ক্যারিয়ার

চাকরি খুঁজছেন? আপনি কতটুকু প্রস্তুত? (পর্ব-২): কীভাবে CV বানাবেন

বন্ধুরা, গত পর্বে  আলোচনা করেছিলাম চাকরি খোঁজার ব্যাপারে এমন কিছু বিষয়ে যা আপনাদেরঅনেকেরই ভাল লেগেছে। আপনাদের সাড়া পেয়ে অনুপ্রাণিত বোধ করছি। আজ লিখছি রেজিউম বা সি.ভি. নিয়ে কিছু ছোট, অথচ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

 

নিজের ঢোলটি পেটান: 

বর্তমান যুগে নিজের ঢোল নিজে পেটানোতে লজ্জার কিছু নেই (যদি তা বানোয়াট না হয়)। আপনার সি.ভি.টি এমন ভাবে তৈরি করুন, যাতে তা আপনার সম্পর্কে উচ্চধারণা দেয় চাকরিদাতাকে। একই সি.ভি. সব জায়গায় পাঠাবেন না। সি.ভি.টি তৈরী করবেন চাকরির ধরণ বুঝে। চাকরির বিজ্ঞাপনটি বিশ্লেষণ করে সেটার সাথে মিল রেখে আপনার যোগ্যতাকে তুলে ধরুন। লেখার ফন্ট বেশি Artistic করবেন না, Arial, Verdana, Times New Roman বা এই জাতীয় formal Font ব্যবহার করুন। শিরোনামগুলি Bold করুন।

লেখার ধাপগুলি ক্রমানুসারে আলোচনা করছি:

১. আপনার সি.ভি. আপনাকে রিপ্রেজেন্ট করে। কাজেই এটি যেন দৃষ্টিনন্দন হয়, সে বিষয়ে সচেষ্ট হোন। হেডিং-এ বেশি তথ্য রাখবেন না। আপনার নাম, সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বর্তমান পদবী (চাকরীরত হলে) লিখুন। ছোট করে আপনার কন্টাক্ট নাম্বার ও ই-মেইল অ্যাড্রেস রাখুন। ডান পাশে রাখুন আপনার পাসপোর্ট-সাইজ ছবি (আঠা দিয়ে লাগাবেন না) ।

২. হেডিং এর নিচে থাকবে Career Objective. এখানে এমন কিছু লাইন সংক্ষেপে লিখবেন যাতে চাকরিদাতা শুরুতেই আপনার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এবং আপনার সম্পর্কে তার ধারণা হয়, যে আপনি তার কোম্পানিতে কাজ করতে আগ্রহী এবং যোগ্য। উদাহরণ দিই:

ক. যদি মার্কেটিং কোম্পানিতে আবেদন করেন, তাহলে লিখতে পারেন: To develop career in a dynamic marketing environment where my skills and knowledge will play vital role.

খ. ধরুন, আপনি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন, সেক্ষেত্রে লিখুন: Looking for a dynamic position in telecom sector where my efficiency and dedication will be required and valued.

৩. Career Summary-তে আপনার এ যাবৎকালের অভিজ্ঞতা ও অর্জন সংক্ষেপে লিখুন। বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত বাক্যে এবং বুলেট পয়েন্ট আকারে লিখবেন এবং তা যেন পরিমাণবাচক হয়। অর্থাৎ, “I have successfully achieved sales target of my company in 2012” এভাবে না লিখে লিখতে পারেন “Achieved 100% of Company’s Sales target in 2012”. অথবা “I have increased productivity of my company/department in a significant amount” না লিখে লিখতে পারেন “Increased productivity by 12% in 2012”.

1st Person-এ না লিখে Action Verb দিয়ে বাক্য গঠন করুন (যেমনটা উপরে দেখানো হলো)।

৪. আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা ক্রমানুসারে সাজিয়ে লিখুন এবং সেটি শেষ ডিগ্রি থেকে শুরু হবে (যাতে চাকরিদাতা সরাসরি আপনার সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি শুরুতেই জানতে পারেন)।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাশের সাল এবং ফলাফলটি সাজিয়ে লিখুন। Table আকারে দিতে পারেন।

৫. চাকরির পুর্ব-অভিজ্ঞতা থাকলে সেগুলিও বিপরীত ক্রমানুসারে (অর্থাৎ শুরুতে বর্তমান চাকরি এবং তারপর পেছনের গুলি) লিখবেন। কোন চাকরিতে কী কী কাজ করেছেন/করছেন, তা স্পষ্ট ভাষায় লিখুন। যে চাকরির জন্যে আবেদন করতে যাচ্ছেন সেটির সাথে সম্পৃক্ত কাজগুলিকে বিস্তারিত লিখুন। (ইন্টারভিউতে এটি নিয়ে বিষদ আলোচনা হতে পারে, সেটি মাথায় রেখে লিখবেন)

৬. আপনার প্রশিক্ষণ(স্থান, কাল উল্লেখ করে) এবং অন্যান্য অফিসিয়াল অর্জনগুলি বিস্তারিত লিখুন। Key Competencies শিরোনামে একটি অংশ রাখুন, সেখানে আপনার দক্ষতার দিকগুলি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করুন।Proactive, Hard-working, Born Team player, Quick-learner ইত্যাদি বিশেষণ চাকরিদাতাকে আপনার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলবে।

৭. আপনার ব্যক্তিগত তথ্যাদি দেবার ব্যাপারে সতর্ক হোন। বৈবাহিক অবস্থা, পারিবারিক বিবরণ, শারীরিক বর্ণনা (উচ্চতা, রক্তের গ্রুপ) ইত্যাদি খুব জরুরী নয় (যদি চাকরির বিজ্ঞাপনে তা বিশেষভাবে না চাওয়া হয়)। কোন কোন দেশে লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি লেখা গর্হিত হিসেবে গণ্য হয়, কারণ তা Racism-কে সমর্থন করে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান পুরুষ বা নারী প্রার্থীতার ব্যাপারে preference উল্লেখ করে। বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে অনেক চাকরিদাতার concern থাকে (যেমন, এয়ার হোস্টেস পদে অবিবাহিত নারী চাওয়া হয়) সেটি মাথায় রেখে আবেদন করুন।

৮. আপনার Hobby কী, সেটি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও যদি তা এই চাকরির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়, তবে অবশ্যই উল্লেখ করুন। যেমন, আপনি ছাত্রজীবনে বিতর্ক করতেন, এই Extra Curricular Activity আপনাকে চাকরিপ্রার্থী হিসেবে অগ্রাধিকার দেবে যদি চাকরিটি সেলস/মার্কেটিং/প্রোকিউরমেন্ট  জাতীয় হয়। ভ্রমণ আপনার প্রিয় শখ, এই তথ্য আপনাকে এগিয়ে রাখবে যদি আপনার কাংখিত চাকরিটি হয় টুরিস্ট গাইড/সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ/এয়ারহোস্টেস বা এই জাতীয়। Chatting, Facebooking, Blogging বা এই জাতীয় কোন কিছু আপনার শখ হয়ে থাকলে তা উল্লেখ করবেন না। চাকরিদাতার মনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

৯. Reference অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন ধরণের ব্যক্তিকে রেফারেন্স হিসেবে রাখতে পারেন। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর (যিনি ভালভাবে আপনাকে চেনেন), আপনার পূর্বের চাকরির কোন কর্তাব্যক্তি (যিনি আপনার সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করেন) এবং কোন কোন ক্ষেত্রে যেখানে আবেদন করছেন, সেখানকার কোন কর্মকর্তার নাম (ফোন নম্বর ও ই-মেইল সহ) উল্লেখ করতে পারেন। ৩-৪ জনের বেশি রেফারেন্স রাখবেন না। এবং চেষ্টা করবেন আলাদা পৃষ্ঠায় সেটি রাখতে। আপনি যাঁর নাম ব্যবহার করছেন, তাঁকে জানিয়ে রাখুন, নইলে চাকরিদাতার HR department থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিরক্ত হতে পারেন, তিনি ভালভাবে respond নাও করতে পারেন, এমনকি তাঁর সাথে যোগাযোগ করাও দুরূহ হতে পারে।

১০. যে কাজগুলি কখনও করবেন না তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দিই:

ক. অন্য কাউকে দেয়ে সি.ভি. তৈরী করাবেন না। ইন্টারভিউয়ের সময় এ নিয়ে প্রশ্ন করে চাকরিদাতা যদি তা বুঝতে পারেন, আপনার জন্যে তা হবে আত্মঘাতী।

খ. Grammatical/Spelling Mistake করবেন না। এতে আপনার যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

গ. আপনার বর্তমান চাকরিতে কত বেতন পান, বা কাংখিত চাকরিতে কত আশা করেন, তা সি.ভি.-তে লিখবেন না।

ঘ. আপনার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ ফলাও করে লিখবেন না (যদি চাকরিটি এ সংক্রান্ত হয়, তাহলে ভিন্ন কথা)।

ঙ. এমন কোন যোগ্যতা/অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিং-এর কথা লিখবেন না, যা আসলে আপনার করা নেই। মিথ্যাচার ধরা পড়লে তা ক্ষমার অযোগ্য বলে গণ্য হবে।

 

কাভার লেটারে বাজিমাত

অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে ই-মেইলটিকে cover letter হিসেবে ব্যবহার করুন এবং সি.ভি.-টি attach করুন। সি.ভি. অবশ্যই PDF format-এ দেবেন (যাতে অন্য কেউ এটা edit করতে না পারে)। কাভার লেটারের ভাষা হতে হবে মার্জিত এবং স্মার্ট। চাকরির বিজ্ঞাপনটি কোথায় পেয়েছেন তা তারিখসহ উল্লেখ করুন এবং  নিজেকে তার যোগ্যতম প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করুন।

সংক্ষেপে লেখা শেষ করুন এবং অল্প কথা্য় আপনার অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং এই চাকরির বিষয়ে আপনার আকাংখার কথা ব্যক্ত করুন। শেষ করতে পারেন এভাবে: “Expecting your cordial response in this regard” অথবা “Looking forward towards an interview where we can discuss more on your requirements and and my competencies”

মনে রাখবেন, অনেক ক্ষেত্রে কাভার লেটার এর ভাষা দেখে চাকরিদাতা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তিনি প্রার্থীকে ইন্টারভিউতে ডাকবেন কি না। কাজেই তাঁকে আকৃষ্ট করার এবং আপনার বিষয়ে তাঁকে কৌতুহলী করে তুলতে আপনাকে একটি দারুণ কাভার লেটার লিখে বাজিমাত করতে হবে শুরুতেই। কোন কোন চাকরিদাতা কাভার লেটার পড়েই দেখেন না (বিশেষত: সরকারি অফিসে), কিন্তু সেটি আপনার বিবেচ্য নয়। প্রিন্টেড আবেদন এর ক্ষেত্রে কাভার লেটার এর সাথে সি.ভি.-টি স্ট্যাপলার দিয়ে সংযুক্ত করবেন না। জেমস ক্লিপ ব্যবহার করুন, যাতে প্রয়োজনে তা আলাদা করা যায়। আপনার ছবিটি স্ট্যাপলার দিয়ে সংযুক্ত করতে পারেন, তবে তা যেন ছবির বর্ডারে থাকে, মাঝখানে নয়।

রেজিউম ও কাভার লেটার লেখা নিয়ে লেখা এই পরামর্শ আপনার কাজে লাগবে বলে আশা করছি। শেষ হলো চাকরি খোঁজা নিয়ে আমার প্রথম প্রবন্ধ। যেহেতেু আমার প্রায় ৯ বছরের চাকরি জীবনে বেশ কিছু ইন্টারভিউ দিয়েছি এবং নিয়েছি, সেসব অভিজ্ঞতা শেয়ার করব আপনাদের সাথে পরের প্রবন্ধগুলিতে। খুব শিগগিরই দেখা হবে ইন্টারভিউয়ের জন্যে কিভাবে প্রস্তুত হবেন তার টুকিটাকি নিয়ে। শুভ কামনা রইলো আপনার উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের জন্যে।

 

লিখেছেনঃ

-Qazi Manzur Karim (B.Sc in Civil Engg; MBA in Marketing)

Assistant Manager (Cost Control), Banglalink Digital Communications Limited

প্রবন্ধটি লিখতে যেসব বইয়ের সাহায্য নিয়েছি:

1. BASIC BUSINESS COMMUNICATION (by Lesiker & Faltley), 10th Edition

2. Harvard Business Review (online version)

ছবিঃ এনাফেরুড.অরগ

Recommended


Comments

comments

Leave a Comment

*