেক বার চিন্তা করে দেখুন। ডিসিশন নেয়ার জন্য থাম্বরুল ইউজ করতে পারেন।

    – যদি চুলে ব্লিচ না করেন এবং আপনার পছন্দের রঙ আপনার চুলের ন্যাচারাল কালার থেকে জাস্ট ২ শেড লাইটার হয় তাহলে আপনি নিজে বক্স কালার কিনে বাসায় রঙ করার রিস্ক নিতে পারেন।

    – চুলে একা একা হাইলাইট করার চেষ্টা করবেন না। ২-৩ শেড এর কালার করার মতো ব্যাপার আছে এমন কোন লুক নিজে নিজে করার চেষ্টা করবেন না। ঘরে বসে হাইলাইট, ওম্ব্রে, বালায়াজ ট্রাই করবেন না। ছোট একটা উদাহরণ দেখাই-

এটা ডার্ক ব্রাউন হেয়ারে গোল্ডেন হাইলাইটের একটা উদাহরণ। এখানে একটা বেস কালার করা হয়েছে, হাই লাইট এবং লো লাইট করে হেয়ারে ক্লায়েন্টের ফেস শেপ এবং হেয়ার লেন্থের সাথে মানাসই লুক দেয়া হয়েছে। একজন প্রফেশনাল এক্সপেরিয়েন্সড স্টাইলিস্ট এর কাজ এটা। আমরা অনেকেই ঝোঁকের বসে, কিই বা এটা? জাস্ট এক এক গোছা চুলে কালার, এর জন্য ৫০০০ টাকা দেব? এতো আমি ৪০০ টাকার রঙ আর ব্লিচ গাউছিয়া থেকে কিনেই করতে পারি!!

ভেবে নিয়ে শেষ মেষ নিচের ছবির জিনিসটা তৈরি করেন-

অনেক সময় পাড়ার পারলারেও ‘পার কাঠি ৫০ টাকা’ রেটে এই জিনিস করে দেয়। সাথে টিপস দিয়ে দেয়, এখন এরকম কিন্তু দেখবেন! কয়েকদিন পড়ে অনেক সুন্দর হবে!!

মাস যায় বছর যায়, পাঁটের আশ আর সুন্দর হয় না! উপরের ছবির মতো ‘হাইলাইট’ পথে ঘাটে আমরা দেখি, তাই না? কিন্তু প্রথম ছবির মতো হাইলাইট? কটা কাজ দেখেছেন এই লেভেলের?

৫-৬ বছরের কালারিং এক্সপেরিয়েন্স আর ‘আমি নিজেই পারি’ মনোভাবের মধ্যে ডিফারেন্স বুঝতে পারছেন?
কালার সিলেকশন-

  • নিজেই যদি চুলে মাহাগোনি/ ডার্ক চকোলেট/ বার্গান্ডি কালার করতে চান তবে মনে রাখবেন – বক্সের রঙ আর চুলে শেষমেশ যে রঙ আপনি দেখবেন তার ভেতরে অনেক তফাৎ থাকবে। একেজনের চুলে একই রঙ একেক রেজাল্ট দিতে পারে। সো আগেই একবক্স রং কিনে মাথায় মেখে না ফেলে ভেতরের ছোট একগোছা চুলে টেস্ট করে দেখুন ওই বক্সের রঙ চুলে কেমন আসছে? এটাই সেইফ পদ্ধতি নিজে রঙ করার।
  • যদি আপনি পুরো চুলে কালার করতে চান তবে নিজের চুলের ন্যাচারাল রঙ থেকে ২ শেডের বেশি লাইট কালার চুজ না করলেই ভালো করবেন। এতে চুলের ড্যামেজ কম হবে, ন্যাচারাল লাগবে এবং স্কিনটোনের সাথে ম্যাচ করবে। মনে রাখবেন, মেকআপ, প্রফেশনাল হেয়ারস্টাইলের সাথে দেখা হেয়ার কালার নরমাল ডে টু ডে লাইফে কমপ্লিটলি আলাদা দেখায়! সো ফেসবুকে মডেলের চুলের ছবি দেখে ওই রঙই করতে হবে এমনটা ধরে নেবেন না।

ন্যাচারল লুক আনার জন্য নিচের রঙগুলো বাঙালী স্কিন টোনে ভালো স্যুট করে-

এছারাও বিভিন্ন পার্লারের সোয়াচ বুক / ক্যাটালগ দেখে শুনে ফাইনাল ডিসিশন নিতে পারেন। হেয়ার কেয়ার, কালারের আগে:

  • তো, প্রথমেই সপ্তাহে ২-৩ বার তেল দিয়ে শ্যাম্পু করার হ্যাবিট তৈরি করতে হবে। যেদিন কালার করবেন তার ৩ দিন আগে হট অয়েল ট্রিটমেন্ট করবেন।
  • হট অয়েল ট্রিটমেন্ট যেদিন করবেন তার পরদিন অর্থাৎ কালার করার ২ দিন আগে চুল লাস্ট শ্যাম্পু করবেন। এতে চুলের ন্যাচারাল অয়েল চুলে ছড়িয়ে ইভেন কালার ডিস্ট্রিবিউশনে হেল্প করবে।
  • অবশ্যই এই শ্যাম্পু করতে হবে কোন ক্লারিফাইং শ্যাম্পু দিয়ে। এই ধরণের শ্যাম্পু চুলের অন্যান্য সিলিকন/ অয়েল / কালার বিল্ডআপ দূর করবে।
  • চুলে কোন কাট দেয়ার ইচ্ছা থাকলে সেটা আগে করে ফেলুন। কালার করার ২ মাস পড়ে যেন হঠাৎ চুল কাটার ইচ্ছা না হয়! এতে জটিল কালার লুকটা আর আপনার টাকাই নষ্ট হবে।
  • চুলের হেলথ ঠিক রাখার জন্য রিবনডিঙ করা চুলে ব্লিচ করবেন না। চুল রিবনডেড হলে যেকোনো মূল্যে ব্লিচ এভয়েড করুন।
  • স্টাইলিস্টরা বলেন রিবনডিঙ করার ১ বছরের ভেতরে কোন ধরনের কালার করা উচিৎ নয়। এতে চুলের আগের স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। সো এটা মনে রাখার চেষ্টা করুন।

এখন আসি মেহেদির কথায়। চুলের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে মেহেদি অনেকেই ইউজ করেন। অনেককেই দেখি চুলের মেহেদির কালার চলে যাওয়ার ধৈর্যটুকুও রাখতে পারেননা। ফলাফল, গোল্ডেন ব্লণ্ডের জায়গায় অরেঞ্জ কালারের চুল!

সো, ধৈর্য ধরুন। মেহেদি দেয়া চুলে কালার করার মিনিমাম ২ মাস আগে বন্ধ করুন এবং এর পর থেকে উইকলি ৩ বার শ্যাম্পু করুন। এতে পার্লার বা ঘরে যেখানেই কালার করুন না কেন সঠিক কালারটা চুলে আসবে।

সবশেষে, আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি, একটু ধৈর্য ধরে চিন্তা করুন আপনি কি চান , কীভাবে চান। আপনার কালারিস্টের সাথে কমিউনিকেট করুন। দরকার হলে ছবি দেখিয়ে তাদের মতামত নিন। আজ কালার করতে ইচ্ছা হয়েছে বলে কালকেই কালার করতে হবে এমন কোন কথা নেই। আপনি ও থাকবেন, আপনার কালারের বক্সও পালিয়ে যাবে না কিন্তু ধৈর্য না ধরলে চুলগুলো কিন্তু নাও থাকতে পারে… !

লিখেছেন – মীম তাবাসসুম