অন্যান্য, সম্পর্ক, সম্পাদকের পছন্দ

সুখী দাম্পত্য জীবনের সহজ রহস্য

বিয়ের অনুষ্টান শেষ। ‘অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো’- গল্পের মতোন জীবনের কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে না। বিয়ের মাধ্যমে বরং দুইজন মানুষের শুরু হয় নতুন একটি জীবনের। অনুগত ব্যবহার নয়, এই নতুন জীবন নির্ভর করে ভালোবাসা,পারস্পারিক সমঝোতা ও সততার উপর।

১. সম্পর্কের শুরু থেকেই আপনি যা সেটাই প্রকাশ করুন। আপনার ব্যক্তিত্বের জন্যই আপনার সঙ্গী আপনাকে ভালোবাসবে, হাইব্রিড দোষহীন কচ্ছপের খোলশ পরা মানুষকে নয়।

২.পরিবারের দায়িত্ব দুজন মিলেই ভাগ করে নিন। বিশেষকরে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যখন চাকরিজীবী,ঘরের সব কাজ স্ত্রীর উপর চাপিয়ে না দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিন। এতে পাশপাশি থাকার ফলে দুজনের মধ্যে হৃদ্যতা আরো গাঁঢ় হবে।

৩. নিজের বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতার চর্চা করুন নিয়মিত। কঠিন মুহূর্তেও আপনার রসিকতা দুজনকেই ক্ষণিকের জন্য হলেও স্বস্থি দিবে।

৪.দুজন মানুষ একসাথে থাকলে গেলেও কিছু পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার চলেই আসে। আপনার সঙ্গীর যেই অভ্যাসটি আপনাকে বিরক্ত করছে সেটি আসলেই বিরক্তিকর কিনা নিজেকে প্রশ্ন করুন। এড়িয়ে যাওয়ার মতো না হলে গঠনমূলকভাবে প্রসঙ্গটি তুলুন এবং সমাধানের উপায় বাতলে দিন,জোরাজোরি করবেন না।

৫. সারাদিনে একবারের জন্য হলেও দুজন দুজনের সাথে সময় কাটান অন্তত ১০মিনিট। সেটা হতে পারে বিশ্রামের সময়টুকুতে কিংবা ঘুমুতে যাওয়ার আগে।

৬.বাস্তববাদী হোন,দোষ-গুণ নিয়েই মানুষ। আপনার সঙ্গীও একজন মানুষ,সাথে আপনিও। দোষ-ত্রুটি বিবেচনায় রাখুন,ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন। নিজের দোষের জন্য অপরজনকে দায়ী না করে নিজেই দায়িত্ব নিতে শিখুন।

৭.দাম্পত্য জীবনের ৩টি অতি জরুরি শব্দ- ক্ষমা,ক্ষমা ও ক্ষমা।

৮.নিজের ভুল থেকে শিখুন। যখনই আপনি বলবেন,’আমি দুঃখিত’ এর মানে ‘আমি এই ভুল আর করবোনা’ হওয়াই উচিত। দুঃখিত বলে পুনরায় একই ভুল করলে আপনার প্রতি আপনার সঙ্গীর শ্রদ্ধায় কিছুটা ভাটা পড়তে পারে।

৯.প্রতিদিন একে-অপরের প্রশংসা করুন। একদম ছোট ছোট জিনিসের জন্য,হতে পারে টেবিল পরিষ্কার করার জন্য, কিনে আনা টিস্যু প্যাকেটের জন্য,আপনার কাপড় গুছিয়ে রাখার জন্য ধন্যবাদ দিতেই পারেন। ছোট একটি ধন্যবাদ কিংবা এক মুহূর্তের প্রশংসা আপনার সঙ্গীর মন ভালো করে দিতে পারে নিমিষেই।আর ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পেতে কার না ভালো লাগে।

১০.একজন ভালো শ্রোতা হওয়াও বড় গুণ।চুপ থাকুন এবং শুনুন। মুখ বন্ধ-কান খোলা রেখেও আপনি আপনার সঙ্গীর ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারবেন । আপনার দুটি কান,একটি মুখ-তাই একটি কথা বলার চেয়ে দুটি কথা শুনুন।

১১.দুজন মানুষের সম্পর্কে মান-অভিমান খুব সাধারণ বিষয়। অভিমানের সময়টিতে চুপ করে বসে না থেকে কিংবা কথা কাটাকাটি না করে সুন্দর কিছু একটা করার চেষ্টা করুন। অভিমান আপনাকে কেবল আপনাদের সুন্দর মুহূর্ত থেকে বঞ্চিতই করে। সুতরাং ধীরে সুস্থে আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করুন।

১২.দিনের ঝগড়া নিয়ে রাতে ঘুমোতে যাবেননা। বাড়ির মুরুব্বিরা বলে থাকেন,’ঝগড়ার মধ্য দিয়ে সূর্যোদয় পার করো না।বরং উপভোগ কর।’তাই ঘুমোনোর আগে সব ঝগড়া শেষ করুন নতুন দিনের নতুন সকালে নতুন প্রত্যয়ে জাগুন,ভালোলাগা ভর করবে দুজনের উপরই।

১৩. দিনক্ষণ না গুণে প্রতিদিন ভালোবাসার চর্চা করুন।আপনার সঙ্গীর ভালো দিকগুলো প্রকাশ করে প্রশংসা করুন। আদেশ,অনুযোগ কিংবা তিরস্কার নয়। ইতিবাচক,গঠনমূলক সমালোচনা করুন,এটা আপনার সঙ্গীকে একজন ভালো মানুষ হতে সাহায্য করবে।

১৪.দুজনের মধ্যে কোনো বিষয় গোপন রাখবেন না। একজন আরেকজনের কাছে স্বচ্ছ থাকুন। যদি আপনি কিছু গোপন রাখেন এবং পরবর্তীতে প্রকাশ পায়,তবে তা নিঃসন্দেহে আপনাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে।সম্পর্কে পরিষ্কার ও খোলামেলা মনোভাব থাকলে সন্দেহ ও ঈর্ষা স্থান পায় না। আপনার সততা,খোলামেলা কথাবার্তা আপনার সঙ্গীর বিশ্বাস অটুট রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।

১৫.বাইরের মানুষের সামনে কখনোই তর্ক করবেন না। এটি আপনার সঙ্গীর জন্য বিব্রতকর। তবে ভালোবাসা প্রকাশে পিছপা হবেন না।

১৬.যে যাই বলুক আপনি আপনার সঙ্গীকে মন দিয়ে বিশ্বাস করুন, শ্রদ্ধা করুন। কোনো কিছু নিজে থেকেই ভেবে বসবেন না, রাগারাগি না করে সরাসরি প্রশ্ন করুন, ব্যাখ্যা চাইতে পারেন।

১৭.বিয়ের মাধ্যমে দুজন মানুষের সাথে সাথে দুটি পরিবারের মধ্যেও গড়ে উঠে নতুন বন্ধন। আমি-তুমি, তুমি-আমি মনোভাব না রেখে বরং দুটি পরিবারকে নিজের মতো করে ভালোবাসুন, এতে আপনার প্রতি  আপনার সঙ্গীর শ্রদ্ধা বেড়ে যাবে আরো দুই ধাপ।

১৮. আপনার সঙ্গীকে সাফল্য পেতে উৎসাহিত করুন,সেটা পড়ালেখার ক্ষেত্রে হোক,চাকরি বা ব্যবসার ক্ষেত্রেই হোক না কেনো। এতে আপনি তার স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের যত্ন নিচ্ছেন প্রকাশ পাবে এবং আপনাদের ভালোবাসাকে করবে শক্তিশালী।

১৯.প্রতিদিন রোমান্সের মধ্য দিয়ে যাবে এমন মনোভাব না রেখে বরং নিজেকে তৈরি রাখুন টেনশনের মুহূর্তে ভালো থাকার, ধৈর্য ধরুন,সময়ের সাথে সব ঠিক হবে।

২০. অনেককেই দেখা যায় বলতে,’প্রতিদিনই তো ঘুম থেকে উঠে,ঘুমোতে যাওয়ার আগে দেখা হচ্ছে তারপরও আবার ফোনে যোগাযোগ কেনো?’ যোগাযোগ যেকোনো সম্পর্ককেই সুন্দর করে তোলে।প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও মোবাইলে খোঁজখবর নিন,টেক্সট ম্যাসেজ দিন। তবে খেয়াল রাখুন এতো বেশি দিবেন না যা আপনার সঙ্গীর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২১. প্রতিদিনের ব্যায়ামের সময় সঙ্গীকেও সাথে রাখুন। এটি যেমন একে অন্যের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ করে, তেমনি দুজনের একসাথে সময় কাটানোর সুযোগও করে দেয়।

২২.মাসে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে নিজেদের মতো উপভোগ করুন। দুজন মিলে বাইরে খেতে যেতে পারেন কিংবা লং ড্রাইভে অথবা আয়োজন করতে পারেন আপনার সঙ্গীর পছন্দের কিছু।

২৩. গুরুত্বপূর্ণ কিংবা যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একবারের জন্য হলেও আপনার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করুন। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সঙ্গীর সিদ্ধান্ত পছন্দ হলে ভালোবাসার সাথে বলতেই পারেন,’তুমি যেটা ভালো মনে করছো তাই হোক।’ আর পছন্দ না হলে নম্রভাবে সততার সাথে আপনার মতামত কারণসহ জানিয়ে দিন।

২৪. একে অপরের স্থান দিতে শিখুন,স্বাধীনতা দিতে শিখুন। সম্পর্ক যতই গাঢ় হোক, এখন কিংবা তখন একে অপরকে মিস করার জন্য কিছু একা সময় প্রয়োজন।

২৫.বিশেষদিনগুলো মনে রাখুন। ডায়মন্ড রিং কিংবা দামী ঘড়ি উপহার দিতে পারছেন না বলে মন খারাপের প্রয়োজন নেই।বরং আপনার ছোট ছোট মুহূর্ত,জমানো স্মৃতি উপহার দিয়ে চমকে দিন।এমন চমক সবসময় অন্যান্য পরিকল্পনার চমকের চেয়ে বেশি খুশী করে থাকে।

২৬.রাগের সময় উঁচুস্বরে কথা না বলে নিচুস্বরে কথা বলুন। এটি আপনার সঙ্গীর উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। শব্দ ব্যবহারে অবশ্যই সংযত হোন।

২৭. আপনার সঙ্গীর দৃঢ় গুণগুলোর সাথে দুর্বল দিকগুলোও ইতিবাচকরুপে গ্রহণ করুন। দুর্বল মুহূর্তে সমর্থন করুন এবং গর্ব করুন দৃঢ়তার।আপনার ব্যক্তিত্বই আপনাকে অনন্য করে তুলবে আপনার সঙ্গীর চোখে।

২৮. জীবন সবসময় একই যাবে এমন মনে করার কারণ নেই। ভালো সময়ের পর খারাপ সময় আসতেই পারে। তাই তৈরি থাকুন, মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমান টাকা জমা করে রাখুন।এটি জীবনকে সহজ করে তুলবে।

২৯.দুজন মিলে বাগান করুন।বাগানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে বারান্দা কিংবা নিজের রুমেই টবে গাছ লাগাতে পারেন।দুজন মিলেই সময় দিন,গাছের যত্ন নিন। এতে আপনার সঙ্গীর মনে বিশ্বাস জন্মাবে অন্য কিছুর চেয়ে তার সঙ্গই আপনার বেশি পছন্দ।

৩০.খারাপ সময়েও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন। শুনতে বেখাপ্পা লাগলেও আপনার এই চিন্তাভাবনা,হাসি আপনার সঙ্গীকে অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে মুক্তি দিবে এবং পারস্পারিক সমঝোতার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে।

৩১. আপনার স্বামী/স্ত্রী  যা নন,তার জন্য কটুক্তি,উপহাস না করে;তিনি যা,তা নিয়েই আপনি খুশি আছেন সেটা প্রকাশ করুন।

৩২. জীবনের ছোট ছোট ভুলগুলোতে হাসুন।’টুথপেস্ট বের হলে টিউবে আর ঢোকানো যাবেনা’ মনোভাব ঝেড়ে ফেলুন। অতীতে করা ভুলের জন্য বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতকে নষ্ট করবেন না।

৩৩.আপনারা বছরের পর বছর একসাথে আছেন তাতে কি?মাঝেমধ্যে নিজেরাই দেখা করুন বাইরে। এটা ভালবাসা জীবিত রাখে।

৩৪.কোন সম্পর্কই এক না,তাই অন্যের সম্পর্কের উদাহরণ না টেনে নিজেদের সম্পর্কের সফলতা-বিফলতা থেকে শিখুন।

৩৫.সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিদিন সঙ্গীর জন্য প্রার্থনা করুন এবং আপনার সন্তুষ্টির কথা জানান ।

বিয়ের পর আমাদের চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার দুরত্ব অনেক সময় বেড়ে যায়।বেশিরভাগ মানুষের ধারণা সম্পর্ক নিয়ম ধরে হয় না। কিন্তু একটি ভালো সম্পর্কেও প্রয়োজন হয় দুইজনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও যত্নের,প্রয়োজন হয় শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার,তবেই মজবুতভাবে ঠিকে থাকে পবিত্র আত্মিক সম্পর্কটি।

লিখেছেনঃ মমতাজ আনার মুন্নি

মডেলঃ শারমিন ও জাহিদ 

Recommended


Comments

comments

3 Comments

Leave a Comment

*