ত্বকের যত্ন, সম্পাদকের পছন্দ, সৌন্দর্য পরামর্শ

ত্বকের যত্নে বেকিং সোডার ব্যবহার আজই বন্ধ করুন!

বিভিন্ন বিউটি ব্লগে এখন রূপচর্চার নানারকম ঘরোয়া টিপস দেখে আমরা সবাই প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন জিনিস মুখে ট্রাই করছি। সামিয়াও এর ব্যতিক্রম না। ত্বকের পিম্পল, ব্ল্যাকহেডস, বিভিন্ন সমস্যা দুর করতে ইদানিং সবাই বেকিং সোডার ভালো রিভিউ দিচ্ছে দেখে সেও লাগানোর সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু হলো হিতে বিপরীত। মুখে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পরই তার মুখ জ্বালাপোড়া করতে শুরু করল। সাথে সাথে মুখ ধুয়ে দেখলো মুখের বিভিন্ন জায়গায় পোড়া ছোপ ছোপ দাগ হয়ে গেছে। পরে সে জানতে পারলো তার আরেকজন বান্ধবী বেকিং সোডা ব্যবহার করার পর শুরুর দিকে ত্বক ভালো থাকলেও ধীরে ধীরে তা শুষ্ক ও অতিরিক্ত সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছে!

এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। ত্বকের ব্যাপারে সচেতন মেয়েরা ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা দুর করতে নানারকম ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করে থাকে। হাতের কাছে সহজে পাওয়া যায় এমন একটি প্রাকৃতিক উপাদান হলো “বেকিং সোডা”। খুব জনপ্রিয় একটি ঘরোয়া উপাদান ও বলা যেতে পারে এই বেকিং সোডাকে। শুধু রান্না নয়, রুপচর্চায় এক্সফোলিয়েটর হিসেবে বেকিং সোডার ব্যবহার এখন খুব জনপ্রিয়। স্ক্রাব ও ক্লিঞ্জার হিসেবে, ব্রণের দাগ, ব্ল্যাকহেডস, রোদে পোড়া ত্বক দুর করতে অন্যতম প্রাকৃতিক ঘরোয়া উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই বেকিং সোডা। কিন্তু সব প্রাকৃতিক উপাদানই কি আমাদের শরীর ও ত্বকের জন্য ভালো? পেট্রোলিয়াম, পয়জন আইভি (এক প্রকার পাতা) এসবও কিন্তু “প্রাকৃতিক”। তারমানেই এই নয় যে এটি আপনার ত্বকের জন্য নিরাপদ। তাই ব্যবহারের আগে জেনে নেওয়া উচিত উপাদানটি আপনার ত্বকের জন্য জন্য কতটুকু সহনীয় বা কতটুকু ক্ষতিকর। না হলে সামিয়ার মতো পরিস্থিতির সামনা সামনি হতে হয়।

রান্নার কাজ ছাড়াও যে বেকিং সোডা আমরা কিচেন সিংক, টয়লেট পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করি তা আমাদের ত্বকের মতো সেন্সিটিভ জায়গার জন্য আদৌ কতটুকু ভালো, কখনও কি মাথায় এমন প্রশ্ন এসেছে?

বেকিং সোডার রাসায়নিক নাম হলো “সোডিয়াম বাইকার্বনেট”। অনেক সময় একে “বাইকার্বোনেট অব সোডা” ও বলা হয়। আমাদের দেশে এটি পাওয়া যায় খাবার সোডা নামে। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক মিনারেল যা মাটির নিচ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এটি ক্ষারীয়, যার পি এইচ ৯।

অনেকেই দেখবেন বেকিং সোডার পরিবর্তে বেকিং পাউডার ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই বেকিং পাউডারও কি ত্বকের জন্য উপকারী? তবে জানুন,  বেকিং পাউডার হলো পাউডার জাতীয় পদার্থ যা বেকিং সোডা ও ক্রিম অব টারটারের মতো এক প্রকার পাউডার এসিডের মিশ্রণ।এই মিশ্রণের সাথে কর্নস্টার্চও ব্যবহার করা হয় যা মিশ্রণটিকে শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে আছে, সোডিয়াম অ্যালুমিনাইট সালফেট এবং মনোক্যালসিয়াম।

ত্বকে বেকিং সোডার পরিবর্তে কি বেকিং পাউডার ব্যবহার করা যাবে?

উত্তর হল, অবশ্যই না!

কারণ রূপচর্চায় বেকিং সোডা বা বাইকার্বনেট অব সোডা ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু বেকিং পাউডারের সাথে থাকে কর্ন স্টার্চ ও ক্রিম অব টারটার যা এক প্রকার দুর্বল এসিড। তাই বেকিং পাউডার শুধু মাত্র বেকিং সোডা নয়, এটি বেকিং সোডা ও কর্ন স্টার্চের মিশ্রণ। যা রান্নার কাজে ব্যবহারের উপযোগী। তাছাড়া একটু ভালোভাবে পড়ে নিলে দেখবেন বেকিং পাউডারের ক্যানে লেখায় আছে “It is made specially for baking”। কাজেই বুঝতে পারছেন ত্বকের যত্নে আসলে বেকিং সোডার চেয়ে ভয়ঙ্কর উপাদান হল বেকিং পাউডার!

তবে কি রূপচর্চার জন্য বেকিং পাউডারের বদলে বেকিং সোডা ব্যবহার করবো! তাই তো মনে হচ্ছে?

কিন্তু ব্যবহারের আগে জেনে নেয়া দরকার আমাদের ত্বক কতটা বেকিং সোডা নিতে পারে ও এর ক্ষতিকর প্রভাব কতটুকু। মুখের পিম্পল, ব্রণের দাগ, ব্ল্যাকহেডস দূর করতে, ত্বক ফর্সা করতে এটি ব্যবহার করা হয়। এর রয়েছে অ্যান্টিসেপ্টিক, অ্যান্টি ফাংগাল ও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুণ । তাই এটি বাসাবাড়ির সিংক, কিচেন, টয়লেট পরিষ্কারে খুব কার্যকরি। কিন্তু আপনার ত্বকের জন্য এটি খুবই হার্শ এবং ত্বকের অনেক ক্ষতিসাধন করে। তাছাড়া বেকিং সোডা ব্যবহারের পর যে ইন্সট্যান্ট ফর্সা দেখায় তা আসলে আপনার পোর আনক্লগ হয়ে যাওয়ার কারণে। পরবর্তিতে এই আনক্লগ পোর বাইরের নানারকম উপাদানের সংস্পর্শে এসে আপনার ত্বকে সহজেই ইনফেকশন সৃষ্টি করে।আরেকটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি…

আমাদের ত্বকে কয়েকটি লেয়ারে বিভক্ত। একদম উপরের বা বাইরের দিকের লেয়ারটিকে বলা হয় এপিডার্মিস, যার নাম আমরা সবাই জানি। আমাদের ত্বকের পি এইচ ৪ থেকে ৫ এর মাঝামাঝি, যা এসিডিক। ত্বকের এই এসিডিক পরিবেশ কে বলা হয় ‘এসিড মেন্টেল’। অপরদিকে বেকিং পাউডারের পি এইচ ৯, যা ক্ষারীয়। যেখানে পানির নিউট্রাল পি এইচ ৭। সাবান আপনার ত্বকের জন্য যতটা ক্ষতিকর বেকিং সোডাও ঠিক ততোটাই ক্ষতিকর। ত্বকের এমন এসিডিক হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ত্বককে বাইরের দূষণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করা। সাথে সাথে এটি ত্বকের ময়েশ্চার ধরে রাখে এবং ত্বককে শুষ্ক হওয়া থেকে বাঁচায়।

যখন আপনি আপনার ত্বকে অ্যাল্কেলাইন বা ক্ষারীয় কিছু ব্যবহার করবেন তখন তা আপনার ত্বকের এই এসিড মেন্টেল কে ভেঙ্গে দেয়, সাথে সাথে আপনার ত্বকের ব্যাকটেরিয়াল ফ্লোরার কম্পোজিশনও নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া এসিড মেন্টেল আপনার ত্বকে ময়েশ্চার ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাই ‘এসিড মেন্টেলের’ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে ত্বকের ময়েশ্চার লেভেল নষ্ট হয়ে যায়। যা আপনার ত্বককে করে অতিরিক্ত শুষ্ক। এমনকি ত্বকের ময়েশ্চার ধরে রাখার ক্ষমতা অনেকসময় পুরোপুরিভাবে নষ্ট হয়ে যায়। যেহেতু পি এইচ লেভেলের পরিমাণ সন্তোষজনক তাই এর ক্ষতির পরিমাণটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তাই আপনি যত বেশি বেকিং সোডা ব্যবহার করবেন আপনার ত্বক ধীরে ধীরে তত বেশি নষ্ট হতে থাকবে।

বেকিং সোডার কয়েকটি পার্শবপ্রতিক্রিয়াঃ

(১) আপনার ত্বক বাইরের দুষিত পদার্থ ও ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সহজেই আক্রান্ত হয় ও ত্বকে ইনফেকশন দেখা দেয়।

(২) বেকিং সোডা আপনার ত্বককে পাতলা করে ফেলে ও ত্বককে করে এক্সট্রা সেন্সিটিভ। ফলে সূর্য্যের ক্ষতিকর রশ্মি সহজেই আপনার ত্বকে এর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

(৩) কয়েকদিন ব্যবহারের পর হঠাৎ করেই মুখে ব্রণের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে।

(৪) যাদের ত্বক সেন্সিটিভ তাদের বেকিং সোডা ব্যবহারে অনেক সময় ত্বক পুড়ে যায় বা লাল র‍্যাশ পড়ে হয়।

(৫) নিয়মিত ব্যবহারে মুখে কালো দাগ দেখা দেয়।

তাহলে ত্বকের জন্য বেকিং সোডার পরিবর্তে কি ব্যবহার করবেন?

যারা বেকিং সোডা ব্যবহার করছেন তাদের মনে নিশ্চয় প্রশ্ন আসছে,তাহলে বেকিং সোডার পরিবর্তে কোন কোন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করবেন। যদি আপনি বেকিং সোডার পরিবর্তে হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন ঘরোয়া কিছু খুঁজে থাকেন তাহলে ওটস, কফি পাউডার, বেসন, চিনি ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারেন। এই সবগুলো উপাদানই প্রাকৃতিক তাই এর কয়েকবার ব্যবহারেই আপনার ত্বকের সুন্দর পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

যদি আপনি ইন্সট্যান্ট গ্লো চান বা ত্বক ফর্সা করতে চান তবে বরফের কিউব নিয়ে মুখে কিছুক্ষণ হালকা ম্যাসাজ করুন। এরপর এক টেবিল চামচ বেসন ও এক টেবিল চামচ কাঁচা দুধ মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাক নিয়মিত ব্যবহারে আপনি পাবেন উজ্জ্বল ও ফর্সা ত্বক।

আমরা প্রতিনিয়তই ইন্টারনেটে নানারকম বিউটি টিপস দেখে তা সম্পর্কে ভালো মতো না জেনেই ব্যবহার করা শুরু করি। আদৌ কি তা আমাদের ত্বকের জন্য নিরাপদ, মুখের ত্বক অনুযায়ী কোন প্যাকটি সঠিক আমরা কিছুই ভেবে দেখি না। আমরা ভুলে যাই আমাদের ত্বক এক্সপেরিমেন্ট করার জায়গা না। নিজের একটি সামান্য ভুলের জন্য হয়তো সারা জীবন ভুগতে হতে পারে।

আপনার ত্বকের কোমলতা ধরে রাখতে নিরাপদ প্রোডাক্ট ব্যবহার করুন। বেকিং সোডার বক্সটি শুধুমাত্র রান্নাঘরে ও লন্ড্রি রুমেই রাখুন, স্কিন কেয়ার কিটের সাথে নয়।

লিখেছেন – শাবনাজ বেনজীর

Comments

comments

Recommended