ক্যারিয়ার

ইন্টারভিউ: “মুক্ত কর ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়”

“ইন্টারভিউ” বিষয়টাকে কেউ দেখেন পরীক্ষা হিসেবে, কেউ দেখেন খেলা হিসেবে। আমি ২য় দলে। যে কোন ভাল ক্রিকেট ম্যাচের কথা ভেবে দেখুন, কত ধরনের প্রস্তুতি থাকে খেলা শুরুর আগে থেকে একেবারে খেলার শেষ বল পর্যন্ত। একজন ক্রিকেটারকে কঠিন অনুশীলন করতে হয় ম্যাচটিতে ভাল খেলার জন্যে। প্রয়োজন হয় মানসিক ও শারীরিক দৃঢ়তার। সেই সাথে পোশাকের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

আসা যাক মূল কথায়। ফোনে, ই-মেইলে অথবা চিঠিতে যখন আপনার ডাক আসে কাংক্ষিত চাকরির জন্যে একটি মৌখিক পরীক্ষার, তখন শুরুতেই বুকে দুরু দুরু একটা অনুভূতি হয়, তাই না? একদিকে মনের ভেতর স্বপ্ন গুলো জাল বুনতে থাকে, অন্যদিকে একটু একটু নার্ভাস লাগে।

কী কী বিষয় গুরুত্ব দেবেনঃ

০১. আপনার পোশাক ও সাজঃ

যদি নারী হন, চেষ্টা করবেন ফরমাল পোশাক পরতে। শাড়ি, বা থ্রি-পিস যাই পরুন, ম্যাচিং –এর দিকে গুরুত্ব দেবেন এবং অবশ্যই খুব জমকালো কিছু পরবেন না। মেক-আপ অবশ্যই নেবেন, তবে পার্টি মেক-আপ নয়। অলংকার পরবেন এবং তা অবশ্যই মার্জিত ধরনের। পুরুষরা অবশ্যই ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরবেন। টাই বা স্যুট পরতে পারেন। চাকরিটি সেলস বা মার্কেটিং হলে স্যুট-টাই যতটা জরুরী; ইঞ্জিনিয়ারিং হলে ততটা নয়। লক্ষ্য রাখবেন পোশাকের রং যাই হোক, তা যেন আপনাকে মানায়। একই পোশাকে কাউকে দারুণ দেখায়, কাউকে বিশ্রী। কাজেই পোশাক নির্বাচনে রুচির ছাপ রাখুন। এমন কোন পোশাক পরবেন না, যা আপনি আগে পরেন নি। এর কারণে পরে নানাবিধ অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

০২. প্রস্তুতিঃ

শুরুতেই বলেছি, ইন্টারভিউ একটা পরীক্ষা। কাজেই তার পূর্ব-প্রস্তুতি অবশ্যই প্রয়োজন। কী প্রশ্ন আপনাকে করা হতে পারে, তা আগে থেকে আন্দাজ করার চেষ্টা করুন। অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে একটা Questionnaire তৈরি করুন এবং তার উত্তরগুলো আত্মস্থ করুন। এই কাজটি আমি নিজে কখনও করিনি, কিন্তু আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আমার স্ত্রীকে দেখেছি, আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল বলে তারা বাসায় বেশি করে অনুশীলন করেছিল এবং পরীক্ষার দিন তাদের পারফর্ম্যান্স হয়েছিল দুর্দান্ত। কাজেই খেলা হোক, বা পরীক্ষা; এর একটা মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি অবশ্যই প্রয়োজন।

০৩. শুরুর প্রশ্নঃ

Can you please describe yourself in brief?– অধিকাংশ ইন্টারভিউ শুরু হয় এই প্রশ্ন দিয়ে। কাজেই নিজেকে উপস্থাপন করতে ৫-৬ টি বাক্যে নিজেকে সংক্ষেপে বর্ণনা করা অনুশীলন করুন। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, চাকরির পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও সেখানে কোন বিশেষ অর্জন, এই চাকরির বিষয়ে আপনার আগ্রহের বিশেষ কারণ, আপনার সবচেয়ে বড় গুণ – এ জাতীয় কিছু key information দিয়ে আপনার সম্পর্কে ৫-৬টি বাক্য তৈরি করুন। যা বলার, হাসিমুখে বলবেন, প্রশ্নকারীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলবেন। আত্মবিশ্বাস দেখান প্রথম কথা থেকে।

০৪. আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডঃ

আপনি যে বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন, তার সাথে যদি চাকরিটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে অবশ্যই বেশ কিছু থিওরিটিক্যাল প্রশ্ন করা হবে। যদি আপনি ফ্রেশ গ্রাজুয়েট হন, তাহলে ইন্টার্নশিপ বা রিসার্চ (শেষ বর্ষে যেটা করতে হয়েছে), তা নিয়ে কিছু পড়াশোনা করে রাখুন। আপনার থিসিস নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তাই সেটা একবার পড়ে রাখবেন। আপনি যদি চাকরিরত হয়ে থাকেন, তাহলে বর্তমান চাকরিতে কী করছেন এবং কাংক্ষিত চাকরির সাথে তা কিভাবে সম্পৃক্ত – এ নিয়ে আপনাকে প্রচুর প্রশ্ন করা হবে নিশ্চিত থাকুন। যদি এমন হয় যে, আপনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চাকরি চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আপনার বহুমাত্রিক প্রতিভার কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করুন। যেকোন কাজ আপনি দ্রুত শিখতে পারেন, সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করুন।

০৫. আপনার আগ্রহঃ

যে প্রশ্নটি অবশ্যই করা হবে, তা হলো আপনার কেন এই চাকরির জন্যে নিজেকে যোগ্য মনে হয়? আপনার অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও আগ্রহ কিভাবে এই চাকরির সাথে সম্পর্কিত এবং আপনি কোন কোন দিক দিয়ে অন্য যেকোন প্রার্থী থেকে এখানে ভাল করবেন, তা আগে থেকে বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরি করুন। প্রয়োজনে, উত্তরগুলো কাগজে লিখে বাড়িতে মুখস্থ বলা প্রাকটিস করুন। এই চাকরি সম্পর্কে আপনার কতটুকু আগ্রহ আছে তা জানতে একটি প্রশ্ন করার জন্য চাকরিদাতা জানতে চাইতে পারেন, এই প্রতিষ্ঠান/ এই চাকরির ধরন সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন? এর উত্তর জানার জন্যে আপনি প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট ঘেঁটে আগে থেকেই জেনে নিন তাদের পণ্য ও ব্যবসার ধরন। তাদের পার্টনার কারা, কাস্টোমার কারা ইত্যাদি জেনে রাখুন বিশদভাবে।

আপনি যদি একটু বেশি স্মার্ট হন, তাহলে খুঁজে বের করতে পারেন ঐ প্রতিষ্ঠানের এমন কাউকে, যিনি আপনাকে ধারণা দিতে পারবেন, চাকরিটা পেলে আপনাকে কী কী কাজ করতে হবে। ইন্টারভিউতে যদি আপনি প্রমাণ করতে পারেন, যে চাকরিটা পাবার আগে থেকেই কাজটি আপনি কিছুটা জানেন, তাহলে আপনি অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় এগিয়ে থাকবেন অনেক বেশি।

০৬. আপনার যোগ্যতাঃ

১০-২০ মিনিটের সাক্ষাৎকারে এটা বোঝা বেশ কঠিন যে আসলে কে সবচেয়ে যোগ্য। কাজেই প্রশ্নকারী আপনাকে প্রশ্নে-প্রশ্নে নাকাল করতে চাইবেন (যদি আপনাকে পছন্দ হয়)। যদি খুব কম সময়ে ইন্টারভিউ শেষ হয়, তাহলে বুঝতে হবে আপনার পেছনে তাঁরা সময় নষ্ট করতে চাইছেন না (ফলাফল নেতিবাচক)। আমি যে কৌশলটি অবলম্বন করতে পরামর্শ দেব, তা হলো, প্রশ্নকারীর মনোযোগ সেই দিকে কেন্দ্রীভূত করুন, যেখানে আপনার দক্ষতা বেশি। ধরা যাক, প্রশ্নকর্তা চাইছেন আপনি সেলস-এ কতটুকু দক্ষ, তা যাচাই করার। কিন্তু আপনার বিক্রয় বা বিপণন নিয়ে কোন অভিজ্ঞতা নেই। সেক্ষেত্রে, আপনি উদাহরণ দিতে পারেন আপনার বাকপটুতার; যেমন, বন্ধুমহলে সবাই আপনাকে যেকোন বিষয়ে গুরু মানে, বা যেকোন বিতর্কে আপনি জয়ী হন, কারণ প্রতিপক্ষকে আপনি যুক্তি-তর্ক দিয়ে পরাস্ত করতে পারেন।

০৭. যা যা করবেন নাঃ

হুট করে না ঢুকে রুমে ঢোকার আগে “May I come in” বলুন, ঢুকে সালাম দিন এবং বসতে বলার আগ পর্যন্ত বসবেন না। বিদেশী কেউ থাকলে কখনই বাংলায় কথা বলবেন না। একসাথে একাধিক প্রশ্ন করা হলে বিনয়ের সাথে বলুন যে আপনি একটা একটা করে সব জবাব দিতে চান। ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর বাংলায় দেবেন না। একটা ঘটনা বলি – সম্প্রতি একটি ইন্টারভিউতে আমি প্রশ্নকর্তা ছিলাম এবং ৬ জন প্রার্থীর প্রত্যেককে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কম্পিউটারে MS Excel জানেন কি না। প্রত্যেকেই হ্যাঁ-সূচক জবাব দিয়েছেন। দুই একটা ফর্মূলা নিয়ে প্রশ্ন করে আমি বুঝে গিয়েছিলাম কে কতটুকু জানেন। একজনের আত্মবিশ্বাস দেখে তাঁকে পরীক্ষা করার জন্যে আমি আমার ল্যাপটপটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে একটা ছোট্ট হিসেব করতে বলেছিলাম। তিনি অপ্রস্তুত। কাজটা ছিল এক মিনিটের। তিনি ৩ মিনিট ধরে চেষ্টা করলেন। আমার যা বোঝার বুঝে গেলাম। কাজেই, এমন কোন যোগ্যতার কথা বলবেন না, যা আসলে আপনার নেই। যে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই, তা নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করবেন না। প্রশ্নের উত্তর মনে করতে গিয়ে নখ, আঙ্গুল বা কলম মুখে দেবেন না; মাথা চুলকাবেন না, চোখ ছোট ছোট করে কারো দিকে তাকাবেন না। হেসে বলুন, “Sorry” বা “I’m afraid, Can’t give you the right answer at this moment.” বেতন নিয়ে দর কষাকষি হতে পারে। সব সময় এটাই বোঝাবেন যে, আপনি এখন যে বেতনের চাকরি করছেন, আপনার কাংক্ষিত বেতন তার অনেক বেশি হওয়া উচিত। কারণ, আপনি আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না। চাকরিদাতা সবসময় প্রমাণ করতে চাইবে আপনি আপনার প্রাপ্য-র চেয়ে অনেক বেশি বেতন চাইছেন। কাজেই তার কথায় confused বা convinced হবেন না। (ইন্টারভিউতে যাবার আগে জেনে যাবার চেষ্টা করুন এই পদে বা এর কাছাকাছি যারা কাজ করেন, তারা কী রকম বেতন পান।) ইন্টারভিউ শেষ করে প্রশ্নকর্তা অনেক সময় বলেন “OK, we will let you know”. এই কথা শুনে বসে থাকবেন না। উঠে দাঁড়িয়ে বলুন, “OK, Thanks for calling me” অথবা “Ok, I will keep waiting…” বিদায় নিতে পারেন সালাম দিয়ে বা “Thanks. It was nice to be with you” বলে হাত মিলিয়ে।

কখনও কখনও কয়েক ধাপে ইন্টারভিউ হয় এবং সবসময় লক্ষ্য রাখবেন পূর্বের ধাপের চেয়ে পরের ধাপে একটু বড় কর্মকর্তা থাকেন ইন্টারভিউ বোর্ডে। আর প্রশ্নও কঠিন থেকে কঠিনতর হয়। Case Study, Analysis, Presentation, Exercise ইত্যাদির মাধ্যমে আপনাকে পরখ করা হবে। ঠান্ডা মাথায় নিজের সবটুকু মেধা ও ধৈর্য ব্যবহার করে আপনাকে একটার পর একটা লেভেল পার হতে হবে। ভাল চাকরি পাওয়া সহজ নয় কখনই। কাজেই পরিশ্রম করে সেটা অর্জন করতে হবে, সেটা সবসময় মনে রাখবেন।

লিখেছেনঃ কাজী মঞ্জুর করীম

ছবিঃ প্যারেড.কম

Recommended


Comments

comments

3 Comments

Leave a Comment

*