খাদ্য ও স্বাস্থ্য, সম্পাদকের পছন্দ, সুস্বাস্থ্য

আপনার কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে আছে তো?

আব্বার মারা যাবার চতুর্থ দিনের মাথায় বাসায় মিলাদ চলাকালীন সময়ে ভাইয়া হঠাৎ ঘামতে শুরু করলো। প্রথম প্রথম তো সবাই ভাবছিল যে এতগুলো মানুষের খাওয়া-দাওয়া আর অন্যান্য অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে গিয়ে স্ট্রেসের কারণে এমন হচ্ছে। ভাইয়া এরইমধ্যে হঠাৎ বসে পড়লো। তখন আম্মা তাড়াতাড়ি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন, ভাইয়াকে হসপিটালে ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলো। ইসিজিতে ধরা পড়লো ওর ৩টা আর্টারিতে (রক্তনালী) ব্লক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে, সহজ ভাষায় যাকে আমরা বলে থাকি হার্ট অ্যাটাক। ভাইয়ার বয়স ছিল মাত্র ৩২, আমাদের মাথাতেই আসলো না যে কিভাবে ওর ৩টা আর্টারিতে ব্লক আছে!

উপরের ঘটনাটি কিন্তু এখন অহরহই হচ্ছে। এবং ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে এখন অল্প বয়সেই অনেকেরই এ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাধারণত যে রক্তনালীগুলোর মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে রক্তের সরবরাহ হয়ে থাকে, সেই রক্তনালীগুলো ব্লক হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়। এই রক্তনালীগুলো ব্লক হওয়ার পেছনে কিছু কিছু কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি কারণকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয় –

• কোলেস্টেরল
• উচ্চ রক্তচাপ
• ডায়াবেটিস
• ধূমপান, মদ্যপান
• বংশগত কারণ

যারা ধূমপান এবং মদ্যপান করে, তারা একটু ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ডায়াবেটিস থেকে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা ব্লক খুব বেশি পরিমাণে হয়। উচ্চ রক্তচাপ যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে সেখান থেকে রক্তনালী ব্লক হতে পারে। আমাদের শারীরিক পরিশ্রম কম থাকার জন্য, পরিশ্রম কম থাকার জন্য, চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার জন্য, তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার জন্য উচ্চ কোলেস্টেরল বাড়ার জন্য রক্তনালী ব্লক হতে পারে।

আজকে আমরা হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ কোলেস্টেরল নিয়ে একটু জানবো।

কোলেস্টেরল কি?

কোলেস্টেরল একটি চর্বি মত পদার্থ যা আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন করে। এটি বিভিন্ন শারীরবৃত্তিয় ফাংশনের জন্য প্রয়োজনীয় কোষের ঝিল্লি গঠন এবং নির্দিষ্ট হরমোন, ভিটামিন ডি এবং পিত্তের এসিড উৎপাদনসহ। আমাদের শরীরে যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কোলেস্টেরল নিজে থেকে তৈরি হয়ে জমা হতে থাকে, অথবা আমরা খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে থাকি, তবে দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হতে পারে। কারণ আমাদের দেহ অনেক সময়ই নিজের প্রোডাকশন অনুযায়ী অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারে না।
কোলেস্টেরল পানিতে অদ্রবণীয়, তাই রক্তের মাধ্যমে খুব সহজে সারা দেহে লাইপোপ্রোটিনের মাধ্যমে প্রবাহিত হতে পারে। এই লাইপোপ্রোটিন সাধারণত দুই ধরণের হয়ে থাকে –

• লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন / LDL ( Low Density Lipoprotein)
• হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন / HDL (High Density Lipoprotein)

LDL বা সহজ ভাষায় খারাপ কোলেস্টেরল

শরীরের যেখানে যখন কোলেস্টেরলের প্রয়োজন হয়, LDL সেটা পৌছে দেয়। কিন্তু যদি রক্তপ্রবাহে অধিক হারে LDL থাকে সেক্ষেত্রে সেটা ধীরে ধীরে আর্টারি বা রক্তনালীর দেয়ালে জমা হতে থাকে। এবং প্লাক তৈরি করে যা পরবর্তীতে ঐ রক্তনালীকে সংকুচিত করে দেয় এবং হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনে বাধা দেয়, ফলে হার্ট অ্যাতাক হয়। এ কারণে LDL কে খারাপ কোলেস্টেরল বলা হয়। কিছু খাবার যা খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে তোলে –

• ঘি
• মাখন
• ডালডা
• প্রক্রিয়াজাত খাবার
• হাই মারজারিন
• গরু-খাসী-শূকরের চর্বি

HDL বা সহজ ভাষায় ভালো কোলেস্টেরল

HDL কে ভালো কোলেস্টেরল বলা হয় কারণ এটা রক্তপ্রবাহে থাকা অতিরিক্ত কোলেস্টেরলকে যকৃতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যেখানে কোলেস্টেরলের ব্রেক ডাউন হয়েছিল এবং সেটা ধ্বংস হওয়া সম্ভব। ভালো পরিমাণে HDL থাকলে সেটা আর্টারিতে প্লাক জমতে দেয় না, ফলে হার্ট অ্যাটাক হবার ঝুঁকি কমে যায়। কিছু ভালো কোলেস্টরলের খাবার হচ্ছে –

• অলিভ অয়েল
• বীন জাতীয় সবজি
• গোটা খাদ্যশস্য (ওটস, লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি)
• উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ ফল (আপেল, নাশপাতি, আলুবোখারা)
• ওমেগা ৩ সমৃদ্ধ মাছ (স্যামন, টুনা এবং আরো কিছু সামুদ্রিক মাছ)
• বাদাম
• Chia Seeds
• টোফু এবং অন্যান্য সয়-বেইজড খাদ্যদ্রব্য
• রেড ওয়াইন

আশা করছি সবাই মোটামুটি ভালো কোলেস্টেরল এবং খারাপ কোলেস্টেরলের তফাৎ-টা বুঝতে পেরেছেন এবং চেষ্টা করবেন ভালো কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে এবং খারাপ কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার বর্জন করতে। আমাদের একটু সচেতনতাই কিন্তু বড় রকমের শারীরিক সমস্যা থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

লিখেছেন – ফারহানা প্রীতি

Comments

comments

Recommended