চুল, চুলের যত্ন, প্রসাধনী সম্পর্কে, সম্পাদকের পছন্দ

চুলের পরম বন্ধুই কি নীরব শত্রু?

চুলের যত্নে কত কিছুই না করছি। কখনো এই প্যাক তো কখনো ওই তেল ইত্যাদি। আচ্ছা… কাঙ্ক্ষিত ফল কি পাচ্ছেন? জানি বেশির ভাগ উত্তর আসবে ‘না’। তাহলে তো যেই ঘরোয়া উপায়গুলো শেয়ার করা হয়ে থাকে সবই অর্থহীন! যেকোনো চুল এবং স্কিনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বান্ধব হল প্রাকৃতিক উপাদান। ফল পেতে সময় লাগলেও সাইড অ্যাফেক্ট বা ক্ষতির সম্ভবনা খুবই কম বা নেই বললেই চলে। কিন্তু তারপরও চুলের কোন উন্নতি তো হচ্ছে না! তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা হল আপনার শ্যাম্পুতে।

হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। শ্যাম্পুতেই যত সমস্যা। খেয়াল করে থাকলে দেখবেন আমরা সব সময় বলে থাকি, শ্যাম্পু ব্যবহারের ক্ষেত্রে সালফেট বিহীন মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করতে। চুলকে সুন্দর করতে তেল,প্যাক যাই লাগালেন ধোয়ার সময় সাধারণ শ্যাম্পু ব্যবহারে চুলে যেই পুষ্টিটুকু পেয়েছিল তাও ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কাজেই প্রথম দুই দিন শ্যাম্পুর কৃত্রিমতা চুলে শাইন এনে দিতে পারলেও তৃতীয় দিনেই চুলকে আগের রাফ-ড্যামেজ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কারণ আর কিছুই না শ্যাম্পুতে বিদ্যমান সালফেট! এই সালফেট আসলে কি, কীভাবে চুলের ক্ষতি করছে এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে আজকের এই লেখা।

সহজে বলতে গেলে, সালফেট হল সালফার যা খনিজ লবণ দ্বারা তৈরি বেশ শক্তিশালী এবং “ডিটারজেন্ট বা পরিষ্কারক” এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় Sodium Lauryl Sulfate (SLS) and Sodium Laureth Sulfate (SLES)। এই সালফেট মূলত ময়লা পরিষ্কারক হিসেবে বেস্ট হওয়ায় ১৯৩০ দশক পর্যন্ত ফ্যাক্টরিতে ময়লা পরিষ্কারে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে, অন্যান্য পরিষ্কারকের তুলনায় সালফেট পাওয়ারফুল, কমদামী এবং সহজলভ্য হওয়ায় বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং ফলশ্রুতিতে বিউটি কেয়ার দুনিয়ায় যোগ করা হয়। প্রথমে সাবান এরপর চুলের সৌন্দর্যচর্চায় শ্যাম্পুতে ব্যবহার শুরু হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হল এতো পাওয়ারফুল একটি ক্যামিকেল পরিষ্কারক হিসেবে বেস্ট হলেও চুলের জন্য কতটুকু উপকারী?

এই প্রশ্নের জবাবে যাওয়ার আগে জেনে নেয়া যাক, সালফেট কীভাবে কাজ করে। সালফেটে থাকা সারফ্যাক্টেন্ট অনু; পানি এবং তেলের সংস্পর্শে এসে ইমালসিফাইয়ের মাধ্যমে ফোমের আকার ধারণ করে। মাথার ত্বক এবং চুল থেকে তেল এবং ময়লা ধুয়ে ফেলে। এতে করে চুলে বিদ্যমান প্রাকৃতিক তেলও ধুয়ে যায়। যার ফলে চুল অতিরিক্ত ড্রাই এবং ড্যামেজ হয়ে যায়।

এতটুকু পড়ে মনে হতে পারে এ আর এমন কি পরিষ্কার করতে গিয়ে রাফ হয়ে গেলে হেয়ার ময়েশ্চারাইজার দিয়ে পুষিয়ে নিব!! এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলে তো হয়েছিল তাহলে আর আজকে এতো কষ্ট করে লিখা কেন?

ইংরেজি Hidden Cost ‘হিডেন কস্ট’ শব্দটির সাথে পরিচয় আছে নিশ্চয়ই! আকর্ষণীয় মডেলের ঝলমলে চুল দেখেই কুপোকাত আমরা। একবারের জন্যেও খতিয়ে দেখি না টাকার সাথে সাথে সুস্থ চুলগুলোকে পরিষ্কারের জায়গায় হার্মফুল সস্তা ক্যামিকেলের ছোঁয়ায় প্রাণহীন করে তুলছি! এবার একটু বিশদাকারেই জানব কীভাবে সালফেটযুক্ত শ্যাম্পু চুলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে-

 

(১) সালফেট ময়লা পরিষ্কারের সাথে সাথে চুলে বিদ্যমান অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল পেপটাইডস, প্রোটিন কেড়ে নেয়। চুলের এইসব স্বাস্থ্য-সংরক্ষণের পদার্থ না থাকার ফলে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে। চুল তার প্রয়োজনীয় আদ্রতা হারায় এবং ক্ষতিকারক মাইক্রোবের সংস্পর্শে এসে অ্যালার্জি, সংক্রমণ এবং অসুস্থতা প্রবণ হয়ে পড়ে মানে দুর্বল হয়ে পড়ে।

(২) সালফেট চুল থেকে কিউটিকল আলাদা করে ফেলে। এই কিউটিকল মূলত চুলের উপরের শক্ত আবরণ যা চুলের আভ্যন্তরীণ কোষের উপরে কয়েকটি লেয়ারার মতো থাকে। এই কিউটিকল মূলত চুলের ভেতরের কোষগুলোকে বাইরের ক্ষতিকর জীবাণু থেকে রক্ষা করে। কিন্তু সালফেট চুলের কোষ থেকে কিউটিকলের স্তরকে আলাদা করে ফেলে ঠিক রুক্ষ ত্বকের ন্যায়। আদ্রতার সংস্পর্শে এলেই চুলে ফ্রিজিনেস চলে আসে এবং চুল ড্রাই হয়ে যায়। ছিড়ে ছিড়ে যাওয়া কিউটিকল এবং করটেক্স পুরো হেয়ার স্ট্রেন্ডকে দুর্বল করে ফেলে, যার ফলে চুল ড্যামেজ, আগা ফাটা এবং ভঙ্গুরতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

(৩) সালফেটের কারণে চুল শুকাতে অনেক সময় লাগে। চুলের প্রতিরক্ষা বেষ্টনী, কিউটিকল আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে চুলের আভ্যন্তরীণ কোষ অতিরিক্ত আদ্রতা শুষে নেয়। যার ফলে চুল আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় নেয় শুকাতে।

(৪) সালফেটের নিজস্ব নেগেটিভ ইলেকট্রিক চার্জ রয়েছে- যা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলার পরেও চুলে এবং মাথার ত্বকে থেকে যায়। যার ফলে চুলে ডালনেসের সাথে সাথে এলোমেলো-ভাব চলে আসে। চুলের এই বেহাল দশা ঢাকতে সিনথেটিক সিলিকন বেজড কন্ডিশনার (আরও ক্যামিকেল)’এর প্রলেপ কেবলই আর্টিফিশিয়াল লুক এনে দিবে চুলকে ভেতর থেকে সুস্থ করে তুলতে পারবে না।

(৫) সালফেট স্ক্যাল্পে চুলকানি সমস্যা তৈরি করে। যেহেতু সালফেট স্কাল্পের ন্যাচারাল লিপিডগুলোকে আলাদা করে দেয়া সেহেতু কোষের ওয়াটার ব্যারিয়ারও দুর্বল হয়ে পড়ে। যার ফলে প্রোডাক্টের কেমিক্যাল ত্বকের প্রথম লেয়ারে খুব সহজেই প্রবেশ করে ফাঙ্গাস তৈরিতে সাহায্য করে। এর সাথে সাথে পরের স্তরগুলো ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সহজেই আক্রান্ত হয়।

(৬) সালফেট চুলের গ্রন্থিকোষে চাপ ফেলে। লিপিড ক্যাপ নামে একটি প্রতিরক্ষা বেষ্টনী দ্বারা প্রতিটা চুলের গ্রন্থিকোষ আবৃত থাকে। সালফেট এই প্রতিরক্ষা বেষ্টনীকে অপসারণ করে যার ফলে ভালো মাইক্রোবায়োটা অক্সিজেনের সংস্পর্শে মারা যায় এবং খারাপ ব্যাকটেরিয়া প্রতিরক্ষা বেষ্টনী বিহীন দুর্বল গ্রন্থিকোষে অ্যাটাক করতে পারে।

এই সালফেটযুক্ত শ্যাম্পুর প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে যাচ্ছি আমরা! কাজেই বুঝতে পারছেন নিছক ব্যবসায়িক লাভের আশায় এই পাওয়ারফুল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিটারজেন্টকে শ্যাম্পুসহ বিবিধ বিউটি কেয়ার প্রোডাক্টে ব্যবহার করা হচ্ছে!

তাহলে এখন করণীয়ই বা কি? সালফেটের ভয়ে তো আর চুল ময়লা রাখা সম্ভব না!!

সেক্ষেত্রে দুটি উপায় রয়েছে, প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে নিজেই নির্ভেজাল শ্যাম্পু তৈরি করে নেয়া নয়ত নিরাপদ মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করা। সালফেট নামক ডিটারজেন্টবিহীন শ্যাম্পুই সহজ ভাষায় মাইল্ড শ্যাম্পু। এই শ্যাম্পু সাধারনত ভেষজ উপাদান ; প্রাকৃতিক তেল, মধু, মসুর ডালের পানি, রিঠা; থেকে তৈরি করা হয়। তবে অনেক সময় প্রাকৃতিক উপাদানের নির্যাস থেকে তৈরি করা মাইল্ড শ্যাম্পুতেও সালফেটের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে এই মাইল্ড শ্যাম্পু সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। খুব শীঘ্রই মাইল্ড শ্যাম্পু আসলে কি এবং কী কী বিষয় খেয়াল রাখা উচিত তা নিয়ে একটি লেখা আসছে।

সবশেষে এতোটুকু বলবো বুঝে শুনে চুলের যত্নে শ্যাম্পু বেছে নিন। সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে শিখুন। ভালো থাকবেন।

লিখেছেন – নীলা

Comments

comments

Recommended