অন্যান্য, সম্পর্ক, সম্পাদকের পছন্দ

আনন্দে বেঁচে থাকাটাই আসল জীবন!

অনেকক্ষণ ধরে দেখছি লোকটি রাস্তা পার হয়ে সামনের গলির দিকে যাবে কিন্তু রাস্তা পার হচ্ছে না। ঘটনা  কি দেখার  জন্য বারান্দা ছেড়ে জানালায়  চলে এলাম যেখান  থেকে  সরাসরি  রাস্তার ওপার  দেখা যায়। লোকটি  তার  তিন/চার  বছর  বয়সী ছেলেকে নিয়ে  যাচ্ছে  খেলতে।

ছেলের একহাতে স্কুটি অন্য হাতে বাবার প্যান্ট (বাবার হাত পায়নি বলে) খামচে ধরা। লোকটির এক হাতে ছেলের ফুটবল, অন্যহাতে কানে  মোবাইল। তৃতীয়  হাতের  অভাবে  লোকটি  ছেলেকে  নিয়ে  রাস্তাপার  হতে পারছে না।  আরেকটা  হাত  থাকলে এতক্ষণ নিশ্চয়ই ছেলের  হাত  ধরে  রাস্তা  পার  হয়ে  যেতো।

ছুটির  দিনের  বিকাল  তারপর  ও  ফোন  ছেড়ে  ছেলের  হাত  ধরার  সুযোগ  যাদের  নেই  তারা  হলেন আমার বা আপনার মতোই কর্পোরেট অফিস এর  চাকুরে  এবং   সংসারের  একমাত্র   উপার্জনক্ষম  ব্যক্তি।

ভদ্র লোকটির মতো আপনি যেখানে, যে অবস্থায়ই  থাকেন না কেন বসের ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আপনার নেই। কারণ  কর্পোরেট  অফিসে  কাজ করে আপনি আপনার পরিবারকে  একটা  অবস্থানে  নিয়েছেন, যেখানে  পরিবারের  চাওয়া  পাওয়া সবই উঁচু তারে বাধা। আপনি  তো আর সেই তার ছিঁড়ে নিচে  ঝাপিয়ে পড়তে  পারেন না।  সেই  অবস্থান  আপনাকে ধরে  রাখতেই  হবে  তাই  আপনাকে  চাকুরীটাও  ধরে  রাখতে  হবে।  চাকুরী  ধরে  রাখতে  হলে  আপনার  দিনরাত্রির ৩০ ঘণ্টা (২৪ ঘণ্টা  নয়)  আপনার  বসের  হাতে জমা রাখতে হবে। তার সাথে  জমা  রাখতে  হবে  আপনার  সকল  অবসর, বিনোদন, ইচ্ছা, অনিচ্ছা……

সারাদিন অফিসে খাটাখাটুনি, ঝাড়িবারি খেয়ে  যখন  বাসায় ফিরবেন ততক্ষণে  মনে মনে ঠিক  করতে  হবে  কীভাবে  আপনার ঘরের  মানুষের (স্ত্রী/ স্বামী / বাবা- মা/ভাইবোন/সন্তান)  মান  ভাঙাবেন। কারণ প্রতিদিনকার মতো  আপনি  আজও ফিরতে দেরি করে ফেলেছেন। ধরুন, আপনার  ভাগ্য  বারাক ওবামা বা মিশেল ওবামার মতো, তবে তো কথাই  নেই  সে  বা  তারা  আপনার  জন্য খুশি মনে অপেক্ষা  করবে। তারপরও বাড়িতে এসে আপনি সামান্য আত্মগ্লানিতে  ভুগবেন! কারণ  অফিস  করা  ছাড়া আপনি তো আর কিছুই করেন না! এই যে এত বড় সংসার তার সব কাজ  করতে  হচ্ছে  তাকে (স্ত্রী)। রান্নাবান্না, ছেলেমেয়ের যন্ত্রণা, বাজার, স্কুল  এমন কি  আপনার সুবিধা অসুবিধাগুলো  পর্যন্ত।

তাহলে  তার  মেজাজ তো বুঝে  চলতে  হবে  আপনাকেই। বাচ্চারা  অথবা  অন্যরা  ইচ্ছে  হলে  আপনাকে  সময়  দিতেও  পারে , নাও  পারে । সেটা  নির্ভর  করে  তাদের  মেজাজ  মর্জির  উপর। কর্পোরেটে  থেকে  থেকে  আপনি  আপনার  মেজাজ  মর্জি  হারিয়েছেন, তাই  বলে তারা তো  আর  “তা”  হাড়িয়ে  পথে বসেনি! কথাগুলো তির্যকপূর্ণ মনে হতে পারে কিন্তু এটাই বাস্তবতা। এখন করণীয় কি?  আপনার মনে হতে পারে আপনার সামনে দুটি  পথ  খোলা।

এক –  আপনি  সংসারের  জন্য  কিছুই  করছেন না  এটা   মেনে  নিয়ে  সংসারে শান্তি  বজায়  রাখা।

দুই –  আপনার  কর্ম  ফিরিস্তি  দিয়ে  সংসারে  অশান্তি  বয়ে  আনা।

এই দুটি পথের মধ্যে প্রথমটি আপনি বেছে নিবেন জানি। আপনি  খুবই  ভদ্র  প্রকৃতির। ২২ ক্যারেট  সোনায়  খাঁদ  থাকতে  পারে  কিন্তু  আপনাদের ভদ্রতায়  কোন  খাঁদ  নেই।  তাই  আপনারা  প্রথমটাই  বেছে  নেন। তাছাড়া  আপনাদের  সহ্য  ও  ধৈর্য্য ক্ষমতা  প্রশান্ত  মহাসাগর । তা না হলে,  এতোটা  বছর  আপনি  কর্পোরেট  অফিসে  টিকে  থাকতে পারতেন  না।

আপনার  বাসার  সামনে  যে  লোকটা  মাটি  কাটার কাজ  করছে  আপনি  তার  চেয়ে ও  সহজলভ্য।  বসের  রাগের  মুখে  ঐ লোক  তার  কোদাল  ছুড়ে  হাটা  দিতে  পারবে  কিন্তু  আপনি  পারবেন না।

আপনি  কি  ছুড়বেন ??

ছুড়তে  হলেতো  আপনাকে   আপনার  পুরো সংসার  ছুড়ে  ফেলতে  হবে ঐ উঁচু তার  ছিঁড়ে। যদিও আপনার এই সংসারই আপনার শক্ত গর্দানে  বানরের মতো পা ঝুলিয়ে বসে বাদাম চিবায় বছরভর। সেই বাদাম আবার জুটিয়ে দিতে হয় আপনাকেই (যেহেতু আপনি সংসারের একমাত্র  উপার্জনক্ষম ব্যক্তি)  যদি  আপনি  এভাবে  ভেবে  থাকেন।

তাহলে  আপনার  মুক্তি  কোথায়?

রবীন্দ্রনাথ  এর  ভাষায় –
আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,
আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে ॥
দেহমনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে,
গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধ্বে ভাসে ॥
আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,
দুঃখ বিপদ-তুচ্ছ-করা কঠিন কাজে।।

আপনার  মুক্তি এই  গানের  মাঝে। এই  গানটিকে  আপনার  জীবনে  অর্থপূর্ণ  করুন। আপনার  কঠিন  সময়ে ও  আপনি  প্রিয়  মানুষটির  সাহায্য  চান, পরিবার  নিয়ে  প্রকৃতি, গান  আর  ভালো লাগা  কাজের  মাঝে  হারিয়ে যান, অন্যের বিপদকে  অনুভব  করতে শিখুন, পারলে  সাহায্য  করুন। দেখবেন  কর্পোরেটও সংসার জীবনের  শীল-নোড়ার (পাটা -পুতা)  চাপে  আপনি আর পিষ্ট হবেন না।

পারলে  আপনার  সহযোদ্ধাকে উপার্জনশীল করে গড়ে তোলায় সাহায্য করুন, ঘরে বাহিরে দুইজনে একই তালে কাজ করুন, তাহলে আর  কর্পোরেট জীবন আপনার ঘাড়ে চড়ে বসতে পারবে না, আপনি লাগাম হাতে কর্পোরেট জীবন এর ঘাড়ে চড়ার সাহস পাবেন।

আসলে  দুটো  জীবনকেই  তার  তার  জায়গায়   সমান  গুরুত্বপূর্ণ  করে  তুলতে হবে।  কোন এক জীবনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবলেই  শুরু হয় যতো সমস্যা। খেই হারিয়ে ফেলে এক  জীবনের  কাছে অন্যজীবন, সাথে হারিয়ে যায় জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

জীবনের  ছন্দপতন  এড়াতে  হলে  কর্পোরেট ও ব্যক্তিজীবন  উভয়ক্ষেত্রকে  ছন্দময় করার চেষ্টা করতে হবে। জীবনের  আনন্দে  বেঁচে থাকাটাই  আসল  জীবন। কোনরকমে  বেঁচে  বর্তে  থাকার  নাম  জীবন  নয়। ব্যাক্তি

ছবি –  ফটোগ্রাফারস ডট ক্যানাভেরা

লিখেছেন – ইয়াসমিন আক্তার মনি

Comments

comments

Recommended