সোনামনি

৩-৬ বছরের শিশুদের যত্ন

সবাই বলে তিন থেকে ছয় বছরে বাচ্চার মূল মানসিক ধাপ তৈরি হয়। ছোট্ট সোনামনিরা তাদের শৈশবে পা দেয় দুলু দুলু পদক্ষেপে। তাদের কল্পনা শক্তি প্রখর, আছে নানা বিষয় নিয়ে ভয় ভীতিও। কিন্তু দৌড় ঝাপ দিয়ে খেলায় তাদের নেই আপত্তি। এই সময়টাই তাদের সামাজিক পরিচিতি লাভের সময়। নিজের আপন জনের গণ্ডি পেরিয়ে মিশতে শেখে সবার সাথে। নতুন নতুন কাজ করার ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে ওঠে। প্রতিটি শিশুই আলাদা। একেক জনের মেধা, মন, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় একেক গতিতে। বড় হওয়ার পরে তারা অনেক কিছু সুন্দর ভাবে বুঝতে পারে ঠিকই। কিন্তু কথায় বলে বাঁশ কচি থাকতে বাঁকানো সহজ। শৈশবের গড়ে ওঠা সুন্দর অভ্যাস সারা জীবনের পাথেয়।

সামাজিক ও মানসিক বিকাশ:

৩ ও ৪ বছর –

– এ সময় প্রথম তারা বুঝতে পারে যে মা, বাবা, ভাই, বোন ছাড়াও আরও অনেকের সাথেই কথা বলতে হয়। শুরু হয় সামাজিকতার প্রথম ধাপ। তাদের অভ্যন্তরীণ পৃথিবীটা অনেক শক্তিশালী। তারা ভান  করা আর আসল কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ডাইনিরা কি সত্যি জাদু করে অথবা শিশুরা কি বড় হলে পাখির মত ডানা হয়ে আকাশে উড়ে যাবে তা তারা বুঝতে পারে না। এই বয়সে বাচ্চারা মিথ্যে বলে না। কিন্তু তারা প্রায়ই গল্প ও বাস্তবকে মিশিয়ে ফেলে।

– ৩ বছর থেকে তারা বুঝতে পারে যে তাদের মন তাদের বাবা মা থেকে আলাদা এবং তারা তার মন পড়তে পারে না।

– বড় ছোট, লম্বা খাটোর মানে বোঝে। কিন্তু এগুলোকে আলাদা করতে পারে না। একটি লম্বা পাতলা গ্লাস থেকে একটি ছোট মোটা গ্লাস যে বেশি ধারন করতে পারে তা বুঝতে পারে না।

– রাতের পর দিন আসে, কার বয়স কত এগুলো বুঝতে শেখে।

– এ বয়সে সে ছবি আঁকা শেখে। যার বেশির ভাগই হয় বড় গোল মাথাওয়ালা, চোখের নিচ থেকেই লম্বা লম্বা পা। ক্রস ও স্কয়ার আঁকা শেখে। তিন ইট দিয়ে ব্রিজ বানাতে পারে।

৫ ও ৬ বছর:

– বন্ধুত্বের মানে প্রথম বুঝতে পারে। সঙ্গীদের নিয়ে মাঠে, বাগানে খেলতে চায়।

– মাকে ছোট ছোট কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করে। খেলনার প্রতি আগ্রহ কমে সেখানে দখল করে জীবন্ত জিনিসের প্রতি আগ্রহ। পোষা বিড়াল বা কুকুরের জন্যে অনেক সময় ব্যয় করে।

– প্রথম হাতে খড়ির সময়। অক্ষরগুলোকে বুঝতে শেখে। একটি বাচ্চা অক্ষর শেখার ৩ মাসের মধ্যে শব্দ লিখতে শেখে।

– ছোট ছোট নৌকা, প্লেন, কাগজের অন্যান্য জিনিস বানাতে শেখে এবং নিজে নিজে করতে চায়।

খাদ্যের তালিকা:

– বয়স ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী কম বেশি করে নিতে হবে। কিন্তু সঠিক পুষ্টির জন্যে সুষম এই খাদ্যতালিকা অনুসরণ করলে ভালো।

খাদ্যের তালিকা:

chart 2

যা যা করা যাবে না:

– শিশুরা আদরের জন্যে, এটা মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, তাদেরকে সঠিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হলে তাদের অপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা যাবে না।

– অনেকেই সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন না। তাদের ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তর দেয়াও যে জরুরি হতে পারে তা বোঝেন না।

– ভূত প্রেতের ভয় দেখিয়ে যেমন – এটা না করলে শাঁকচুন্নি এসে কামড় দেবে বা গাছের নীচ দিয়ে গেলে ভূত ডিম পেড়ে দেবে মাথায় এসব ধারনা কখনই দেয়া যাবে না। জীবনের অনেক প্রতিকূলতায় যাতে সে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারে সেই শিক্ষা দিন। প্রথমেই ভীতিকর চিন্তা মাথায় দিয়ে দিলে বাচ্চা বড় হয়েও অনেক ব্যাপারে বাঁধার শিকার হবে।

– বাচ্চারা মাঝে মাঝেই অনেক অযৌক্তিক, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে পারে। তাতে বিরক্ত হয়ে অথবা হাসাহাসি করে উড়িয়ে না দিয়ে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন।

– সন্তানের গায়ে কম বেশি সব মায়েরাই হাত তুলে থাকেন। শাসন করা অবশ্যই জরুরী, কিন্তু তা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। কথায় কথায় না মেরে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বলুন। সন্তানকে বোঝান যে আপনি তাকে কত ভালোবাসেন। এতে আপনারই লাভ হবে। বাচ্চা তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আপনার মতামতকে গুরুত্ব দেবে। তার জীবনে আপনাকে এক অপরিহার্য অংশ মনে করবে।

– কখনই জোর করে কিছু করতে বাধ্য করবেন না। সন্তান আপনারই অংশ। তাকে নিজের অংশ মনে করুন। নিজের উচ্চাশা তার উপর দিয়ে চালিয়ে দেবেন না।

– আজে বাজে জিনিসের অভ্যাস না করে, সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস করুন। বাচ্চারা এমনিতেও খেতে চায় না। জোর করে না খাইয়ে অল্প অল্প করে অনেক বার ধৈর্য ধরে খাওয়ান।

– বাবা-মার ঝগড়া, বিচ্ছেদ সন্তানের মন মানসিকতাকে নষ্ট করে। তাই মিলে মিশে সন্তান পালন করুন, একে অন্যের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। আপনাদের ভালোবাসা তাদেরকেও ভালোবাসতে শেখাবে।

যে সব ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ অতি জরুরী:

– বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে তারা ঠিক মত বেড়ে উঠছে কিনা। বয়স অনুযায়ী একটি মেয়ে বাচ্চা ও ছেলে বাচ্চার উচ্চতা ও ওজনের চার্ট একজন ভালো শিশু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে দেখে নিতে হবে। সঠিক সময়ে অন্যান্য বাচ্চাদের অনুপাতে তার বেড়ে ওঠা হচ্ছে কিনা দেখতে হবে।

– পূর্বের থেকে বর্তমানে কোন কাজ করতে অধিক সময় লাগলে গুরুত্বের সাথে নিন। এই সমস্যায় সে প্রতিনিয়ত পড়ছে কিনা খেয়াল রাখুন।

– অনেক সময় অতি অপুষ্টিতে প্রোটিনের অভাবে বাচ্চার শরীরে পানি জমে ফুলে যায়। রক্তশূন্যতা থাকলে, ঘন ঘন বমি করলে বা মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

– কোনো কোনো বাচ্চার জন্মগত শারীরিক ত্রুটি থাকে। এগুলোকে হেলাফেলা না করে ডাক্তারকে বলুন। অল্প বয়সে চিকিৎসায় অনেক রোগই সেরে যায়। বয়স বাড়ার অপেক্ষায় থাকবেন না ।

– প্রত্যেক বাবা মাই সন্তানকে ভালবাসেন। তাহলে সেই আদরের সন্তানের যত্নও হওয়া চাই সেরকমভাবেই। তাই নিজে সুস্থ থাকুন , আদরের সোনামনিকেও ভরে দিন ভালোবাসায়।

লিখেছেন –  শারমিন আখতার চৌধুরী

মডেল – সানিকা

Comments

comments

Recommended